বন্যার্তদের পাশে সরকার ছাড়া অন্যদের সহায়তা কম

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে কয়েক লাখ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। করোনায় বিপর্যস্ত মানুষ লাগাতার দুইবারের বন্যায় চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। কিন্তু করোনাকালীন এই সময়ে সরকারি সামান্য পরিমাণের ত্রাণ ছাড়া বেসরকারিভাবে উল্লেখ করার মতো কোন সহায়তা এবার পান নি বন্যার্তরা। এমনকি প্রবাসীদের সহায়তা কার্যক্রমও নেই বললেই চলে।
গত চারদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বন্যার পানি কিছুটা কমলেও জেলার নি¤œাঞ্চলের ঘরবাড়ি থেকে পানি নামে নি এখনো। একারণে ২৭১ টি আশ্রয়কেন্দ্রে শুক্রবার পর্যন্ত রয়েছেন ২৬১৯ বন্যার্ত পরিবার।
জেলাজুড়ে থাকা এসব আশ্রয় কেন্দ্রের কোন কোনটিতে পরিবার প্রতি ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হলেও কোন কোন আশ্রয়কেন্দ্রে সেটিও এখনো পৌঁছেনি।
সুনামগঞ্জ শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মিনতি বর্মণ (৭৫) জানান, পরিবারের সদস্য ৬ জন। প্রথম বন্যা থেকেই এই আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো সহায়তা পান নি তারা।
সুরমা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুর রহমান বললেন, আমার ওয়ার্ডের অক্ষয়নগর, সদরগড়, আমিরপুর, আমিরগঞ্জ ও কুরুতলা গ্রামের প্রায় ৫০০ শ্রমজীবী পরিবার রয়েছে। কিন্তু আমি ত্রাণ পেয়েছি ১০ কেজি করে ২৫ পরিবারের জন্য। অন্যদের কাছে কীভাবে যাই। এলাকায় কিছু বিত্তশালী আছেন। তাঁরা করোনারকালীন সময়ের শুরুতে কিছু মানবিক সহায়তা দিয়েছেন। এখন তাঁদেরও ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির, এজন্য বেসরকারি কোন সহায়তাও এলাকায় নেই।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন রুমা বললেন, সদর উপজেলায় ইতিমধ্যে ৩৯ টন চাল বন্যার্তদের বিতরণ হয়েছে। আরও ১৮১ টন চাল শীঘ্রই বিতরণ হবে। কিছু কিছু ইউনিয়নে তিনি নিজে থেকে বিতরণ সেরেছেন। সুরমা ইউনিয়নের জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে কেন ত্রাণ পৌঁছাল না খোঁজ নিয়ে ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন তিনি।
জেলার সবচেয়ে ভাটির জনপদ শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বলেন, উপজেলায় এখনো ৫২ টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তরা রয়েছেন। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন তাদের শুকনো খাবার ও ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্তত. ১৬ থেকে ১৭ শ’ পরিবার রয়েছে যারা বন্যা আক্রান্ত হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদেরকে ত্রাণ দেওয়া সম্ভব হয় নি। বেসরকারিভাবেও এবার কেউ সহায়তায় এগিয়ে আসে নি।
তিনি বলেন, এ ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব সময়ই বিত্তশালী বা ব্যবসায়ীরা সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এবার ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা থাকায় বেসরকারি কোন ত্রাণ তৎপরতা নেই।
সুনামগঞ্জ শহরের বিসিক শিল্পনগরীতে বন্ধ হয়ে যাওয়া আখিয়া ডিজাইন এ- ফ্যাশনের ভবনে বন্যার সময় ১৫০ জনের মতো বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খায়রুল কবীর রুমেন ও যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আরজ আলী তাদের নিজেদের উদ্যোগে বন্যার্তদের খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেন বলেন, আমাদের উদ্যোগ সীমিত ছিল। তবে এমন উদ্যোগ এবার কম। মূলত করোনার জন্যই বেসরকারি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও থমকে গেছে। জেলার বিশ^ম্ভরপুরে বাংলাদেশ ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বৃহস্পতিবার ১৫ টি বন্যার্ত পরিবারকে মুডি, চিড়া, গুড়, স্যালাইন ও জ¦রের টেবলেট দিয়েছে।
জেলার প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম রানা জানালেন, তার ইউনিয়নের কুশিয়ারা নদীর পাড়ের কিছু এলাকা বন্যা কবলিত হয়েছিল। তারা ৬৫০ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দিয়েছেন। অন্যান্য সময় এ ধরণের পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা সহায়তা করেন, এবার সেটা হয় নি। তিনি বললেন, করোনার কারণে প্রবাসীদেরও আয় কমেছে, এজন্য সহায়তার উদ্যোগ কম।
জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা জহিরুল আলম জানালেন, শুক্রবার পর্যন্ত জেলার ১৭১ আশ্রয়কেন্দ্রে ২৬১৯ পরিবার আশ্রয়ে রয়েছেন। দুই দফা বন্যায় ১ লাখ ৮ হাজার ১২ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই পর্যন্ত ৮৬৫ মে.টন চাল ও ৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ১৬ কেজি ৫০০ গ্রাম ওজনের ৩৬ শ’ পেকেট শুকনো খাবার, ২ লাখ শিশু খাদ্য ও ২ লাখ গো-খাদ্য বন্যায় আক্রান্তদের মধ্যে বরাদ্দের জন্য পাওয়া গেছে এবং উপজেলায় উপজেলায় এগুলো পাঠানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক এমপি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালেও চেরাপুঞ্জির পাদদেশের উপজেলা দোয়ারাবাজারের সুরমা ও লক্ষীপুর ইউনিয়নে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি মানুষের এমন দুর্যোগে বিত্তবান ও প্রবাসীরদেরও মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।