অ্যাড. এনাম আহমদ
(৪র্থ পর্ব)
আটলান্টিক দ্যা পাম। পারস্য উপসাগরে বাঁধ দিয়ে সৃষ্টি করা কৃত্রিম ভূমিতে তৈরী করা হয়েছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল রিসোর্ট ও অনেকগুলো প্রমোদ প্রাসাদ। বিমান থেকে দেখলে এ কৃত্রিম ভূমি ও স্থাপনাগুলোকে একত্রে সাগরে ভেসে থাকা শাপলা ফুল বলে মনে হয়। বিমান থেকে তোলা এ ছবি পৃথিবীর সুন্দর ছবিগুলোর একটি। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে উড়ে আসা বিমানগুলো দুবাই নামার পূর্বে এ স্থানের উপর একটি চক্কর দিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করে। মানব নির্মিত শাপলা ফুলের কেন্দ্রীয় স্থাপনা আটলান্টিজ দ্যা পাম। এটি আকৃতিতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও প্রাকৃতিতে এ গ্রহের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেল। এখানে কাজ করে বিরাশিটি দেশের প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরমধ্যে একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান ছোটভাই জুসেফ। তার বদান্যতায় এই ভূ-স্বর্গের ভয়াবহ সৌন্দর্য গলদকরণ করে বর্তমানে বেহুশ অবস্থায় আছি। হুশ ফেরা সাপেক্ষ আগামী পর্বে তা বর্ণনার চেষ্টা করবো। কর্মকর্তাদের থাকার জন্য এ রিসোর্ট থেকে দশ মাইল দূরে মূল ভূখন্ডে বহুতল বিশিষ্ট অনেকগুলো ডরমেটরি রয়েছে। সে গুলোতে জুসেফের গেস্ট হিসেবে আমি থাকবো প্রথম সপ্তাহ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভোরবেলা সেখানে পৌঁছে নাম বিভ্রান্তিতে এক আফ্রিকান জুসেফের রোষানলে পড়লাম। এশিয়ান প্রকৃত জুসেফ এসে সাদা পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে এ আন্ত-মহাদেশীয় সমস্যার সম্মান জনক সমাধান করে দেন। প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে লিফটে উঠে জোসেফের রুমে অবতরণ করি। এতো ঝড়-ঝঞ্ঝার পর তার দেখা পাওয়ায় বিগত দুই দিনের সকল ক্লান্তি অনিশ্চয়তা ভুলে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে তার সঙ্গে নাস্তা খেতে গেলাম ডাইনিং এ। সে এক এলাহি কারবার। ডাইনিং হল না বলে ইনডোর স্টেডিয়াম বলা ভাল। পৃথিবীর সব মহাদেশের মানুষ এখানে অবস্থান করায় খাবারও প্রস্তুত করা হয়েছে সবাইকে টার্গেট করে। খাওয়া দাওয়া বুফে সিস্টেমের। বলতে গেলে আমি দুইদিন না খাওয়া। দেশ-মহাদেশ বিবেচনায় না নিয়ে খাবারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বিশাল প্লেইটে এতো পরিমাণ খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে টেবিলে রাখলাম, মনে হলো প্লেটের উপর খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়। আমার বিপরীত দিকে চেয়ারে খেতে বসা জোসেফের মুখ, এ খাদ্য পাহাড়ের জন্য দেখাই গেল না। খাওয়া শেষে সে ধরাধরি করে আমাকে তার রুমে নিয়ে এলো। পনের মিনিট বিছানায় গড়াগড়ি দিয়েই বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই। জোসেফ অন্তত: ঐ দিনটি বিশ্রামে থাকার জন্য আহাজারি করলো। পরের দিন ছুটি নিয়ে আমাকে শারজাহ নিয়ে যাওয়ার লোভনীয় প্রস্তাবও দিল। কিন্তু সারাদিন বিশ্রাম নেয়ার বিলাসিতা করার মতো সময় আমার হাতে নেই। অর্ধ মাসে আমিরাত দেখা, অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো। এরমধ্যে একদিন বিশ্রাম! আমার পাসপোর্ট ও লাগেজ তার নিরাপদ হেফাজতে রেখে ঐদিনের সিডিউল শারজাহ ঘোরে আসার রোড ম্যাপ তার কাছ
