বহো জীবন, জল-জোছনায়

উজ্জ্বল মেহেদী
(অকালপ্রয়াত সাংবাদিক-লেখক পীর হাবিবুর রহমানের নাগরিক শোকসভা আজ শুক্রবার। এ দিনটি উপলক্ষে প্রকাশ হয়েছে ‘পীর হাবিবুর রহমান/ জল-জোছনার এক জীবন’ নামক একটি স্মারক। বহুল পঠনে স্মরকের মূল লেখাটি মুদ্রিত হলো এখানে)

একজন পীর হাবিবুর রহমান ‘আমরার’, আমাদের। দেশ বরেণ্য সাংবাদিক, সাহসী লেখক, রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষনিক বিশ্লেষক। দেশে-বিদেশে এক নামেই পরিচিতি তাঁর। ছাত্র রাজনীতির আদর্শিক একটি কালের নেতৃত্ব দিয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা করেছেন টানা তিন যুগেরও বেশি সময়। শুরু রাজনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে। রাজনীতির অন্দর মহলের দুর্বৃত্তায়ন-দুর্বৃত্তপনার মুখোশ উন্মোচন যেমন করেছেন, আদর্শিক রাজনীতি থেকে বিচ্যুত দলকানাদের বিরুদ্ধে কলমে-কণ্ঠে সোচ্চার ছিলেন। ভালোবেসে বুকে আগলে রেখেছেন নীতির রাজনীতি ও নিরন্ন কর্মীদের। লেখালেখির জগতে সেই শুরুর সৌরভ ছড়িয়ে সুবর্ণ সময়েও ছিলেন গৌরবের গরিমায়। মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পক্ষে ছিলেন। অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতার পটপরিবর্তনে সাহসের সঙ্গে গণমাধ্যমে তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ নজর কেড়েছে বিবেকি মানুষের। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংবাদিক সংগঠনেরও। তাঁর কলম ছিল মুক্ত, কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত, মন ছিল ভালোবাসায় পূর্ণ। কঠিন ব্যাধির সঙ্গে লড়েছেন, দৃঢ় মনোবলে জিতেছেন। কিন্তু জিতে ফিরে এসে জীবনের জয়গান আর গাওয়া হলো না তাঁর। আমরা তাঁকে অপ্রস্তুত এক সময়ে অকালে হারিয়ে বিস্মিত বিষাদে ডুবেছি। ‘সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার’-এ পীর হাবিবুর রহমান চিরতরে পাড়ি দিয়েছেন অনন্ত ভুবনে।
তাঁর জন্ম ১৯৬৩ সালের ১২ নভেম্বর, সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরে। বাবা মোহাম্মদ রইছ আলী পীর, মা সৈয়দা রাহিমা খানম। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। বড় ভাই অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান পীর ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সুনামগঞ্জে প্রথমে জেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক এবং দুইবার সভাপতি ছিলেন। ছোট ভাই অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনের দুইবারের সংসদ সদস্য। মহান জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন।
পীর হাবিবের প্রাথমিক শিক্ষা সুনামগঞ্জের কেজি স্কুলে, আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতনে। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ এমএসএস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে জড়ান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি। রাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্যানেলে ‘সিনেট সদস্য’ পদে নির্বাচন করেন। তারও আগে কলেজে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তুখোড় ছাত্রনেতৃত্বের সময় ১৯৮৫ সালে সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগও করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৪ সালে মতিহার ক্যাম্পাস থেকে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতা-লেখালেখির সময় আড়াল করেন নি, বরং লালন করেছেন রাজনৈতিক আদর্শ।