অনুপ নারায়ন তালুকদার
ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন মিশরে আনুমানিক চার হাজার বছর আগেই ভূমি জরিপের কাজে জ্যামিতিক ধ্যান-ধারনা ব্যবহার করা হতো। গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, প্রাচীন মিশরের পুরোহিত সম্প্রদায়ের গণিত অনুশীলনের মাধ্যমে গণিতের আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে। যদিও জ্যামিতির প্রথম প্রমাণের কৃতিত্ব দেয়া হয় থেলিস কে। ভুমধ্যসাগরের পাড়ে মিশরের একটি বিখ্যাত শহর আলেকজান্দ্রিয়া। গ্রীক বীর আলেকজান্ডার এই শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। আলেকজান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে মিশরে জ্ঞান বিকাশের চর্চা প্রসারিত হয়। সমস্ত জাতির লোক সেখানে এসেছিল বসবাস, বাণিজ্য এবং সর্বোপরি জ্ঞানার্জন করতে।
এই আলেকজান্দ্রিয়া শহরেই জন্মেছিলেন অন্যতম নারী গণিতবিদ হাইপাশিয়া। তার জন্মের সঠিক বছর নিয়ে মতভেদ আছে। বাইজান্টাইন এনসাইক্লোপিডিয়া দ্য সুদা (The sida) তে তার জন্ম ৩৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাইপাশিয়ার বাবা থিওন ছিলেন একজন প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ। জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক এবং আলেকজান্দ্রিয়ার ইতিহাসখ্যাত জাদুঘরের সর্বশেষ ডিরেক্টর।
ছোটবেলা থেকেই হাইপাশিয়া ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ। গুণের সাথে যোগ হয়েছিল তার অসাধারণ সৌন্দর্য। রূপবতী কন্যাকে বাবা থিওন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ছোটবেলা থেকেই যথাযোগ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ধীরে ধীরে হাইপাশিয়া গণিত, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে পন্ডিত হয়ে উঠতে লাগলেন। ক্রমশ: বাবার জ্ঞানের পরিধি ছেড়ে বেরিয়ে নিজের পান্ডিত্য ও প্রতিভায় নিজের যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে লাগলেন। হাইপাশিয়া উচ্চ শিক্ষার জন্য ইতালী ও এথেন্স যান। সেখান থেকে ফিরে এলে তাঁকে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। হাইপাশিয়া সমসাময়িক দার্শনিকদের চেয়ে জ্ঞান ও বুদ্ধিতে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন প্লেটোর দার্শনিক ভাবনার অনুগামী। আলেকজান্দ্রিয়াতে তিনি প্লেটোনিস্ট স্কুলের প্রধান ছিলেন। এই স্কুলে তিনি গণিত ও দর্শনের শিক্ষা দিতেন। তাঁর শিক্ষাদানের ভঙ্গিমা ছিল প্রোটিনাম এবং ইয়ামব্লিকামের মত। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়কালে এই প্লোটিনাম ছিলেন নয়া প্লেটোনীয় তত্বের উদ্ভাবক এবং ইয়ামব্লিকাস ছিলেন এই তত্বের প্রসারক। হাইপাশিয়ার উপর এই দার্শনিকের প্রগাঢ় প্রভাব ছিল। প্লোটিনামের মতে, আমাদের চিন্তার সীমানার বাইরে রয়েছে একটি অন্তিম বাস্তবতা (Ultimate reality) এবং এর নাগাল পাওয়া আমাদের চিন্তার লক্ষ্য। এই অন্তিম বাস্তবতার যথার্থ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয় কারণ তা মানুষের বোধগম্য নয়। কিন্তু হাইপাশিয়ার মতে, পৃথক পৃথক মানুষের পৃথক পৃথক চিন্তার ক্ষেত্রে বাস্তবতার মাত্রা পৃথক। তিনি এই বিষয়ে তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে অধিকতর বিজ্ঞান সম্মতভাবে শিক্ষা দিতেন।