থেকে জেনে নিয়ে নেমে গেলাম পথে। সামনে এগিয়ে গিয়েই একটি বাস স্টপ। বাসের ছবি স্ট্যান্ডে লাগিয়ে বুঝানো হয়েছে বাস স্টপের অবস্থান। সিটি বাসের জন্য আমি যে স্থানে দাঁড়িয়ে আছি সেটি দুবাই শহরের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত একটি অত্যন্ত অভিজাত এলাকা। নাম জুমরা ভিলেজ। মানুষ চলাচল খুবই কম। এর মধ্যে পৃথিবীর একটি সুন্দর দৃশ্য দেখলাম। ৮/১০ বছরের কয়েকটি বালিকা হেঁটে হেঁটে হেলেদুলে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের সবার মাথায় স্কার্ফ। তখন হঠাৎ মনে হলো আরবে আছি। কিছু প্রাইভেট কার নিঃশব্দে আসা যাওয়া করছে। ড্রাইভিংয়ে বসা বেশীর ভাগ ইউরোপীয়ান মহিলা ইউরোপীয়ান পোশাকে সজ্জিত। ধর্ম দুবাইয়ে কারো উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না। এর মধ্যে কয়েকটি হলুদ রঙের স্কুল বাস ৪/৫ বছরের উচ্ছল শিশুদের নিয়ে ছুটে গেল। অন্তত বিশ মিনিট দাঁড়ানোর পর আমার কাক্সিক্ষত সিটি বাসটি স্ট্যান্ডে এসে থামলো। বাসে বেশ কয়েকজন যাত্রী। ড্রাইভার সাহেব ছাড়া গাড়িতে অন্য কোন স্টাফ নেই। শারজাহ যেতে আমাকে আরো দুইবার বাস ও ট্রেন বদলাতে হবে। বাসে উঠে রেল স্টেশন থেকে কেনা ওয়েস্টার কার্ডটি যথাস্থানে পাঞ্চ করলে তেইশ দিরহাম ক্রেডিট খালি। উন্নত দেশের সিটি বাসগুলোর ভেতরে তিন স্তরে বিভক্ত থাকে। সামনের দিকে ১০/১২ ফুট জায়গা ফাঁকা এবং বেশ নিচু। এ স্থানটি হুইল চেয়ার সমেত একেবারে বৃদ্ধদের জন্য। একটু এগিয়ে গেলে এক সিঁড়ি উপরে উঠে প্রশস্ত কিছু আসন। এগুলো মধ্য বয়স্কগণের আর বাসের একেবারে পেছনে দুই সিঁড়ি উপরে উঠে খোঁজে পাওয়া আসনগুলো তরুণ-তরুণীদের জন্য। এখানে আমার আসন কোথায়? যেহেতু হুইল চেয়ার নিয়ে উঠিনি, তাই সামনে এগিয়ে গেলাম। মধ্যভাগ বয়স্কদের জন্য। সেখানে বসলে নিজের আসল বয়স স্মরণ হয়ে যাবে, সেই বিবেচনায় এগিয়ে গিয়ে তরুণদের মধ্যে একাকার হয়ে গেলাম। কিন্তু পৃথিবীর তরুণদের তারুণ্য কোথায়? তারা সবাই মাথা নিচু করে বসে আছে। না! বড়দের সামনে দেখে শ্রদ্ধায় এ মাথা নিচু নয়! স্মার্ট ফোনে কথিত ‘সামাজিক যোগাযোগ’ রক্ষার জন্য এই নিচুতা! মানুষকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্য সামাজিক নাম দিয়ে এক ভয়ংকর দানবকে আবাল বৃদ্ধ বনিতার হাতে তুলে দিয়েছে সা¤্রাজ্যবাদিরা। এখন আর আগের মতো বিভিন্ন দেশ দখল করার জন্য যুদ্ধ করে না বেনিয়ারা। তৃতীয় বিশে^র মেধাবীদের মগজ দখল করে, তাদের একা করে দেয়। একা মানুষ সব সময় আত্মবিশ^াসহীন, হতাশ, অবসাদগ্রস্ত হয়। মতের মিল না হলে বিস্ফোরিত হয়। যাই হোক আমার সিটি বাস চলতে শুরু করলো। বাইরে তাকালাম, একেবারে নতুন চকচকে সব ঘরবাড়ি। বেশীর ভাগ বাড়ি বাংলাদেশের পূর্বেকার হাটিবাঁধা গ্রামের বাড়ির মতো। আমাদের গ্রামগুলোতে এখন হাটিবাঁধা বাড়ির সংস্কৃতি বাদ দিয়ে ফসলি জমি নষ্ট করে অপ্রয়োজনীয় বাড়ি বানানো হচ্ছে। আমাদের প্রচুর জনসংখ্যা আর ফসলী ভূমি কম, সেখানে আমরা হাটিবাঁধা ঘরবাড়ির সংস্কৃতি বাদ দিচ্ছি। আর দুবাইয়ে জনসংখ্যা খুব কম আর লক্ষ লক্ষ হেক্টর ভূমি ফাঁকা পড়ে আছে। তাও তারা তৈরি করছে হাটি বাঁধা ঘরবাড়ি। কত দূরদর্শী তারা! প্রতিটি বাড়ি দুই তলা বিশিষ্ট ও বিলাসবহুল। একটি বিষয় খটকা লাগলো, এতো গরমের দেশ, কিন্তু আমাদের মতো প্রতিটি ফ্লোরের বাইরে এয়ারকোলার সিস্টেমের বক্স না দেখে। বাসটি এবার চলছে সাগরের পাশ দিয়ে। একটি বিষয় লক্ষ করলাম রাস্তা ঘাটে প্রচুর কাজ হচ্ছে। প্রচুর নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন, অনেক দূরে