বিপর্যয়ে কেউ নেই পাশে ?

ফসল হারিয়ে সুনামগঞ্জের কৃষককূল যখন চোখে অন্ধকার দেখছেন যখন তাঁদের কান্নায় হাওরের আকাশ ভারী হচ্ছে যখন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষগুলো একটি বছর কীভাবে বেঁচে থাকবেন সেই চিন্তায় আকুল জেলার প্রতিটি জনপদ যখন হাওর দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদেমুখর তখন সরকারি মহলে আশ্চর্য এক নির্লিপ্ততা দেখছি আমরা। রাজ্য ডুবছে, প্রজারা অকূল পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, রাজার সেদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই, তিনি বৃষ্টির শব্দের মধ্যে বিসমিল্লাহ খাঁর সানাইর সুর পেয়ে চোখ বন্ধ করে উচ্চমার্গীয় আনন্দলাভে যেন বিভোর হয়ে আছেন। জেলাবাসী অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করলেন যে, ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে জেলার ৯০ ভাগ ফসল হানি ঘটলেও সরকারের কোন দায়িত্বশীল মন্ত্রী এখন পর্যন্ত অকূস্থলে ছুটে আসেন নি। সাধারণত এরকম দুর্যোগ দুর্বিপাকে মন্ত্রী-সচিবদের আনাগুনা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। এবার মাত্র একদিনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মহাপরিচালককে ক্ষণিক সময়ের জন্য দেখা গিয়েছিলো। আর কেউ না। তবে কি সরকার হাওর অঞ্চলের এই মহাদুর্যোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন? এ কী করে হয়? প্রাইম কভারেজ না পেলেও জাতীয় গণমাধ্যমে তো এই ফসলহানির খবর মোটামোটি মধ্যম মানের কভারেজ পেয়েছে। তাঁদের তো এইসব খবরাখবর চোখে পড়ার কথা। সরকারের নিজস্ব যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে তারা কি সরকারকে প্রকৃত তথ্য জানাচ্ছেন না?  ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য সমন্বিতকরণে যে প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান সেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এক ধরনের অবহেলা দেখিয়ে চলেছেন গণমাধ্যম তা ভালভাবেই টের পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকারি প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়-ক্ষতির কোন তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরেন নি। যদিও এরকম দুর্যোগে প্রতিদিনই আপডেট জানানোর দায়িত্ব ছিল তাঁদের। কৃষি সম্প্রসারণের উপ পরিচালক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ তিন হাজার হেক্টরে স্থির হয়ে আছেন। এই তথ্য মোটামোটি চার দিন আগে তিনি জানিয়েছিলেন।  এর মধ্যে জামালগঞ্জের হালির হাওর ডুবেছে। শুক্রবার রাতে তলিয়ে গেছে শাল্লার বৃহৎ ছায়ার হাওর। বড় হাওরের মধ্যে এখন শুধুমাত্র টিকে আছে তাহিরপুরের শনি ও জামালগঞ্জের পাগনার হাওর। গণমাধ্যমের সূত্রমতে ছায়ার হাওর ডুবির পর বোরো ফসলহানি ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলেই ধারণা। এতে করে হেক্টরের হিসাবে তা মোটামোটি পৌনে দুই লাখ হেক্টরের কম নয়। বলাবাহুল্য এই ধরনের ফসলহানি স্বাধীনতার পর আর কখনও হয়নি বলেই সকলে বলছেন। এরকম ভয়াবহ বিপর্যয়েও যদি কৃষিমন্ত্রী, প্রাণীসম্পদমন্ত্রী কিংবা সরকারের অন্য দায়িত্বশীলরা উপদ্রুত অঞ্চল দেখতে না আসেন তাহলে সেটি অতীব দুঃখের বিষয় বৈকি।
রাজনীতি কেন জানি ক্রমশ জনগণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রাজনীতি হয়ে উঠছে ভীষণভাবে আত্মমুখী। রাজনীতিতে ত্যাগ আর দায়বদ্ধতার জায়গা ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। এই জায়গা দখলে নিচ্ছে ভোগবাদীতা, দুর্নীতি, প্রভাবের পরিধি বৃদ্ধির কাজে। এবার হাওর বিপর্যয়ের প্রাথমিক যে কারণটিকে কৃষকরা দায়ী করেছেন সেটিও রাজনীতি উদ্ভূত। পিআইসি-ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে প্রবল দুর্নীতির যে অভিযোগ তার সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাজনীতির। ওইসব নামের আড়ালে যে ব্যক্তিরা অবস্থান করেন তাঁদের আশ্রয়স্থল রাজনীতি। আজ যে কেউ আসছেন না উপদ্রুত এলাকায় তা কি রাজনীতির এই জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই? প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি ছাড়া এই সমাজ এই রাষ্ট্র কখনও টিকে থাকতে পারে না। রাজনীতিকে আবারও গণমুখী করার যে আকাক্সক্ষা দেশের মানুষের সেই জায়গায় সফলতা পেতে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে সকলকে। আর নির্লিপ্ততা দেখিয়ে গেলে একসময় রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হবে সেখানে প্রবেশ ঘটবে প্রবল ঝঞ্ঝার। যা মূলত রাজনীতিকেই স্থানচ্যুত করে দিতে চাইবে।