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু ১৯৯২ সালে। বাংলাবাজারপত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে রিপোর্টার ছিলেন। সাত বছর পর ১৯৯৯ সালে দৈনিক যুগান্তর প্রতিষ্ঠাকালে অগ্রভাগে বিশেষ সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক ও সংসদ বিট-সাংবাদিকতায় জনপ্রিয় হন। নতুন ধারার দৈনিক আমাদের সময়-এর উপসম্পাদক পদে কিছু দিন কাজ করেন। কলামলেখক ছিলেন বিভিন্ন জাতীয় ও বিদেশি গণমাধ্যমে। নিজস্ব ওয়েবসাইটসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও সমান সক্রিয় ছিলেন। ওয়েব যুগের চাহিদায় প্রতিষ্ঠা করেন অনলাইন নিউজপোর্টাল পূর্বপশ্চিম ডট কম। দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ আমৃত্যু নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। সংশ্লিষ্ট ছিলেন সাংবাদিক সংগঠনেও। জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য ও ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জর্ডান, দুবাই, ইরাক ও ভারত সফর করেন। ১৯৯৯ সালে লন্ডনে ‘বাংলাদেশ উৎসবে’ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন। ২০০০ সালে জাতিসংঘের মিলেনিয়াম সেশন, জর্ডানে আইপিইউ সম্মেলনে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর নেতৃত্বে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার সারথি ছিলেন। দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ছাড়াও বহির্বিশ্বের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ছিল পেশার বাইরে আন্তরিক যোগাযোগ। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে তাঁর ছিল সবিশেষ সখ্য। রাজনৈতিক সংকটে কিংবা সম্ভাবনায় বেসরকারি বিভিন্ন টেলিভিশন টক-শোতে পীর হাবিব ছিলেন অনিবার্য এক মুখ। বেসরকারি টেলিভিশনে ‘আজকের সংবাদপত্র’ ও ‘একুশের রাত’ অনুষ্ঠানে তাঁর নির্মোহ বিশ্লেষণ ও সাহসী বক্তব্য সব অঙ্গনে সমাদৃত হয়েছে। সক্রিয় সাংবাদিকতাকালে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু বই। অফ দ্য রেকর্ড, এক্সক্লুসিভ, টক অফ দ্য প্রেস, ভিউজ আনকাট, রাজনীতির অন্দরমহল প্রভৃতি বই পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা পোয়েট অব পলিটিক্স বইটি বাংলাদেশের অনন্য দলিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা : অজানা ইতিহাস প্রকাশ হওয়া তাঁর সর্বশেষ বই।
দাপুটে সাংবাদিক পীর হাবিবকে মননশীল লেখক পরিচিতি এনে দেয় তাঁর লেখা কয়েকটি ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস। মন্দিরা, লজ্জাবতী, বুনোকে লেখা প্রেমপত্র (পত্র-উপন্যাস), জেনারেলের কালো সুন্দরী উপন্যাস বোদ্ধা পাঠক মহলকে টেনেছিল দারণভাবে। লিখতে চেয়েছিলেন মরমি কবি হাসন রাজার জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস। যেখানে বড় পরিসরে হাসন রাজা লোক উৎসব সুনামগঞ্জে আয়োজনের আদ্যোপান্ত থাকত। আত্মজীবনী লেখারও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অকালপ্রয়াণে তা অসমাপ্ত। সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান ও উল্লেখযোগ্য কাজ নিয়ে তাঁর ৫০ তম জন্মবার্ষিকীতে প্রকাশ হয়েছিল একটি গ্রন্থ ‘প্রামাণ্য পীর হাবিবুর রহমান’। তাঁকে নিয়ে শুভানুধ্যায়ীরা উদযাপন করেন ‘অর্ধেক জীবন’ নামের বর্ণিল একটি অনুষ্ঠান। রাজধানী ঢাকায় ওই অনুষ্ঠানে সম্মিলন হয়েছিল দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তি ও রাজনীতিকের।
