বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের গুণী লেখক ও কবিদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের হাজারো বই, কয়েকযুগের ঈদসংখ্যা, সাময়িকী, দেশ, সানন্দা, বিচিত্রাসহ অসংখ্য দুর্লভ প্রকাশনা ভয়াবহ বন্যার পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। বানের পানির তা-ব থেকে ৩০-৪০ বছরের সংগ্রহ রক্ষা করতে না পেরে মনকষ্টে ভুগছেন তাঁরা।
সিলেট অঞ্চলের সাহিত্যঙ্গনে সমাদৃত কবি ইকবাল কাগজী’র বসতঘরে এখনো পচা বইয়ের দুর্গন্ধ। সামান্য রোদ হলেই বন্যায় ডুবে যাওয়া বই শুকানোর চেষ্টা করছেন তিনি। সাহিত্য সংগ্রাহক, কবি-লেখক ইকবাল কাগজী প্রায় ৪৫ বছর ধরে জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার সাহিত্য-সাময়িকী সংগ্রহে রাখছিলেন। প্রায় সাত হাজার রাজনৈতিক বইসহ বিখ্যাত বহু অভিধান সংগ্রহে ছিল এই লেখকের। কার্ল মার্কসের পুঁজি, ঊপনিবেশিক প্রসঙ্গে, লেনিন রচনাবলী, মাওসতুং রচনাবলী, লুনাচারস্কির শিক্ষা, স্টেলিন রচনাবলী, মার্কসবাদ ও নন্দন তত্ত্বসহ দেবী প্রসাদ চট্রোপধ্যায়ের নিষিদ্ধ কথা নিষিদ্ধ দেশসহ অসংখ্য রাজনৈতিক বই পানিতে নষ্ট হয়েছে তাঁর। অভিধানের মধ্যে হরিচরণ চট্টপধ্যায়ের দুই খ-ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, আব্দুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ, দুইখ-ের বানান বিচিন্তা, দুইখ-ের পৌরানিক অভিধান, তিনখ-ের বিবর্তনমূলক অভিধানসহ সমৃদ্ধ বহু অভিধানসহ প্রায় সাত হাজার বইয়ের সংগ্রহের বসতঘরটি গেল ১৬ জুন ডুবে। চাল সমান পানি ছিল। একারণে কবি ইকবাল কাগজি’র ৪৫ বছরের সংগ্রহশালা এখন শূন্য প্রায়।
কাগজি বললেন,‘ঘরে তিন ফুট পানি হলে আমার স্ত্রী ও কন্যারা প্রতিবেশির দু’তলায় আশ্রয় নেই। আমি তখনো আমার ৪৫ বছরের সংগ্রহ বাঁচানোর লড়াই করেছি। অল্প সময়ে পানি শনৈ শনৈ বাড়তে থাকে, তখন অনেকটা নিরুপায় বোধ করি। শেষ পর্যন্ত একা একা ঘণ্টা দুয়েক লড়েছি। কিন্তু অবস্থা এমন ছিল, দুইটা বই সরানো চেষ্টা করলে, তিনটা বই পানিতে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নিজেই বিপদে পড়ে যাচ্ছি বোধ করে, বেরিয়ে যাই।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় ৪৫ বছরের সংগ্রহের নানা বর্ণনা দিতে গিয়ে ৬৬ বছর বয়সী এই কবি (ইকবাল কাগজী) বললেন, ‘তরুণ বয়সে পরিবারের বা নিজের বই কেনার সামর্থ ছিল না। টানাটানির সংসার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাই নাই, বিয়ের পরও সংসারের নানা আর্থিক টানাপোড়ন, এই ধরণের একটা সংসারে বই কেনা, গরীবের ঘোড়া রোগের মত। এমনও দিন গেছে, চাল কিনতে গেছি, চাল না কিনে বই কিনে ফিরেছি, নষ্ট হবার আগে বুঝতেই পারি নি, এতো বই আমার। বই কেনার এই নেশা এক সময় আমার স্ত্রী’রও সহ্য হয়ে গিয়েছিল। বইপত্র ছাড়া আমার বসত বাড়িতে থেমন কিছু ছিল না। ভয়াবহ বন্যায় আমার সকল সংগ্রই নষ্ট হয়ে গেছে। বেশিরভাগ ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু ম-ের মতো অবস্থায় আছে। রোদ পেলেই কিছু শুকানোর চেষ্টা করছি। নষ্ট হওয়া প্রিয় বইয়ের মধ্যে অনেকগুলোই টাকা হলেও পাওয়া যাবে না, আমারতো টাকাও নেই।
ইকবাল কাগজীর প্রিয় বইয়ের মধ্যে- বিশ^ ইতিহাস প্রসঙ্গে জওহর লাল নেহেরু, মানুষের মতো মানুষ, দেশ’এর বই সংখ্যাগুলো, কালি ও কলম’এর পুরনো সংখ্যাগুলো, কালের খেয়ার বহু সংখ্যা, দেবীপ্রসাদ চট্রোপাধ্যায়ের লোকায়তসহ হাজারো প্রকাশনা এখন একেবারে ম- হয়ে গেছে।
বন্যায় সংগ্রাহকদের হাজারো মূল্যবান বই ডুবে নষ্ট
কবি ইকবাল কাগজী দুঃখের সুরে বললেন,‘অর্থের দিক থেকে সব সময় ফকির ছিলাম, বন্যায় তথ্যের দিক থেকেও ফকির হলাম।’
কেবল ইকবাল কাগজী নয়, সুনামগঞ্জের সকল চিন্তাশীল মানুষের বিশাল সংগ্রহে থাকা বইপত্রের ক্ষতি হয়েছে। অনেকের সারাজীবনে জমানো একটি-দুটি করে বই নষ্ট হয়ে গেছে। বই হারানো এসব মানুষেরা পরিবারের অন্য ক্ষতিতে এতো কষ্ট পান নি, যতটা বইয়ের জন্য পেয়েছেন।
সাংবাদিক সজীব দে বললেন, আমি দশম শ্রেণিতে যখন পড়ি তখন থেকেই টিউশন শুরু করি। বই কেনা আমার শখ। সেজন্য মাসের শুরু থেকে টিউশনের টাকা দিয়ে কি কি বই কিনবো তার তালিকা তৈরি করতাম। সে তালিকার মধ্যে অনেক বই সুনামগঞ্জে পাওয়া যেতো না। সেজন্য শুধু বই কেনার জন্য সিলেট যেতে হতো। শিক্ষা জীবন থেকে এখন পর্যন্ত বই ম্যাগাজিন মিলিয়ে চারশ’ বই সংগ্রহে ছিলো। বন্যায় সবগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বাসার অন্যান্য ক্ষতি থেকে বই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ক্ষতি আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।
সাংবাদিক শামস শামীম বললেন, আমি ছাত্র জীবন থেকে বই সংগ্রহ শুরু করেছিলাম। সাহিত্য, দর্শন, সমালোচনা, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই ছিলো। বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে।
শিক্ষক অনুপ নারায়ণ তালুকদার বললেন, অনেক কষ্টে কয়েক’শ প্রিয় বই সংগ্রহ করেছিলাম, ঘরে তিন ফুট পানি হলে, বই পাঁচ ফুটের মতো উঁচুতে রেখেছি, তাতেও রক্ষা হয় নি। সকল বই-ই ডুবেছে। তবে কাগজী ভাইয়ের (ইকবাল কাগজীর) ক্ষতি দেখে কষ্ট পেয়েছি। লেখক মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিনও ইকবাল কাগজীর সংগ্রহশালা নিয়ে একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
লেখক সুখেন্দু সেন বললেন, বন্যায় অনেক মানুষের মূল্যবান বইপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এরমধ্যে এমন কিছু বই রয়েছে যেগুলো চাইলেই, আর পাওয়া যাবে না।
শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বললেন, বন্যায় দুর্লভ অনেক বই নষ্ট হয়েছে। অনেক দুস্প্রাপ্য বই হয়তো আর পাবই না।
সুনামগঞ্জের বৃহৎ পাঠাগার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ বললেন, গ্রামীণ অনেক লাইব্রেরী একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার মধ্যে কবি ইকবাল কাগজীর সংগ্রহশালা অনেক সমৃদ্ধ ছিল। সেখানকার ধংসস্তুপ দেখলে, যে কারো মন খারাপ হয়ে যাবে। কবি কাগজীর ঘরের চাল সমান পানি ছিল। তিনি হাজার হাজার বই রক্ষা করতে পারেন নি।


