বিশেষ নিবন্ধ একটি অ্যাম্বুলেন্স ও একজন সিরাজ উদ্দিন

হৃদরোগে আক্রান্ত সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে নিয়ে তাঁর পরিবারের লোকজন যখন ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসলেন তখন রাত সাড়ে আটটার মত বাজে। সিরাজ উদ্দিন সাহেব ওইদিন (৫ জানুয়ারি ২০১৪) বিকেলে মধ্যনগর থানার বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের লোকজন তাঁকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সিরাজ উদ্দিন সাহেব আমার এক বন্ধুর বাবা। ওইদিন আমার বন্ধু সন্ধ্যায় সিলেট থেকে আমায় ফোন করে তার বাবার অসুস্থতার খবরটি জানিয়েছিল।
আমি হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম জরুরী বিভাগের বিছানায় বন্ধুর বাবা শুয়ে গুমরাচ্ছেন। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। চিকিৎসক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের লোকজনের কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই চুপ। তাঁদের ধারণা চিকিৎসক হয়ত এখনই বলবেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু না পরিবারের লোকজনের সেই ভাবনায় ফাঁটল ধরিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিপাকে পড়েন সিরাজ উদ্দিন সাহেবের পরিবার। এই হাসপাতালে তো অ্যাম্বুলেন্স নেই। শুরু হয় একটি অ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করার কাজ। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখলাম না। কেটে যায় পুরো আড়াই ঘণ্টা সময়। পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা, মোহনগঞ্জ, বারহাট্টাকোথাও অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেল না। ওইদিন জাতীয় নির্বাচন থাকায় আমাদের এখানেও সারাদিন সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ ছিল। স্থানীয় লেগুনা সমিতির লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে অবশেষে একটি লেগুনার ব্যবস্থা করা হলো।
লেগুনায় করে রোগী নিয়ে প্রায় শত কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ধর্মপাশা থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালে পৌঁছা অনেকটা কষ্টসাধ্য। লেগুনায় রোগীকে শুয়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক কষ্টে লেগুনায় রোগীকে শুয়ানোর ব্যবস্থা করা হলো। অবশেষে রাত সাড়ে দশটার দিকে সিরাজ উদ্দিন সাহেবের পরিবারের লোকজন তাঁকে নিয়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। কিন্তু তাঁরা গভীর রাতে যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালেন তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
সবাই হয়ত সিরাজ উদ্দিন সাহেবের এই মৃত্যুকে ‘সহজ স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে চালিয়ে দিবেন। তবে  সিরাজ উদ্দিন সাহেবের এমন মৃত্যুকে আমি সহজ কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মেনে নিতে পারছি না। কারণ- যদি বংশীকুন্ডা কিংবা মধ্যনগরে একটি হাসপাতাল থাকতো তবে সেখানে চিকিৎসা হউক আর না হউক অন্তত অন্যত্র রেফার করার নিদের্শতো দিতে পারতো চিকিৎসক। তাহলে তো সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টাটা আরো তিন ঘন্টা আগে করা যেতো।
কিন্তু সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে বংশীকুন্ডা থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  নিয়ে পৌঁছাতে সময় লাগলো প্রায় তিন ঘন্টা। বংশীকুন্ডা থেকে মধ্যনগর পৌঁছাতে তখন যেমন বেগ পোহাতে হত এখনো তেমন বেগ পোহাতে হয়। সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ যত দ্রুত বংশীকুন্ডা থেকে ধর্মপাশায় আসতে পারে তত দ্রুত কোনো রোগী নিয়ে আসা সম্ভব নয়।
বিগত দিনে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধনসহ নানান কর্মসূচি পালন করেছে। অপরদিকে মধ্যনগরেও হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে বেসরকারি সংস্থা বারসিক এর সহযোগিতায় স্থানীয় কাইলানী হাওর কৃষক সংগঠন, কুমার নারী মৃৎ শিল্প সংগঠন, হামলাদীঘা হাওর কৃষক সংগঠন ও হাওর স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম আওয়াজ তুলেছিল।
তাদের এই দাবি অযৌক্তিক ছিল না। কারণ মধ্যনগর থানার ৪ ইউনিয়নের লক্ষাধিক জনগণের চিকিৎসা সেবার জন্য কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকাটা এই যুগে মানানসই নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার একপ্রান্তে অবস্থিত। যে কোনো অসুখে স্থানীয় ফার্মেসিওয়ালারাই ডাক্তারের ভূমিকা পালন করে সেখানে। সর্দি-কাশি, জ্বর, মাথা ব্যাথার চিকিৎসা ছাড়া আর কিছুই হয় না মধ্যনগরে। স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে গেল বছরের ৩০ জানুয়ারি মধ্যনগরে ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে এখনো এর কাজ শেষ হয়নি। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো ফার্মেসি নির্ভর। যদি ওই সময়ে মধ্যনগরে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র থাকতো তাহলে সিরাজ উদ্দিন সাহেবের এমন করুণ পরিণতি নাও হতে পারতো।
আবার ডাক্তার যখন সিরাজ উদ্দিন সাহেবকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করলেন তখন অ্যাম্বুল্যান্সসহ অন্যান্য যানবাহন না পাওয়ায় প্রায় আড়াই ঘন্টা পর লেগুনা দিয়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হলো। ময়মনসিংহ পৌঁছাতে পৌঁছাতে গভীর রাত হলো। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতো তাহলে হয়ত বেঁেচ যেতেন তিনি।
ধর্মপাশা উপজেলায় সড়ক পথে চলাচলকারী একটি অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সড়ক যোগাযোগের জন্য দুর্গম এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গত ২০১১ সালের ১৬ আগস্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়। অযতœ অবহেলায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা দামের এই নৌ অ্যাম্বুলেন্স ধ্বংস হতে চলেছে। এটি এখানে আনার পর প্রথমে ধর্মপাশা থানাসংলগ্ন কংশ নদীতে ও নদীর পানি শুকিয়ে গেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন শয়তানখালী খালে এনে রাখা হয়। বর্তমানে এটি ডাঙায় পড়ে আছে। নৌ অম্বুলেন্স নিয়ে কর্তৃপক্ষ সব সময়ই বিবৃতি দেন যে, চালকের অভাবে একদিনের জন্যেও চালু হয়নি। হাস্যকর বিবৃতি। সত্যিকার অর্থেই এই হাসপাতালে নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের সাথে মশকরা করা সামিল। কোন দিক বিবেচনা করে এখানে নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা আমার বুঝে আসে না। এ অঞ্চলের প্রতিটি মুমূর্ষু রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করা হলে শুধু মাত্র সড়কপথে চলাচল উপযোগী একটি অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে শহরের চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছার আগে প্রায় রোগীরই মৃত্যু ঘটে। একটি অ্যাম্বুলেন্সর অভাবে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এ উপজেলাবাসীর চরম দূর্ভোগের শেষ কোথায়?
ধর্মপাশা হাসপাতালের এক্সরে মেশিনটিও দীর্ঘ বছর ধরে বিকল। তাই এখানে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও নতুন এক্সরে মেশিন সরবরাহের দাবিতে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা ধর্মপাশাবাসী’ গেল বছর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছিল। কিন্তু কোনো ফায়দা হলোনা। আমাদের কথা কেউ শুনে না। কথায় আছে ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায় কিন্তু যারা জেগে ঘুমায় তাঁদের জাগানো যায় না। আমাদের এই আর্তনাদ যাদের উদ্দেশ্যে তাঁরা কি  জেগে ঘুমান?
গেল বছরের ৩০ মে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীতকরণ এবং নবনির্মিত ভবনের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় লোকবলসহ চিকিৎসার যন্ত্রপাতি এখনো সরবরাহ করা হয়নি। তাহলে কি দরকার ছিল এই ভবনের? কি দরকার ছিল এই শয্যা বাড়ানোর? এসব ভবন, শয্যা কিংবা অপ্রয়োজনীয় নৌ-অ্যাম্বুলেন্স যদি সাধারণ জনগণের বা রোগীদের কোনো উপকারে না আসে তাহলে ‘উন্নত হয়েছে’ বলে চিৎকার করে লাভ কি?
চিকিৎসা আমাদের মৌলিক অধিকার। আমরা আমাদের সেই অধিকার শতভাগ ভোগ করতে চাই। মধ্যনগরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কাজ শেষ করে দ্রুত রোগীদের জন্য খুলে দেওয়া হউক। ধর্মপাশা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় লোকবলসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হউক। সরবরাহ করা হউক সড়কপথে চলাচল উপযোগী একটি অ্যাম্বুলেন্স। আর যাতে কোনো সিরাজ উদ্দিনের এমন মৃত্যু না ঘটে।
লেখকঃ সাংবাদিক