বিসিকের প্রণোদনা বিতরণ নিয়ে ‘মুখ দেখে মুগের ডাল’

করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য যে প্রণোদনা তহবিল দেয়া হয়েছে, সুনামগঞ্জ বিসিকে তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার হয়নি বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে ধারণা পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পাঞ্চলে উদ্যোক্তা আছেন ২৬ জন। সরকার করোনা প্রণোদনা তহবিল থেকে সুনামগঞ্জ বিসিকের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেন। মূলত এই প্রণোদনা তহবিলের উপর ২৬ জন উদ্যোক্তারই হক রয়েছে। কারণ করোনার অভিঘাতে সকল উদ্যোক্তাই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু বিসিক কর্তৃপক্ষ ২৬ জন উদ্যোক্তার প্রতি সমান মনোযোগ না দিয়ে মাত্র ৪ জন উদ্যোক্তাকে ৪০ লাখ টাকা থেকে ৩৫ লাখ টাকা সহায়তা বিতরণ করে ফেললেন। অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা শিল্পনগরীর বাইরের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণে ২২ জন উদ্যোক্তা সরকারি সহায়তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন। বিসিক কর্তৃপক্ষ ২৬ জন উদ্যোক্তা থেকে কোন্ মানদ-ের ভিত্তিতে মাত্র ৪ জনকে বেছে নিলেন এবং এটি প্রণোদনা বিতরণের সরকারি নীতিমালার আলোকে সঠিক হয়েছে কিনা সেই ব্যাখ্যা জানা যায়নি। তবে বিসিকের উদ্যোক্তাগণের বক্তব্য থেকে জানা যায়, করোনার কারণে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে উৎপাদন সীমিত করে ফেলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বেতন না দিতে পারায় বহু কর্মচারী চাকুরিচ্যুত হয়েছেন। ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে তোলার জন্য যারা অনেক কষ্ট করে মূলধন বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের মূলধন অবক্ষয় ঘটেছে। সুতরাং ২৬ জন না হোক শিল্পনগরীর কার্যকর উদ্যোক্তারা যাতে প্রণোদনার টাকা সমভাবে পেতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা বিসিক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিলো।
সব চাইতে আশ্চর্য বিষয় হলোÑ প্রণোদনা প্রাপ্তদের একজন সরকারি চাকুরিজীবী। তিনি কোন্ বিবেচনায় বিসিকের প্লট বরাদ্দ পেলেন আর কীভাবে প্রণোদনার টাকাই পেলেন, কোনোটাই আমাদের বোধগম্য নয়। সরকারী কর্মচারীরা সাধারণত: ব্যবসায় করতে পারেন না। অথচ এই শিল্পনগরীতে বহু বছর যাবৎ ওই সরকারী চাকুরীজীবী দিব্যি ব্যবসা করে চলেছেন। বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছেন ওই ব্যক্তির সরকারি চাকুরি করার তথ্য তাদের জানা নেই। এটি কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হতে পারে না। তারা যথেষ্ট খোঁজ খবর না নিয়ে কিংবা অন্যভাবে প্রভাবিত হয়ে তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছেন বললে অযৌক্তিক হবে না। সরকারী কর্মচারীটি যেমন সরকারী অনুমতি ছাড়া ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে বেআইনী কাজ করেছেন তেমনি বিসিক কর্তৃপক্ষও তাকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে বিধি বহির্ভূত কাজে জড়িয়েছেন। একজন সরকারী চাকুরীজীবীকে সুবিধা দানের মাধ্যমে মূলত প্রকৃত উদ্যোক্তা অন্তত একজনকে বঞ্চিত করা হলো বলে আমরা মনে করি। এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ওই সরকারী কর্মচারীর নিয়োগকারী দপ্তর ও বিসিক উভয়েরই এখন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেন তা দেখার জন্য।
সুনামগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরী নিয়ে অনেক হতাশা রয়েছে। এর বেশ কিছু প্লট খালি পড়ে আছে বলে বেশ আগে একটি সংবাদ হয়েছিলো। প্রকৃত উদ্যোক্তার অভাব রয়েছে জেলায়, এমনটিই তখন জানিয়েছিলেন বিসিক কর্তৃপক্ষ। যারা প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন তাদের অনেকে যে কাজের কথা বলে বরাদ্দ নিয়েছেন সেই কাজে প্লট ব্যবহার না করারও অভিযোগ উঠেছিলো। সুনামগঞ্জ একটি প্রান্তিক জেলা। এখানে কর্মসংস্থানের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে বিসিক শিল্পনগরী কর্মসংস্থানের জায়গায় বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতো। উদ্যোক্তা তৈরির এই ব্যর্থতার জন্য বিসিকও দায় এড়াতে পারবে না। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি করোনা প্রণোদনা তহবিল নিয়ে ‘মুখ দেখে মুগের ডাল’ বিতরণের যে হতাশাজনক খবর পাওয়া গেলো তা সম্ভাবনাময় এই শিল্পনগরী নিয়ে চলমান হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিলো।