বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির ৬ দাবি

গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় এনে ক্ষতিপূরণ, ফসল কাটার যথাযথ ব্যবস্থা, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, পর্যাপ্ত কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি। সংগঠনের এক প্রেস বিবৃতিতে বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির এই দাবি জানান।
শুক্রবার এক যুক্ত বিবৃতিতে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারীতে যাতে সংক্রমণ বৃদ্ধি না পায়, তার জন্য সব মানুষকে গৃহবন্দী করে রাখা, গৃহবন্দী কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষদের জন্য ন্যূনতম খাবার নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা প্রদান যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। করোনার আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে যদি কৃষিকাজ বন্ধ থাকে, বাইরে থেকে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী না আনা যায়, দ্বিতীয় ভয়াবহ বিপর্যয়টি শুরু হবে। প্রায় সব রাষ্ট্রে খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি থাকার আশঙ্কা রয়েছে এবার। ফলে বাইরে থেকে খাদ্য কিনে ঘাটতি মেটানোর সুযোগ থাকবে না। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের মধ্যেই কৃষিকাজ বা চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে আগে যেমন কৃষকেরা বীজ উৎপাদন করতেন, এখন আর তা মূলত হয় না। বীজ কিনে চাষাবাদ করা হয়। বর্তমানে বীজ ঠিকমতো পাওয়া না যাওয়ায় বিপদ আরও বাড়বে। এমতাবস্থায় সম্ভাব্য মন্দা বা দু‌র্ভিক্ষ মোকা‌বেলায় এখনই কৃষক ও খামারী‌দের ফসল-পণ্য বিপ‌ননে সরাসরি সরকারী তত্ত্ববধান, চল‌তি মৌসু‌মে ফসল কে‌টে ঘ‌রে তুল‌তে সরকারী তত্ত্ববধা‌নে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, ফস‌ল সরাস‌রি কৃষ‌কের নিকট থে‌কে সরকার‌কে ক্রয় ও আগামী ফল‌নের জন্য বিনাসু‌দে ঋণ, বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থার আহ্বান জানান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ যথাসময়ে সতর্ক হতে পারেনি। করোনার সঙ্গে লড়তে করোনার আগে হাঁটতে হবে, পেছনে নয়। কিন্তু সবাই করোনার পেছনে হেঁটে চলেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মহামারির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বিভিন্ন বিপর্যস্ত দেশের চেয়ে বেশি। বিপদ শুধু করোনার আক্রমণ নয়, রয়েছে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা। করোনার আক্রমণে যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রণালি ভেঙে পড়েছে, সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ, বিদুৎ, পানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। বিশেষ সেবা সচল রাখতে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন সংক্রমণের শিকার না হয়, যেন সুরক্ষা পায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সরকার এখনও পর্যন্ত প্রয়োজনীয় যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের চিকিৎসা প্রস্তুতি করোনার উপযোগিভাবে গড়ে তুলতে পারেনি। সিলেটে করোনা চিকিৎসা প্রদানকারী একজন চিকিৎসক এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদি দায়িত্বরত চিকিৎসকই সেবা না পায় তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হতে পারে! নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, সরকার ও মালিকপক্ষ কর্মহীন সকল শ্রমিক, শ্রমজীবী, ক্ষেতমজুরদের খাদ্যের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অনাহারক্লিষ্ট জনগণের প্রশ্ন করোনা থেকে বাঁচতে না খেয়ে মরবো? দেশে এ পর্যন্ত ২৬টি জেলাকে স্থানীয় প্রশাসন কার্যত পুরাপুরি লকডাউন ঘোষণা করেছে (সুত্র: দৈনিক প্রথম আলো)। অথচ মহামারী ঠেকাতে এখনও সামাজিক সংক্রমণ খুঁজে (ট্রেস) শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করতে পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়নি। দৈনিক প্রথমআলোতে ২৬ মার্চ থেকে পরবর্তি ১৪ দিনে সারাদেশে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ১১৬ জনের মৃত্যু খবর প্রকাশিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা (অন্য দেশের বিগত বা চলমান অবস্থা) দিয়ে বিশ্লেষণ অনুসারে একে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। সরকার এই পরিস্থিতিকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তা না করে ‘সাধারণ ছুটি’ নামে কার্যত লকডাউন হিসেবে চালিয়ে গতকাল বাংলাদেশ সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন-২০১৮’র ক্ষমতাবলে সারাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। অথচ সরকারের প্রশাসন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২ অনুসারে বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে বলছে। অন্যদিকে সরকার যে ৯২ হাজার কোটি টাকার ‘প্রণোদনা’ ঘোষণা করেছে তার সিংহভাগই ঋণ ও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, যার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্থ সংখ্যাগরিষ্ঠরা পাবে কী না সংশয় রয়ে গেছে। ত্রাণের চাল লোপাটের ঘটনা সে আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার কৃষি খাতে যেখানে প্রয়োজন ব্যাপক প্রণোদনা বরাদ্দ সেখানে সরকার কৃষককে ৫হাজার কোটি টাকা ৪% সুদে ঋণের কথা ঘোষণা করেছে যা অগ্রহণযোগ্য। এদিকে করোনা মহামারীতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহে মারাত্মক বিঘœ ঘটায় দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এ‌প্রি‌লের শেষে খাদ্য সঙ্কট দেখা দি‌বে বলে জানিয়েছে পিপিআরসি। তারা জরু‌রি খাদ্য সহ‌যো‌গিতার কর্মসূ‌চি বাস্তবায়‌নের আহ্বান জানিয়েছে। সরকার এ মহাদূর্যোগে সকলকে মৌখিকভাবে এগিয়ে আসতে বললেও কার্যত দলীয় ও প্রশাসনিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার স্ট্যান্ডবাজির ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে। এমতাবস্থায় সম্ভাব্য জাতীয় দূর্যোগের ফলে সৃষ্ট ঘটনার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। এমতাবস্থায় নেতৃবৃন্দ নি¤েœাক্ত দাবিসমূহ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
দাবিসমূহ-
১। কৃষকদের সরাসরি ঋণ নয় প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। কৃষক ও খামারী‌দের ফসল-পণ্য বিপ‌ননে সরাসরি সরকারী তত্ত্ববধান করতে হবে।
২। গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩। ভূমিহীন-দরিদ্র কৃষকদের পর্যাপ্ত খাদ্য প্রদান করতে হবে।
৪। ইরি-বোরো মৌসু‌মে ফসল কে‌টে ঘ‌রে তুল‌তে সরকারী তত্ত্ববধা‌নে ফসল কাটার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫। পেঁয়াজ, ভুট্টা, সকল প্রকার সবজি,‌ ফল ও ধানসহ অন্যান্য ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬। চলতি বুরো মৌসুমে জরুরী বিবেচনায় হাটে-হাটে ক্রয় কেন্দ্র খুলে কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি ধান ক্রয় ও আগামী ফল‌নের জন্য বিনাসু‌দে ঋণ, বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি