প্রাথমিকেই শিশুরা হয়ে উঠুক স্বপ্নচারী পরিশ্রমী ও মানবিক বোধসম্পন্ন

ইয়াসমিন নাহার রুমা
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর।

শিশুরা জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অভাব অনটন, প্রতিকূল পরিবেশ শিশুর শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বপ্নময় এবং পরিশ্রমী মানুষ প্রয়োজন। তাই প্রাথমিকেই শিশুদের স্বপ্নচারি এবং পরিশ্রমী হবার পথ দেখাতে হবে এবং দিক নির্দেশনা দিতে হবে। বয়সে নয় কর্মে, সৃজনশীলতায় এবং মনুষত্বে বড় হতে হয় এই শিক্ষাটা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের মনে গেথে দিতে পারলে তারা স্বপ্ন দেখতে শিখবে যা তাদের নিয়ে যেতে পারে সুন্দর আগামীর পথে। শৈশবে শিশুরা যা দেখে, শুনে তাই তাদের স্বভাবে, ব্যবহারে প্রস্ফুটিত হয়। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য শিশুদের মধ্যে মেধা, দেশাত্ববোধ, মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য স্বপ্ন দেখাতে হবে। শিশুদের বুঝাতে হবে জীবনটা যুদ্ধক্ষেত্র, জীবনেচলার পথ বন্ধুর, জীবনে চলার পথে অনেক প্রতিকূলতা আসবে তাতে থেমে গেলে চলবেনা। স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি যদি তা বাস্তবায়নের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থাকে তাহলে স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
শিশুদের অপার বিস্ময়ের জগত নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। শিশুর অপার বিস্ময় বোধ, অসীম কৌতুহল, অফুরন্ত আনন্দ, ও উদ্যমের মতো মানবিক বৃত্তির সুষ্ঠু বিকাশ সাধনের সেই মৌল পটভূমিতে পরিমার্জিত হয় প্রাথমিক শিক্ষাক্রম। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিশুদের নৈতিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সততা স্টোর। সততা স্টোর এর ধারণাকে সার্থক করে তুলতে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি। যেহেতু শিশুরা অনুকরণ প্রিয় তাই বার বার যা শুনে ও দেখে তাই তারা শিখে নেয়। সততার গুরুত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ সর্ম্পকে তাদেরকে বার বার শোনাতে হবে, প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে বিখ্যাত মনিষীদের ছবি রয়েছে। তাদের সফল হওয়ার পেছনে গল্প, সহনশীলতা, উদ্যম ও পরিশ্রম সর্ম্পকে শিশুদের জানাতে হবে। বিভিন্ন সফল ব্যক্তিদের জীবনী সর্ম্পকে তাদের বলতে হবে। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রতিদিন ১ জন করে সফল ব্যক্তির জীবনের গল্প শোনানো হলে তারা সফল ব্যক্তিদের আত্মজীবনী পড়তে উদ্বুদ্ধ হবে এবং তাদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। গুণীজনদের কর্ম ও জীবন শিশুদেরকে সুন্দর আগামীর দিকে হাতছানি দিবে।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ে স্থাপিত বঙ্গবঙ্গু কর্ণার ও মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারে রয়েছে বঙ্গবঙ্গুর জীবন ও কর্ম নিয়ে অনেক স্থিরচিত্র, স্বাধীনতার বিভিন্নঘটনা প্রবাহের বিবরণ ও ছবি, রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই।শিশুদের মননে মহান মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করতে তাদেরকে এসব বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে, তাদেরকে ঘটনা প্রবাহ পড়তে বলতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ফাঁকে প্রতিদিন কিছু কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ সর্ম্পকে জেনে স্বাধীনতার চেতনা লালন করলে তারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হয়ে বেড়ে উঠবে।
ড. মহুয়া ভট্রাচার্য গোস্বামী তার ‘শিশু-কিশোর সাহিত্যের স্বরুপ-সংজ্ঞা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, প্রকৃত পক্ষে শিশু ও কিশোর মনের জগৎ আলাদা। তাদের জন্য লেখা সাহিত্যের জগৎ ও স্বতন্ত্র। শুধু আনন্দ দেওয়াই নয়, শিশুসাহিত্যের মাধ্যমে শিশুদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং বিশ্ব-প্রকৃতিকে জানবার আগ্রহী করে তুলতে হবে। শিশু সাহিত্য শিশুর সরল মনে শিক্ষা ও আদর্শের ছাপ রাখে যা ভবিষ্যতে শিশুর রুচির উপর প্রভাব বিস্তার করে। শিশু সাহিত্য পড়লে শিশুদের চঞ্চল, কল্পনা প্রবণ ও জিজ্ঞাসুমন হাসি, কৌতুক, ও আনন্দ গ্রহণের মাধ্যমে পেয়ে যায় জাগতিক জ্ঞান, বুদ্ধি-যুক্তি ও চিন্তার উপাদান। তাই শিশুদেরকে মানসম্মত ও আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় শিশু সাহিত্য চর্চার দিকে আগ্রহী করতে হবে।
বিদ্যালয়ে আনন্দ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ ছাড়া শিশুদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ অসম্ভব। তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিতকরণের বিকল্প নেই, আনন্দের মাঝে শিশুরা বেড়ে উঠলে আকাশ ছোয়া স্বপ্ন ও বুক ভরা আশা নিয়ে বাঁচতে পারবে। শিক্ষা ও দক্ষতাই জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সিড়ি এটা ছোট বেলা থেকেই বুঝাতে হবে। তাহলেই তারা সৃজনশীল ও পরিশ্রমী হবে। সমাবেশে এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন নৈতিক বাক্য শিশুদের দিয়ে বলাতে হবে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এবং ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকেই আমরা পরের তরে’ এই মেসেজগুলি শিশুদের জানাতে হবে; তবেই তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও মহানুভবতা জাগ্রত হবে। তাই কামিনী রায় বলেছেন—-
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও
তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও”।