এই উদযাপনের এক দশকের মাথায় ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পীর হাবিবুর রহমান আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। এ যেন অর্ধেক জীবনই সঙ্গী তাঁর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ডায়না নাজনিন, ছেলে আহনাফ ফাহিম অন্তর, মেয়ে রাইসা নাজ চন্দ্রস্মিতাকে রেখে গেছেন। আহনাফ ফাহিম অন্তর বাবার ইচ্ছেতে বার এট্ ল (ব্যারিস্টার) করেছেন। চন্দ্রস্মিতা ও-লেভেল পরীক্ষার্থী। ১৯৯৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর শ্বশুর মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি, দেশের খ্যাতিমান আইনজীবী গোলাম আরিফ টিপু।
সাংবাদিকতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরেছেন, বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ চষে বেড়িয়েছেন। কিন্তু জন্মশহর থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি। তাঁর লেখা, কথা ও বক্তব্যে সুনামগঞ্জ ‘জল-জোছনার শহর’, ‘প্রেমের শহর’, ‘কবিতার শহর’ নামে দেশে-বিদেশে ইতিবাচক পরিচিতি পায়। অবস্থা অনেকটা এমন ছিল যে, পীর হাবিব যখন যেখানে যেতেন, যেন সুনামগঞ্জও তাঁর সঙ্গে থাকত। তাঁর মাধ্যমে সুনামগঞ্জ শহরের পরিচিতি এত ব্যাপক বিস্তৃতি হয় যে, মানুষ সুনামগঞ্জ বেড়াতে এসে প্রকৃতিকগতভাবে অন্য রকম সন্তুষ্টি খোঁজে পায়।
ছোটবেলায় পীর হাবিব ছিলেন একটু বেশি চঞ্চল। হাঁটা শেখার পরপরই পায়ে ঘুঙ্গুর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কৈশোরের দূরন্তপনার নানা কাহিনি স্মৃতিতে শ্রুতি হয়ে আছে। ঘুড়ি-মার্বেল-ডাংগুলি, ফুটবল-ক্রিকেট খেলা, খালের জল সেচে মাছ ধরা, ভরদুপুরে পুকুরে সাঁতার কাটা, পাড়ার সবার ঘুম হারাম করা, স্কুলে ক্লাস অশান্ত করে রাখা, সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ফটিক’ চরিত্রকে হার মানিয়েছিলেন বাল্যকালের পীর হাবিব। স্কাউটি, নাটক, পাড়ার ছেলেদের আড্ডা দিয়ে সন্ধায়ই বাসায় ফিরতেন। নৈতিকতায় পারিবারিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে কখনো অতিক্রম করেননি। পারিবার-বন্ধন ছিল মজবুত। যৌথ পরিবার তাঁদের। সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট ক্লাব ‘ফ্যানটম’-এ তাঁরা তিন ভাই মতিউর-হাবিব-মিসবাহ্ একসঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক বোধ থেকে মননে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা জাগ্রত ছিল সেই সময় থেকে। ধর্মীয় সম্প্রীতিতে ঈদ-পূজা-বড় দিনের উৎসবে ছিল তাঁর সমান আনন্দ-উদ্ভাস।
সাংবাদিকতার তিন যুগ-কালে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে নেপথ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সর্বশেষ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে জীবনের শেষ লেখা লিখেছেন হাসপাতাল শয্যা থেকে। নব্বই দশকে সুনামগঞ্জ শহরে বড় পরিসরে দুবার হাসন লোক উৎসবে জাতীয় অঙ্গনের গুণীজনদের একত্রিত করে মিলনমেলায় রূপ দিতে পীর হাবিব ছিলেন অন্যতম একজন অনুঘটক। হাসন লোক উৎসবে বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমান, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ নামকরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সুনামগঞ্জ সফরের পেছনে তিনি ছিলেন অন্যতম এক অনুপ্রাণ।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শান্ত শহর সুনামগঞ্জ শোকস্তম্ভিত হয়। সুনামগঞ্জ পৌরসভার একটানা তিনবারের তৎকালীন চেয়ারম্যান, জোছনাবাদী কবি মমিনুল মউজদীন, স্ত্রী তাহেরা চৌধুরী, তাঁদের কিশোর সন্তান কহলিল জিবরানের মৃত্যুতে ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন পীর হাবিব। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে মমিনুল মউজদীনের নাগরিক শোকসভায় জাতীয় নেতাদের একমঞ্চে করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। জাতীয় নেতাদের উপস্থিতিতে শোকসভায় তাঁর আবেগী বক্তৃতা আপ্লুত করেছিল শোকার্ত সকলকে। স্মরণীয় সেই শোকাসভা নিয়ে এক স্টেডিয়াম শোক নামে একটি ভাষণ পরিক্রমার অডিও সংকলন ও স্মারক বই প্রকাশ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এতে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে তাঁর সেই বক্তৃতাও সংরক্ষিত আছে। মাহদীয়া ক্রিয়েশন নির্মিত এক স্টেডিয়াম শোক উৎসর্গ করা হয়েছে পীর হাবিবুর রহমানকে।
তারুণ্যের টানে সুনামগঞ্জকে খুব ভালোবাসতেন। শহরের প্রতিটি পাড়ার মানুষের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। মন ভরপুর ছিল সম্প্রীতির ঐকতানে। সুনামগঞ্জে জোছনারাত আলোড়িত করত, জল-জোছনার টানে বারবার হাওরে যেতেন, আড্ডায় মাততেন। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সুনামগঞ্জের বাড়িতে ফিরেছিলেন। সুন্দর পরিপাটি, ছায়া সুনিবিড় বাড়িটিতে যেন পীর হাবিবের নাড়ী পোতা। বর্ষার বৃষ্টি বিলাসে, বৃষ্টির ছন্দে-আনন্দে আত্মহারা হতেন। সুনামগঞ্জ নিয়ে হৃৎকলমে ঘুরে ফিরে পীর হাবিব বলতেন, ‘সুনামগঞ্জকে এখনো মনে হয় ভিলেজ টাউন। মনে পড়ে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘরে ফেরা, জোৎস্না-প্লবিত হাওর খুব বেশি টানে, টানে বাউলের আসর, চাঁদের শহর। ঢাকায় পেশার তারে জড়ানো জীবনে যখন ক্লান্তি আসে তখন ফিরে যাই কাঁদাপানিতে বেড়ে ওঠা আমার শহরে…।’
সত্যকে অকপটে অনর্গল বলার অনন্য সাহসী ছিলেন পীর হাবিবুর রহমান। তাঁকে হারানোর হাহাকার এখন হাওরে, বুকের গভীরে আফাল তুলছে। বাংলাদেশ হারিয়েছে বুকচেতিয়ে কথা বলার সৎসাহসী এক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে, প্রান্তসীমার হাওরকন্যাখ্যাত সুনামগঞ্জ হারাল সময়ের অসীম সাহসী সন্তানকে। এমন সাহসের চিহ্ন আর কবে ভাসবে এই কালিদহ সায়রে? মধ্যরাতে টেলিভিশনে টক-শোতে সত্যের তার্কিক অনুরণনে, জোছনার শহর-শান্তির শহর-প্রেমের শহর-আড্ডার শহর বলে শহরবন্দনার উল্লাস-উন্মীলনে কে মাতাবে আর?
শেষ নিঃশ্বাসের পর জোৎস্না-স্নাত প্রিয় এই শহরের মাটিতে মিশে আছেন তিনি। কলম যুদ্ধ-¯্রােতের প্রতিকূলে নিজেই নিজের নির্মাতা পীর হাবিবের নির্মোহ-নিরবচ্ছিন্ন সাংবাদিকতাজীবন প্রোজ্জ্বল এক আদর্শ। শত প্রতিকূলতায়ও হার না মানা তাঁর জীবন-উপাখ্যান এখন জল-জোছনায় বহমান।
বহো জীবন! এই আকুলতায় আশা আছে, পাহাড়-জল-জোছনা প্রকৃতির মায়া অথবা হাওরের আফাল থেকে আবার জন্ম নেবে আরেক পীর হাবিবুর রহমান। এবার আর একলা-একজন নয়, সহস্রজন হয়ে!