দোয়ারাবাজার উপজেলায় বাঁধ নির্মাণের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ৪ পিআইসির মাধ্যমে অপচয় হচ্ছে ৫৫ লাখ টাকা। তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি বাঁধ পরিদর্শন কালে কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন। জগন্নাথপুর উপজেলায় বাঁধের ৪৫ প্রকল্পের মধ্যে ৫ টি প্রকল্পে কাজই শুরু হয়নি। জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের এক কৃষক বাঁধের ছবি পাঠিয়ে জানিয়েছেন, বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তুলার ফলে বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। হাওরের বাঁধ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামকারী সংগঠন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন বাঁধের কাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। উপরের সব ক’টি ঘটনা গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ থেকে নেয়া। বলাবাহুল্য সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়েই বেশি করে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। জেলার অর্থনীতির মেরুদÐ তথা কৃষিভিত্তিক জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন বোরো ফসল রক্ষায় অপরিহার্য বাঁধের বিষয়টিকে সংগত কারণেই স্থানীয় গণমাধ্যম অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে রাখে। ঠিকাদারি প্রথা বিলুপ্তির পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে শতভাগ বাঁধ নির্মাণ/সংস্কার কাজ শুরু করার তৃতীয় মৌসুম শুরু হয়েছে এবার। আর এই তৃতীয় বছরে এসে পিআইসি ব্যবস্থাটি খুব বেশি সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে গেল। এবার যে অভিযোগটি সবচাইতে বেশি সেটি হলোÑ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও বিভিন্ন প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দান এবং অন্যান্য বছরের চাইতে অনেক বেশি প্রকল্প গ্রহণ/পিআইসি গঠনের মাধ্যমে সরকারি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও এসব অভিযোগের মধ্যে কিছু বাস্তবতা থাকার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। হাওরের বাঁধ প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের এই প্রবণতাটি অতিশয় আত্মঘাতী হিসেবেই আমরা মনে করি। কারণ এর মধ্য দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি তথা স্থানীয় কৃষকদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের গণমুখী ব্যবস্থাটিকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
এবার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ কিংবা বরাদ্দ বেশি প্রদানের বিষয়ে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। পিআইসি গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। একথা সত্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সাথে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের গণমুখী সমঝোতা বা সমন্বয় না ঘটলে নানা ধরনের বিচ্যুতি ঘটতে বাধ্য। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিবৃন্দকে যেখানে বাঁধের যাবতীয় অনিয়ম প্রতিরোধে পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা সেখানে তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ চলে আসাটা দুর্ভাগ্যজনক। এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সরকারি কর্মচারীদের অভ্যাসগত দুর্নীতিপ্রবণতাকে প্ররোচিত করে।
বাঁধের কাজের অস্বচ্ছতা দুরিকরণে ক্ষমতাসীন দল ও জনপ্রতিনিধিদের অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। এছাড়া বাঁধের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদেরও ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করার জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। তিন বছর আগের বিশাল বাঁধ দুর্নীতির বিচার প্রলম্বিত হওয়ার কারণে অনেকেই নতুন করে নতুন রূপে দুর্নীতি সংঘটনের অভিলাষ পোষণ করছেন। তাই বাঁধের কাজটি সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারিতে রাখা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। এই জায়গায় দুর্নীতি দমন কমিশন, পানিসম্পদ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগ দরকার বলে আমরা মনে করি।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কিংবা অতিরিক্ত বরাদ্দের যত অভিযোগ, সেগুলো অতি দ্রæত খতিয়ে দেখে সরকারি অর্থের অপচয় রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুবা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের গণমুখী ব্যবস্থাটির ভবিষ্যৎ হুমকির মধ্যে পড়বে। আমরা চাই না হাওরে আবারও ঠিকাদারি রাজত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে অবাধ লুণ্ঠনের যুগ শুরু হোক। আর এ জন্য জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সচেতন মহল ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে বিশেষ দায়িত্ব নিতে হবে।

