বাঁধের কাজে লুকোচুরি

বিন্দু তালুকদার
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধিনে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে নানা অনিয়ম দুর্র্নীতির পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে। কোন হাওরের বাঁধ তৈরিতে কত টাকা বরাদ্দ তা জানেন না হাওরের পাড়ের কেউ।  
পাউবো নীতিমালা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা কর্মসূচি (কাবিটা) প্রকল্পে এবং ঠিকাদার দিয়ে নির্মিতব্য বাঁধের কাজ শুরুর আগে দর্শনীয় স্থানে কাজের বিবরণ, প্রকল্প বরাদ্দ, কাজের পিআইসি/ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানাসহ সবকিছু স্পষ্ট করে লিখে রাখার নিয়ম থাকলেও অনেক কাজেই এখন পর্যন্ত কোন ধরনের সাইন বোর্ড লাগানো হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
তবে পাউবোর উপ সহকারি প্রকৌশলীগণ জানিয়েছেন সকল বাঁধের কাছেই প্রকল্পের বিবরণ দিয়ে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। কাজ পুরোদমে চলছে।
হাওরের পাড়ের কৃষকসহ স্থানীয়দের অভিযোগ প্রকল্পের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি ও কাজে নয়-ছয় করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), ঠিকাদার কেউই কাজের বিবরণসম্বলিত সাইনবোর্ড টানায়নি। যার কারণে কোন প্রকল্পে কত টাকার কাজ হওয়ার কথা তা কেউ জানতে পারছেন না। ইচ্ছাখুশি কাজ করছেন সবাই।
জানা যায়, জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরের বদরপুর গ্রাম থেকে হাওরিয়া আলীপুরের বাঁধ নির্মাণ কাজ বন্ধ আছে। ঘনিয়ার বিল ও রাঙ্গিয়ার বাঁধে গেল বছরের পুরাতন বাঁধের উপরে নামে মাত্র ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পরিমাণে উঁচু করে মাটি ফেলা হয়েছে। কোন          
কাজের কাছে সাইনবোর্ড নেই। হালির হাওরের বিপজ্জনক ভাঙা কাইলানীর খালের কাজেও কোন সাইনবোর্ড নেই।
পাউবো ও ঠিকাদারদের সূত্রে জানা যায়, হালির হাওরের ঠিকাদারী কাজের বদরপুর থেকে ঘনিয়ার কাড়া পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার কাজের জন্য বরাদ্দ ১২ লক্ষ টাকা। হাওরিয়া আলীপুর থেকে ঘনিয়ার বিল পর্যন্ত বরাদ্দ ৩৮ লক্ষ টাকা। এখানে কাজ করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এআর রহমান। পাউবোর হালির হাওরের  রাঙ্গিয়া ডুবন্ত বাঁধের ভাঙ্গা বন্ধকরণ ও মেরামত কাজের জন্য বরাদ্দ পান ১১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা পিআইসি সভাপতি বেহেলীর ইউপি সদস্য আব্দুল হাসিম। উল্লেখিত প্রকল্পগুলোর কোনটিতেই সাইনবোর্ড টানানো হয়নি।
বেহেলী ইউনিয়নের হাওরিয়া আলীপুরের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন,‘হাওরের বাঁধের কাজের ব্যাপারে কেউ আন্তরিক নয়। যেসব বাঁধ হচ্ছে বা কাজ প্রায় শেষ হয়ার পথে তার একটিতেও কোন সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। কোন বাঁধে কত টাকার কাজ তা কেউ জানেন না। পিআইসি ও সাব ঠিকাদারের নিকট কোন কিছু জানতে চাইলে তারা কৃষকদের সাথে দুর্বব্যবহার করে।’
মধ্যনগর থানার চামরদানী গ্রামের কৃষক সুনীল সরকার বলেন,‘আমাদের পাশের বাইনছাপড়া হাওরের বাঁধের কাজের দু’একটিতে সাইনবোর্ড থাকলেও অধিকাংশ বাঁধের কোন সাইনবোর্ড নেই। কোন বাঁধে কি ধরনের কাজ তা কেউ জানে না।’
চামরদানী ইউনিয়নের আলীয়াপুর গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন,‘ টগার হাওরের টগার বাঁধ, কাইলানীর বাঁধ, সুলেমানপুরের বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু কোন বাঁধের কাছেই সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। সিরাকান্দ বাঁধ দিয়ে গত বছর হাওরে পানি ঢুকলেও এইবার এখন পর্যন্ত এক টুকরি মাটিও কাটা হয়নি। আমাদের এলাকার কোন বাঁধেই সাইনবোর্ড নেই।’  
তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের কৃষক মাটিয়ান হাওর কমিটির সদস্য মহিবুর রহমান বলেন,‘মাটিয়ান হাওরে মেশিনবাড়ি বাঁধ, বড়দল স্কুলের বাঁধ, পাঁছনালিয়া বাঁধ, আলমখালী বাঁধ, ছিলান তাহিরপুরের বাঁধ, রতনশ্রী গ্রামের কাছের শয়তানখালী বাঁধের কাজে কোন ধরনের সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। এসব বাঁধের কাজের বরাদ্দ কত টাকা কেউ জানে না। সাইনবোর্ডের বিষয়ে পাউবোর এসওদের কাছে জানতে চাওয়া হলে কোন জবাব পাওয়া যায়নি। অনেক বাঁধের কাজই শুরু হয়নি। কিছু বাঁধে মাত্র ৬-৭ ভাগ কাজ হয়েছে। কাজ যা হচ্ছে সবকিছুইতেই অনিয়ম হচ্ছে।’
হালির হাওরের পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারি প্রকৌশলী (এসও) খন্দকার আলী রেজা বলেন,‘ সব পিআইসি ও ঠিকাদারকে কাজের সাইটে সাইনবোর্ড লাগানোর জন্য বলা হয়েছে। সবাই সাইনবোর্ড তৈরি করেছেন। বাঁধের কাছে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে, হয়তো কারো নজরে পড়েনি। অনেক সময় সন্ধ্যার পর সাইনবোর্ডগুলো খুলে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।’
মাটিয়ান হাওরের পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারি প্রকৌশলী (এসও) শাহ আলম বলেন,‘ আমার দায়িত্বে থাকা সকল হাওরের বাঁধ নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে, বাঁধের কাজ ৪০-৫০ ভাগ হয়েছে। সকল বাঁধের পাশেই সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। স্থানীয় কিছু লোক বাঁধ নিয়ে অহেতুক নানা কথা বলেন। ’