সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
শাল্লা উপজেলার মুক্তারপুর গ্রামের বাসিন্দা হেমেন্দ্র চৌধুরী। ১৯৩৯ সালের ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণকারী হেমেন্দ্রর যাত্রাগানে হাতেখড়ি হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। এরপর থেকে ঐতিহাসিক, সামাজিক, পৌরাণিক যাত্রা আর ঢপযাত্রা মিলিয়ে প্রায় পাঁচ শ পালায় অংশগ্রহণ করেছেন। এখন ৮২ বছর বয়সে এসেও তিনি দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছেন।
হেমেন্দ্রর বাবার নাম গোবিন্দ চৌধুরী। কাকা শশীভূষণ চৌধুরীর কাছ থেকে অভিনয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে যাত্রায় অভিনয়ের শখ জাগে। তাঁর প্রথম অভিনীত যাত্রাপালা হচ্ছে ‘মানুষ’। শাল্লা উপজেলাসহ হাওরাঞ্চলের অন্তত ৫ থেকে ৬টি উপজেলায় যাত্রাগানে তিনি ‘ওস্তাদজি’ আর ‘তোতা মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর নাম শুনে এখনো যাত্রাগানের আসরে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। কেবল অভিনেতা হিসেবেই নয়, যাত্রাপালার লেখক-নির্দেশক হিসেবেও তাঁর সমান জনপ্রিয়তা। তাঁর লেখা প্রায় ৬০টি মতো ঐতিহাসিক, সামাজিক, পৌরাণিক যাত্রা/ঢপযাত্রার পা-ুলিপি আছে। এর মধ্যে ‘ধ্রুবতারা’, ‘পতিব্রতা সতী’, ‘মালির ছেলে’, ‘সবার উপর মানুষ সত্য’, ‘স্বর্ণলংকা’, ‘সংসার হলো ছারখার’, ‘কলংকিনী মা’, ‘দাদা কেন চোর’, ‘ঠাম্মীর সংসার’, ‘সাগরদিঘি’, ‘এক টাকা’ উল্লেখযোগ্য। শিশুদের জন্য তাঁর লেখা নাটিকা ‘বর্তমান সমাজ’, ‘আঁধার পথে যাত্রী’ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটিকা ‘অপূর্ব প্রতিশোধ’ উল্লেখযোগ্য। ১৯৮০ সালে তাঁর লেখা প্রথম যাত্রাপালা ‘মালির ছেলে’। এটি তিনি উৎসর্গ করেছেন সাহিত্যস¤্রাট বঙ্কিমচন্দ্রকে।
শাল্লা কলেজ প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তাঁর লেখা ও নিদের্শনায় উপজেলা সদরে মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটিকা ‘অমানিষা হলো ভোর’। যা তখনকার সময়ে খুব আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে এসএসসি পাশের পর ১৯৫৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে মনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ব্যক্তি জীবনে তাঁর স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে তপন কান্তি চৌধুরী একটি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক এবং অন্য ২ ছেলের একজন কৃষক ও অন্যজন বিএ পাস করে ফার্মেসির ব্যবসা করেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে বর্ষা চৌধুরী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত।
হেমেন্দ্র চৌধুরী জানান, একবার জেলা স্কুল ইন্সপেক্টর (ডি.আই) যোগেশ সূত্রধর তাঁর বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে এলে তিনি অভিনয় করেন শুনে তাঁকে অভিনয় করার ব্যাপারে অনুরোধ জানান। তখন তিনি ‘উদ্ধবের মা’ নাটিকা থেকে একসঙ্গে তিনজনের চরিত্রে অভিনয় করে দেখান। এতে ইন্সপেক্টর বাবু তাঁর অভিনয়ের খুব তারিফ করেছিলেন। তারপর ‘লোহার জাল’ পালায় গজপতি কার্কুনের খল চরিত্রে অভিনয় করার সময় মঞ্চে এক দর্শক গালাগাল দিতে দিতে লাঠি নিয়ে তাঁর দিকে তেড়ে এসেছিলেন। এসব তাঁর অভিনয় জগতের মধুরতম স্মৃতির মধ্যে অন্যতম।
গত বর্ষায় খালিয়াজুড়ির মুকিমপুরে তাঁর লেখা ‘স্বর্ণলঙ্কা’-তে কালনেমির চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে তাঁর নাম শুনে তাঁকে দেখার জন্য ১০০ থেকে ২০০ লোক জমায়েত হয়। কিন্তু তাঁর বয়স দেখে সবাই নিরাশ হলো। সবাই বলল, ‘এই বুড়া বেটা আর কী অভিনয় করবে?’ কিন্তু পালা শুরু হওয়ার প্রথম এফিয়ারেই তিনি যখন হাসতে হাসতে খুবই স্পিডে মঞ্চে উঠলেন, সবাই বলে উঠলেন, ‘এ বেটা এত শক্তি পেলো কোথা থেকে?’ এ কাহিনিও শোনান হেমেন্দ্র চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আসলে অভিনয়ের সময় আপনা আপনিই আমার শক্তি চলে আসে। চরিত্রের প্রয়োজনে যখন যেভাবে ডায়লগ ও গতি দিতে হয়, আমি এই বয়সেও সেভাবেই করি। নতুবা দর্শকের বাহবা পাব কী করে?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কখনও মনের বয়স বাড়তে দিই না। কেউ আমার বয়স জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি আমার শারীরিক বয়স ৮২, কিন্তু মানসিক বয়স ২৫। যাত্রায় অভিনয় করতে করতে যাত্রামঞ্চেই মানুষের মধ্যে মরতে চাই।’ যাত্রাগানে অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বটতলা রঙ্গমেলা-২০১৯ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব’ উপলক্ষে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর ‘বটতলা বিভাগীয় সম্মাননা-২০১৯’ সম্মাননায় ভূষিত হন।
যাত্রাভিনেতা হেমেন্দ্র চৌধুরী প্রসঙ্গে শাল্লায় জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক সুমনকুমার দাশ বলেন, ‘হেমেন্দ্র চৌধুরী হাওরাঞ্চলের লোকনাট্যধারার এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি। দীর্ঘকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি তাঁর অভিনয় দিয়ে হাওরাঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করে আসছেন। তাঁর মতো প্রবীণ যাত্রাশিল্পীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো উচিত। এত গুরুত্বপূর্ণ একজন সাধক-শিল্পী, অথচ তিনি প্রচারের আলোর বাইরে রয়েছেন। এটা আমাদের জন্য একেবারেই লজ্জার বিষয়। আমি তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করার দাবি জানাচ্ছি।’
সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীন প্রতিভাবান যাত্রাশিল্পী হেমেন্দ্র চৌধুরী ভাটির যাত্রী শিল্প এখনো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আমরা সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমী তাঁকে সম্মননা দেবার উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সহায়তা চাইলে তাঁকে সাধ্যমত সহায়তা করা হবে।