দূরে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ হচ্ছে। তবে তাতে সাধারণ মানুষের চলাচল বিঘিœত হচ্ছে না। সারা পৃথিবীতে যত ক্রেন ব্যবহৃত হয়, তার শতকরা পচিশ ভাগই নাকি ব্যবহার হচ্ছে আরব আমিরাতে। প্রকৃত উন্নয়নের জোয়ার দেখতে হলে দুবাই আসতে হবে। কথিত কাগুজে উন্নয়ন নয়, সত্যিকার সুপরিকল্পিত উন্নয়ন। তবে দুবাই যারা ভ্রমণ করতে চান তারা ৩-৪ বছর পরে আসলে ভাল করবেন। একটি নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার যাত্রা শুরু করেছে সমুদ্রের মাঝ দিয়ে, সেটি যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, আল্লাহ মালুম! আমার বাস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টার নামক মেট্রো রেল স্টেশনে থামলে, আমি নেমে গেলাম। স্টেশনের চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে ট্রেনের সাইন দেখে দশ মিনিটের মধ্যে দিব্যি রেলের কাছে পৌঁছে গেলাম। যেন এসব আমার কত পরিচিত! যেন দীর্ঘদিন যাবৎ এ পথেই আমার যাতায়াত। আসলে ব্যবস্থা এতো চমৎকার, একটি মেট্রো স্টেশন কেউ একবার ব্যবহার করলে যে কোনো স্টেশনে সে আর আটকাবে না। ট্রেনে উঠলাম, ভাড়া পরিশোধ করলাম মেশিনে সেই ওয়েস্টার কার্ড দিয়েই। নামব ইউনিয়ন স্টেশনে, সেখান থেকে পাব শারজার বাস। এখন পর্যন্ত স্থানীয় সুসজ্জিত কোন অ্যারাবিয়ানকে দেখলাম না। দুবাইয়ের কোন পুলিশ দেখলাম না। বিষয়গুলো খটকা লাগলো। ট্রেনে এখন যাত্রীতে পরিপূর্ণ। বেশীরভাগ উপমহাদেশীয়। কিছু পশ্চিমা ও কোরিয়া জাপানের। অত্যন্ত আত্মবিশ^াসের সাথে ট্রেন থেকে নেমে বাস স্ট্যান্ডের কাছে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে হৃদয়টা পুরোপুরি ভেঙ্গে গেল। শ্রমিক ভর্তি একটি বাস গেল আমার সামনে দিয়ে। বাসটি খুব উন্নত নয় এবং বাসের কয়েকটি জানালা খোলা থাকায় বুঝা গেল বাসটিতে এসিও নেই। শ্রমিকরা ক্লান্ত, সম্ভবত ক্ষুধার্ত। সামনের সিটে হেলান দেয়ার স্থানে হাত দিয়ে তাতে মাথা গুজে রেখেছে। তাদের দেখেই মনে হলো, তারা অভাগা দেশের মানুষ। দুবাইয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করার সময় তাদের নেই। তারা রেমিটেন্স যোদ্ধা। তারা দেশে টাকা পাঠালে আমরা সেগুলো দিয়ে আতসবাজি ফোটাব! বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আলোকসজ্জা করব!
হঠাৎ অমনোযোগী হয়ে যাওয়ায় শারজার বাসে না উঠে ভুল বাসে উঠে পড়লাম। সেটা টের পেলাম অনেক পর। মানসিক অবসাদ, শারীরিক অবসাদে রূপ নেয়ায় আমিও আমাদের শ্রমিকদের মতো সামনের সিটের হেলানে হাত দিয়ে তাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল তেলাওয়াত শুনে। প্রথমে ভেবেছিলাম পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত। পরে দেখা গেল, না! আমার সঙ্গে একজন কর্মকর্তা আরবিতে কথা বলছেন। পরে ইংরেজীতে বললেন, আপনার পাসপোর্ট, কাতারের ভিসা দেখান এবং ইমিগ্রেশন কার্ডটি জমা দিন। এই বাসটি যাচ্ছে কাতার। অন্যান্য যাত্রীরা তাদের পাসপোর্ট বের করে দিলেন। আমি আমতা আমতা করতে থাকলাম। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনা সফল হলো না। আসলে মনের গভীর থেকে মানুষ কিছু চাইলে তা কখনো বিফলে যায় না। কিছুক্ষণ আগে দুবাইয়ের পুলিশ না দেখায় মনের মধ্যে হাহাকার ছিল। এবার আমি নিশ্চিত, পুলিশ দেখব। দুবাইয়ের পুলিশ………..(চলবে)
- পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে শিক্ষার অগ্রগতির আকুতি
- প্রাথমিকেই শিশুরা হয়ে উঠুক স্বপ্নচারী পরিশ্রমী ও মানবিক বোধসম্পন্ন