হাইপাশিয়া ডায়াফন্টাইন সমীকরণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। গণিতের উপর কোন মৌলিক গবেষণা করেননি ঠিকই তবে প্রাচীন গাণিতিক কাজের সংরক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইউক্লিডের লেখা ‘Elements’ গ্রন্থের নতুন সংস্করণ প্রকাশের পিছনে রয়েছে হাইপাশিয়ার অবদান। তাছাড়া খ্রিস্টপূর্ণ তৃতীয় শতকে বীজগণিতের আবিস্কারক ডায়াফন্টাস রচিত ‘অ্যারিথমেটিকা’ পুস্তকের তের অধ্যায়ের একটি আলোচনা ‘A Commentary of The Arithmetica of Diophantus’ অ্যাপোলিনিয়াসের কৌনিক ছেদ পুস্তকের উপর আর্য অধ্যায়ের আলোচনা A Commentary of The Canon যিনি নিজে লেখে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু অত্যন্ত দু:খের সাথে বলতে হয় তাঁর সমস্ত লেখা নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু বইগুলোর শিরোনাম জানা যায়। যে হাইপাশিয়া তাঁর পূর্বসূরিদের কাজ সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন, তাঁর উত্তরসূরিরা কিন্তু তার কাজকে সংরক্ষণ করেননি। এছাড়াও তিনি হাইড্রোমিটার ও হাইড্রোস্কোপ উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
হাইপাশিয়া শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বিজ্ঞানে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন খ্রিস্টান। ছাত্রদের মধ্যে একজন সাইনোসিয়াস পরবর্তীকালে টোলেমাইস চার্চের বিশপ হন। হাইপাশিয়ার শিক্ষাদানের পদ্ধতি এবং বিজ্ঞানের দক্ষতার প্রতি টোলেমাইস এতটাই অনুরক্ত ছিলেন যে বিশপ থাকাকালীন তিনি তাঁর শিক্ষককে প্রশংসা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ বহু চিঠি লিখেন। শোনা যায়, হাইপাশিয়া দার্শনিকের বিশেষ আলখাল্লা পরে আলেকজান্দ্রিয়া শহরের মাঝখান দিয়ে যখন হেঁটে বেড়াতেন তখন সাধারণ মানুষ তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য জড়ো হতো। তিনি ঐ পথ মধ্যেই প্লেটো, এরিস্টটল বা অন্যান্য দার্শনিকের তত্ত্ব আলোচনা করতেন।
হাইপাশিয়া বিদ্যাবুদ্ধিতে এবং শিক্ষাদানে যে শুধু শ্রেষ্ঠ ছিলেন তা নয়, নিজের বিশুদ্ধতা রক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্যা। তাঁর ছিল অনেক পাণিপ্রার্থী কিন্তু তাদের প্রত্যেকের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন জ্ঞান অর্জনের বেদীমূলে। তিনি চিরকুমারী রয়ে যান কারণ দাম্পত্য জীবন তার বিদ্যাচর্চা ও শিক্ষাদানে অন্তরায় হয়ে যেতে পারে।
আজ থেকে ১৬০০ বছর আগেকার সমাজে হাইপাশিয়ার মতো জ্ঞানী, বাগ্মী, দূরদর্শী ও স্পষ্টবাদী মহিলা জনসাধারণের কাছে প্রিয় হবেন এটাই তো স্বাভাবিক, হয়েছিলও তাই। আলেকজান্দ্রিয়াবাসী তাকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। হাইপাশিয়ার খ্যাতি যখন তুঙ্গে তখন এই শহরের শাসক ছিলেন ওরেস্টেস। হাইপাশিয়ার সঙ্গে ছিল তার দারুণ বন্ধুত্ব। হাইপাশিয়া বলতেন,‘গণিতই ধর্মনীতির সহায়ক’। ঈশ্বরকে তিনি বলতেন কেন্দ্র, বিশ্বসংসারকে বৃত্ত আর সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় তার মতে সমবাহু ত্রিভুজ। এজন্য খ্রিস্টানেরা হাইপাশিয়ার সাথে ওরেস্টেসকে অধার্মিক বলে মনে করত। খ্রিস্টানরা ভেবেছিল হাইপাশিয়ার সাথে বন্ধুত্বই ওয়েরেস্টস এর গোল্লায় যাওয়ার কারণ। ফলে পরে যখন খ্রিস্টান-অখ্রিস্টান দাঙ্গা বাধে তখন খ্রিস্টানদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে যান হাইপাশিয়া।
৪১২ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জার মুখ্য বিশপ হন সিরিল নামে এক ব্যক্তি। ইনি পরবর্তীকালে সেন্ট সিরিল নামে খ্যাত হন। দেশের নিয়ন্ত্রক হবে চার্চ না রাষ্ট্র এ নিয়ে সিরিল ও ওয়েস্টেসের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। জনশ্রুতি যে, সিরিলের বক্তব্যে সহমত পোষণ না করার পেছনে ওরেস্টেসকে নাকি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন হাইপাশিয়া। ফলে গোড়া খ্রিস্টানদের মধ্যে হাইপাশিয়ার প্রতি তীব্র ঘৃণা জন্মে। হাইপাশিয়াকে হত্যা ও আলেকজান্দ্রিয়াকে ধ্বংস করার একটি বর্ণনা চার্লস কিংসলের গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়Ñ
