বাঁধে এখনও পড়ছে মাটি বাকি আছে দুর্বা-দুরমুজ

বিশ্বজিত রায়, হালি, শনি ও মহালিয়া থেকে ফিরে
হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের নির্ধারিত সময় শেষ। আরও চার দিন চলে গেছে। এখন পর্যন্ত জামালগঞ্জের কোন বাঁধের কাজই পুরোপুরি শেষ করতে পারে নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। অনেক বাঁধে এখনও মাটি ফেলার কাজ চলমান আছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারগুলোতে মাটি ও দুরমুজের কাজ কোনরকম শেষ হলেও বাকি আছে টেকসইকরণের বস্তা ও বাঁশ পোঁতার কাজ। কোন কোন বাঁধে মাটি-দুরমুজের কাজ শেষ করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বাঁধ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। সেগুলোতে দুর্বা লাগানোর কোন আলামত চোখে পড়েনি।
সবকিছু মিলে ফসল রক্ষা বাঁধ কাজে চরম অবহেলার চিত্র দেখা গেছে। আগামী এক সপ্তাহেও বাকি কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন হাওর পাড়ের মানুষেরা। গত বুধবার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওর ঘুরে এমন বাস্তবতা চোখে পড়েছে। পাগনার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজও প্রায় একই রকম বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন।
জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রলয়ঙ্করী হাওর বিপর্যয়ের পর হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে সরকার। সেই নীতিমালায় ঠিকাদারী প্রথা বাতিল করে স্থানীয় কৃষকের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনপূর্বক ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা শেষ করার বাধ্য-বাধকতা যুক্ত করা হয়। কিন্তু কৃষকের ফসল রক্ষার স্বার্থে সরকার বাঁধ রক্ষা কাজের নীতিমালা পরিবর্তনসহ অঢেল অর্থ ছাড় দিলেও কাজে অবহেলা অনিয়ম রয়েই গেছে। পিআইসি গঠন থেকে শুরু করে সঠিক সময়ে কাজ শেষ না করা এবং মাটি ফেলার কাজে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠছে ফসল রক্ষা বাঁধ কাজে। এ নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ আছে।
৪-৫ বছর পর পর হাওরে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। ২০১৭ সালে হাওর বিপর্যয়ের পর শঙ্কামুক্ত ৪ টি বছর কাটিয়েছেন কৃষকেরা। হাওর ঘুরে দেখা যায়, বদরপুর থেকে শুরু হওয়া হাওড়িয়া আলীপুর পর্যন্ত বাঁধে এখনও দুরমুজের কাজ শেষ হয়নি। এ বাঁধের ঘনিয়ার বিল সংলগ্ন নদী তীরবর্তী একাংশে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে নদীর বাঁক খাওয়া মোড় থাকায় ধীরে ধীরে ভাঙন আরও প্রবল আকার ধারণ করতে পারে। তখন ঝুঁকিতে পড়বে বিশাল হালি হাওর। এর বিপরীত পাড়ের শনি হাওরের অপর বাঁধে মাটি ফেলার কাজ শেষ হয় নি। ওই বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারটি মাটিতে ভরাট হলেও বাঁশ পোঁতাসহ অন্যসব কাজ বাকি আছে। এ হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার লালুরগোয়ালা ও তার লাগোয়া বাঁধে মাটি ফেলা শেষ হয়েছে, কিন্তু মাটি ড্রেসিং ও দুর্বা লাগানোর কাজ করতে কাউকে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, মামুদপুরের ভাঙা থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এ ক্লোজারেও বাকি আছে বাঁশ ও বস্তা ফেলার কাজ। দুর্গাপুরের বিপরীত পাড়ের মহালিয়া হাওরের ৪টি পিআইসির মধ্যে ২টিতে কেবল মাটি ফেলা শুরু হয়েছে। ওই ৭ ও ৮ নম্বর পিআইসি সংশ্লিষ্ট কাউকে বাঁধে পাওয়া যায় নি। এ হাওরের অপর ২টি বাঁধের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু মদনাকান্দির বিপরীত পাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারটিতে বাঁধ টেকসইকরণের কাজ এখনও বাকি আছে। এ অবস্থায় মহালিয়া হাওরটি অরক্ষিত বলে মনে করছেন হাওরের সচেতন মানুষেরা।
অপরদিকে, হালি হাওরের মদনাকান্দি থেকে আছানপুর এবং আছানপুর থেকে হরিপুর পর্যন্ত বাঁধের দু’এক জায়গায় দুরমুজের কাজ চলমান আছে। অন্য বাঁধগুলোতে ঘাস লাগানো ও দুরমুজের কাজ বাকি থাকলেও বাঁধ এলাকায় কাউকে পাওয়া যায় নি। এছাড়া হরিপুর থেকে উলুকান্দি পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বাঁধের মধ্যে কেবলমাত্র ১২ নম্বর পিআইসির কাজ সন্তোষজনক। এরপরের ১০ ও ১১ নম্বর পিআইসিতে মাটি ফেলার কাজ চলছে। এছাড়া জামালগঞ্জের আরেক বৃহৎ হাওর পাগনার বাঁধ রক্ষা কাজও প্রায় একই অবস্থা। এ হাওরের সবচেয়ে বড় ক্লোজার বোগলাখালি বাঁধসহ প্রায় অধিকাংশ বাঁধেই এখনও কাজ চলমান আছে।
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে এ বছর পানি শুকিয়েছে দ্রুত। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ হয় নি। হাওর ঘুরে দেখলাম মহালিয়ার ৭ ও ৮, হালির ১০ ও ১১, পাগনা হাওরের ২৭ ও ৩৩ নম্বর পিআইসিসহ শনি হাওরের একটি বাঁধে এখনও মাটি ফেলার কাজ চলছে। এর মধ্যে অধিক বরাদ্দকৃত ৩৩ নম্বর পিআইসিতে একটু মাটিও পড়েনি। মহালিয়ার ২টি বাঁধে কেবল মাটি ফেলা শুরু হওয়ায় পুরো হাওরটি অরক্ষিত মনে হয়েছে। সিংহভাগ বাঁধে এখনও দুর্বা লাগানো হয়নি এবং দুরমুজ করা হয়নি প্রায় ২০টি বাঁধে। নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ না হওয়ায় জামালগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি হাওর নিয়ে আমরা চিন্তিত।
৩৩ নম্বর পিআইসি সভাপতি জীতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু বলেন, আমি এখন সাইটে আছি। মাটি ফেলার কাজ চলমান আছে। আশা করি মাটির কাজ আজ (বৃহস্পতিবার) শেষ হয়ে যাবে। আর দুর্বা-দুরমুজের কাজ তিন চারদিন লাগতে পারে।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান ও হালি হাওর পাড়ের বাসিন্দা সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আপনারা যে রকম দেখেছেন আমরাও সেরকমই দেখেছি। কথা বলেছি বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য। উপজেলা প্রশাসন সেই কাজ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত আছেন। ইউএনও মহোদয় আশ্বস্ত করেছেন দ্রুতই কাজ শেষ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মনিটরিং কমিটির সভাপতি বিশ্বজিত দেব বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প কমিটিকে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। কাউকে বাড়তি সময় দেওয়া হয়নি। সময় বাড়ানোর ব্যাপারে কোন নির্দেশনা আমরা পাই নি। যারা বেঁধে দেওয়া সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গেল মৌসুমে উপজেলার ৬টি হাওরের ৪৪টি পিআইসিতে বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। চলতি বছর ৮টি পিআইসি কমে ৩৬টির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা।