বাস্তবত সরকারি কর্মকর্তারা যে অসহায় তার একটি প্রমাণ মিলল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়। উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নে নির্মাণাধীন একটি রাস্তায় নি¤œমানের বালি ব্যবহারের বাধা দেওয়ায় ঠিকাদারের লোকজন এলজিইডি’র প্রকৌশলীকে মারধর করেছেন। ঠিকাদারের পক্ষে এই গুন্ডামি করেছেন যে ব্যক্তিরা তাদের একটি রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। এরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের পাতি নেতা। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে সরকারি উন্নয়ন কাজ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে সিংহভাগ অর্থ আত্মসাত করার সাথে শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই জড়িত থাকেন না, বরং ঠিকাদার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবপুষ্ঠরাই মূলত এই দুর্নীতির পালের গোদা। এদের প্রতিহত করতে না পেরে ভাল কর্মকর্তা কর্মচারীও একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে দুর্নীতির পালে হাওয়া দেওয়া শুরু করেন। দেশ চালান রাজনীতিবিদরা। সুতরাং রাজনীতিতে জড়িত ব্যক্তিবর্গ যদি সৎ না হয় তাহলে সমাজের অপরাপর অংশে সততা আশা করা নিতান্তই বোকামির শামিল। বিশ্বম্ভরপুরে একজন সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছেন যেসব ব্যক্তি তাদের সাহসের উৎস নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়। তারা জানেন, এই পরিচয়ের লেভেল গায়ে আঁটা থাকলে আইন কিংবা প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলা যায়। এমন এক পরিবেশে আমরা সরকারী কর্মকর্তাগণের নিকট থেকে উপযুক্ত কর্মকাণ্ড আশা করি কী করে?
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরপর অনেকগুলো বড় আকারের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে গেল। মিছাখালি রাবার ড্যাম, বিশ্বম্ভরপুর-শক্তিয়ারখলা রাস্তা কিংবা এই ধনপুর ইউনিয়নের রাস্তা অবধি তার বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ নয়। এর বিস্তৃতি সকল উন্নয়ন কাণ্ডেই ঘাতক জীবাণুর মতো লেগে আছে। তার কতকগুলো প্রকাশ্যে আসে আর বেশির ভাগই থেকে যায় পর্দার অন্তরালে। তবে আশার কথা হলো স্থানীয়দের প্রতিরোধ অথবা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, যে কারণেই হোক বিশ্বম্ভরপুরের ঠিকাদারি দুর্নীতিকাণ্ডে কিছুটা প্রশাসনিক তদারকির পরিচয় মিলেছে। মিছাখালীকাণ্ডে দুই প্রকৌশলী সাময়িক বরখাস্থ হয়েছেন, শক্তিয়ারখলা রাস্তায় ঠিকাদার মানসম্মত বিটুমিন ব্যবহারে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নজির এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। আর একারণেই বোধ করি ঠিকাদাররা ক্রমশ আরও দুর্বিনীত হয়ে উঠছেন। এই বেপরোয়াত্বকে রোধ না করা গেলে এই দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় বারে বারে হুছট খাবে।
যে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা একজন প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করেছে সেই দলের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে দায়িত্ব নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নেতৃবৃন্দের মনে রাখা উচিৎ এই সব অসৎ লোকের কারণে জনগণের কাছে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি বিপন্ন হয়। এই দুর্বৃত্তরা কোন কালে কোন দলের উপকার করতে পারেনি। এরা প্রতিকূল সময়ে দলের ধারেকাছে ভিড়ে না। এরা সর্বদাই সুযোগসন্ধানী এবং বসন্তের কোকিল। সরকার প্রধান দেশকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সেটিকে সফল করতে অবশ্যই তৃণমূল নেতৃবৃন্দকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। নতুবা একটা সময়ে ওই মাঠের আধআনি নেতাদের সাথে আপনারাও ভাবমূর্তির সংকটে পতিত হবেন।
সরকারি কাজে বাধা দানের অপরাধের বিচারের জন্য দেশে উপযুক্ত আইন আছে। আমরা আশা করব এক্ষেত্রে তার প্রয়োগ ঘটাতে কেউ বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়াবেন না। সরকারি প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান এইসব মেঠো মাস্তানের ভয়ে আপনারা কর্তব্যচ্যুত না হয়ে দেশ ও এলাকার স্বার্থে দায়িত্ব পালনে অটল থাকুন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মধ্য দিয়ে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির প্রতিবিধান করুন। দুর্নীতির মৃগয়াক্ষেত্র বানাতে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তৎপর রয়েছেন তারা গণশত্রু হিসাবেই বিবেচিত হবেন।

