দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী
আর মাত্র দু’দিন, এর পরেই বাঙালি জাতি পালন করবে সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। আবহমান কাল থেকে চলে আসা নিয়ম অনুসারে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পহেলা বৈশাখ নতুন বছরকে বরণ করে নেয় বাঙালি সমাজ। মানুষ যে যার সাধ্য মত নতুন ও বাহারি রং এর কাপড় পড়ে। আর বৈশাখ আসার কয়েক দিন আগে থেকেই এই দোকান থেকে ওই দোকানে ক্রেতারা পছন্দমত কেনা-কাটায় ব্যস্ত সময় পার করেন। কিন্তু এবছর তেমনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রায় প্রত্যেক দোকানেই অনেকটা অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা। শহরের কোন মার্কেটেই এবার নেই জাঁকজমকপূর্ণ দৃষ্টিনন্দন গেইট, লাইটিং কিংবা আয়োজন।
শহরের বড় বড় বিপণী বিতানে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, এবছর জেলার একমাত্র বোরো ফসল আগাম বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মার্কেটগুলোতে এমন মন্দা অবস্থা। হাওর পাড়ের কৃষকের একমাত্র ফসল পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পহেলা বৈশাখী বাজারে।
শহরের পৌরবিপনী মার্কেটের মধ্যবিত্তের মালিক মানবেন্দ্র কর বলেন,‘আমরা অন্যান্য বছর পহেলা বৈশাখ আসার অনেক আগে থেকেই দোকানে সাজসজ্জ্বা করাতাম। ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য বিচিত্র রং এর ও বাহারী ডিজাইনের পোশাকের সংগ্রহ নিয়ে সাজাতাম দোকান। কিন্তু এবছর তেমনটা করা হয়নি। সারা জেলার ফসল যেখানে চলে গেছে, সেখানে এমনটা করা ঠিক হবে না। আমরা দোকানদার হলেও মানুষ, প্লাস্টিক তো আর না। সারা জেলার কৃষকেরা একমুঠো ভাতের জন্য যেখানে হাহাকার করছে
সেখানে আমরা বিকিকিনি হওয়া নিয়ে চিন্তা করছি না। উৎসব হলে সবাইকে নিয়ে না হলে কেউই করব না। তবে অন্য বছরগুলোতে এই সময় কেনা-বেচার ধুম থাকত এখন তেমন কিছুই নেই। তবে কিছু মানুষ তাদের শিশু সন্তানের জন্য সামান্য কেনা কাটা করছেন।
ময়ূরী ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক ফখরুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘এই বার বৈশাখের জন্য আমাদের দোকানে আলাদা কোন আয়োজন নেই। যেখানে জেলার প্রায় শতভাগ ফসল চলে গেছে সেখানে আমাদের পহেলা বৈশাখ নিয়ে আয়োজন থাকাটাও অমানবিক’। তার কাছে ক্রেতারা কেনা-কাটা করতে আসেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, আসেন তবে খুবই সামান্য সংখ্যায়।
লন্ডন প্লাজার বিশ্ব রং শো-রুমের ম্যানেজার পানু দেব বলেন‘যদি বিকিকিনি ভাল হতো তাহলে আপনার সাথে কথা বলারও সময় হতো না এসময়। কিন্তু এবছর তেমন কিছুই নেই। ক্রেতা শূন্যই বলা চলে।
বিশ্ব রং এর প্রোপাইটর লিটন চৌধুরী জানান, যেহেতু এই শো-রুম বাহিরের তাই রং এর বৈশাখ উপলক্ষে বাহারি আয়োজন ছিল কিন্তু ক্রেতা নেই, তাই আমাদের বিক্রিও নেই।
এদিকে দোজা প্লাজার শাওন ডিপার্টমেন্টের স্বত্তাধিকারী মহিবুর আলম শাওন বলেন ‘আমি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার ১৫ দিন আগে ঢাকা থেকে বৈশাখের জন্য বিশেষ জামা-কাপড় কিনে এনেছিলাম। কিন্তু সুনামগঞ্জের বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। ক্রেতা নেই বললেই চলে। এমনকি মহিলা-শিশু কেউই কোন কেনাকাটা করছেন না। হাওরে ফসলডুবির প্রভাব আমাদের বৈশাখী বাজারের উপর পড়েছে। তবে আমরা কি পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখিন হবো তা বড় কথা নয়, কথা হলো জেলার বেশীর ভাগ কৃষকের একমাত্র ফসল চলে গেছে। এর চেয়ে খারাপ কি হবে। এক বছর না হয় না হয় নাই বিক্রি করলাম।
শুধু যে শহরের বিপণী বিতানগুলোর এমন অবস্থা তা কিন্তু নয়। নি¤œআয়ের মানুষের ফুটপাতের দোকানগুলোরও একই অবস্থা।
নিউ শারা ফ্যাশনের ব্যবসায়ী জোবায়ের খান বলেন, ‘আমাদের দোকানে নি¤œআয়ের মানুষেরাই মূল ক্রেতা। হাওরে ফসলের সাথে সাথে আমাদের বেচা-কেনাও পানিতে তলিয়ে গেছে। গত বছর পহেলা বৈশাখে শুধু সাদা রং এর কাজ করা বৈশাখের গেঞ্জি তুলেছিলাম ১ হাজার পিস। আর অন্যান্য কাপড় চোপড় তো ছিলই কিন্তু, এবছর মাত্র ১২০ পিস গেঞ্জি তুলেছি তার মধ্যে ৫০পিস রয়ে গেছে। আর বাকি কাপড়-চোপড় তো যা তুলেছি সবই রয়ে গেছে। আমাদের বেশীর ভাগ ক্রেতা কৃষক শ্রেণীর। যেহেতু কৃষকদের সারা বছরের ফসল চলে গেছে তাই তাদের কেউ-ই কোন কেনা কাটাই করেননি। আমরা এই বছর মালামাল কিনে ধরা খেয়েছি।
উল্লেখ্য, গত ১৫দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের ৯০ভাগ ফসল তলিয়ে যাওয়ায় জেলাজুরে তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে।
- ফসলহানির প্রেক্ষিতে জেলাজুড়ে কৃষক সংগ্রাম সমিতির বিক্ষোভ
- আগামীকাল কৃষক-জনতার সমাবেশ ও পাউবো অফিস ঘেরাও কর্মসূচি