৪১৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের এক রৌদ্রজ্জল দিন। আলেকজান্দ্রিয়া শহরের উপর দিয়ে বইছিল বসন্তের মৃদু সমীরণ। পবিত্র ইস্টার আর কয়েক দিন পরেই। হাইপাশিয়ার জনপ্রিয়তায় ক্ষিপ্ত সিরিল ইতিমধ্যে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। এই ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা ছিলেন সিরিলের সহযোগী তথা গির্জার আবৃত্তিকার পিটার নামে এক ব্যক্তি। ঐ দিন কোন এক সকালে হাইপাশিয়াকে বাড়িতে রেখে তার বাবা আত্মভোলা গণিতজ্ঞ থিওন সিজারিয়ামে চলে গিয়েছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি জটিল সমস্যা সমাধানের অভিপ্রায়ে। ওদিকে শহরে গোলমাল ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো শহরের খ্রিস্টান সন্নাসীরা মেতে উঠেছেন আলেকজান্দ্রিয়াকে ধ্বংসের পাশাপাশি ঐ নারী গণিতবিদকে হত্যার উদগ্র আকাঙ্খায়। হাইপাশিয়া পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে পিটার দলবল নিয়ে হাইপাশিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। যদিও ফিলমান নামের এক তরুণ ভক্ত খ্রিস্টানদের অনুসারী হওয়া সত্বেও হাইপাশিয়ার গতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন এবং জানিয়েছেন, সামনের মোড়ে হত্যাকারীরা অপেক্ষা করছে শুধু তাকে হত্যার জন্য। তখন তিনি ঘোড়ার গাড়ি থেকে একবার মুখ বাড়িয়ে বলেছিলেন,‘ভয় নেই ফিলমান, আমার জন্য চিন্তা করো না’। তারপর কয়েক মুহূর্তের ঘটনামাত্র। মোড়ের কাছেই উগ্র ধর্মান্ধ সন্নাসীরা দানবের মতো চিৎকার করতে করতে শুভ্র বসনা হাইপাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। টেনে হিচড়ে হাইপাশিয়াকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল। টানতে টানতে নিয়ে গেল চার্চে। তারপর তাকে বিবস্ত্র করে ধারালো টালির টুকরা দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করল সিরিলের অনুগত বাহিনী। তাঁর প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। তারপর টুকরোগুলোকে সিনারন নামে এক জায়গায় এনে পুড়িয়ে দেয়। ফিলমান প্রায় মুহূর্তে দৌড়ে এসে দেখল ভিতরে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। আর এই ভাবে ধর্মের ঁেগাড়া কারবারীদের হাতে বিজ্ঞান দর্শনের যুগান্তকারী প্রতিভার অকাল মৃত্যু হয় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। অথচ মৃত্যুর মুহূর্তে চেঁচিয়ে, কেঁদে, মিনতি করে নিজের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেননি এই নারী। আগুনে লেলিহান এক বিদূষী নারীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করা হলো আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের সব ঐশ্বর্যকে।
নিজের প্রাণের বিনিময়ে বিজ্ঞান চর্চার জগতে নারী জাতিকে প্রবেশ করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন হাইপাশিয়া। তাই বলতে শোনা যায়, হাইপাশিয়া হলো প্রাচীন বিজ্ঞান ও গণিতকে বোঝার একটি দরজা অথবা ঐ জগতকে অনুভব করার, যা মানুষের বৃদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইউক্লিডের পর আলেকজান্দ্রিয়াতে গণিতজ্ঞের আর জন্ম হয়নি। সর্বোপরি হাইপাশিয়া যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে প্রতিটি গণিতচর্চাকারী মানুষের হৃদয়ে।
লেখক: শিক্ষক।


