সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সম্মানী গ্রহণের মাধ্যমে বৈকালিক সেবা দানের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে আড়াই মাস গত হয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও দেশের ৫১টি হাসপাতালে চালু হওয়া স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। বরং বলা ভালো প্রচার-প্রচারণা ও আন্তরিকতার ঘাটতি সহকারে এই কর্মসূচিটিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরকম অবস্থায় গতকাল আরও ১০০টি হাসপাতালে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার দৈনিক সমকালে ‘বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায় গোধূলির ছায়া’ শিরোনামে দেশের ১০ হাসাপাতালে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি করা সংবাদে এই বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবাচিত্রের হতাশাজনক তথ্য উঠে এসেছে। বৈকালিক সেবাকেন্দ্রগুলোতে রোগিদের ভিড় নেই কিন্তু পাশের বেসরকারি চেম্বারে রোগির উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে বলে ওই সংবাদে তথ্য উঠে এসেছে। নির্ধারিত তালিকা অনুসারে চিকিৎসকদের চেম্বার না পাওয়ার কথা এসেছে। রোগীরা চিকিৎসক না পেয়ে অন্যত্র চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। এরকম অবস্থায় সাধারণ রোগিদের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার এই সুযোগটি আতুড় ঘরেই মারা পড়তে যাচ্ছে বলে অনুমিত হয়। বিদ্যমান এই অবস্থায় নতুন করে আরও ১০০ হাসপাতালে এই সেবা সম্প্রসারণের খবরটি আমাদের যেরকম খুশি করার কথা ছিলো সেরকম করতে পারছে না।
এই সেবা দান কাজ শুরুর পর্যায়ে আমরা বেশ আশান্বিত হয়েছিলাম। বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় মন্তব্য প্রকাশ করে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর। সরকারি হাসপাতালে টাকার বিনিময়ে সেবা পাওয়ার বিষয়টি অনৈতিক হলেও বিদ্যমান সেবাকাঠামোর দুর্বলতা বিবেচনায় মন্দের ভালো হিসাবে আমরা এই কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছিলো, বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিকে অর্থবহ, রোগিবান্ধব ও প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। এই সেবার বিষয়ে কোনো প্রচার প্রচারণা ছিলো না। হাসপাতালের চেম্বারে চিকিৎসকরা নিয়ম করে বসেন না। দৈনিক সমকালের রিপোর্ট থেকেই জানা যায়, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চেম্বারে রোগি না থাকার কথা স্বীকার করে বলেছেন, রোগি আসলে চিকিৎসককে প্রাইভেট চেম্বার বা বাসা থেকে ডেকে এনে সেবা দেয়া হয়। এরকম কেন হবে? শিডিউল অনুসারে চিকিৎসক চেম্বারে থাকবেন এমনই কথা। এর ব্যত্যয় মানেই রোগিরা এই ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন। বাস্তবে তাই হচ্ছে। যেখানে সাশ্রয়ী খরচের কারণে রোগির ভিড় লেগে থাকার কথা ছিলো সেখানে ছিমছাম নিরবতা। এই নিরবতাই প্রমাণ করে ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে চাওয়া হচ্ছে না।
আমাদের দেশে এখন সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়া ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি খাত এমন ব্যয়বহুল হয়ে গেছে যে নি¤œবিত্ত দূরে থাকুক মধ্যবিত্তরাও এই সেবা কিনতে রীতিমতো হিমশিম খান। সরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞতা আমাদের সকলের জানা। এরকম অবস্থায় নাগরিকদের অনেকেই বিনাচিকিৎসা বা অপূর্ণাঙ্গ চিকিৎসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ আমাদের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াকে মৌলিক অধিকারের পর্যায়ভুক্ত করে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা পেশাটি অতিশয় সংবেদনশীল ও মানবিক। এই পেশায় জড়িতদের সকলকেই দরদী ও অনুভূতিপ্রবণ হতে হয়। কিন্ত আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর উল্টোচিত্র দেখি। এই মানবিক পেশাটি দিন দিন অতি বাণিজ্যিকরণকৃত হয়ে সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোর বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাটি ফলপ্রসূ ও অধিকতর কার্যকর হয়ে উঠুক এমনটি আমরা কামনা করি। সরকারের উদ্দেশ্য তাই। এজন্যই সেবা সম্প্রারণ করা হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িতদের সরকারের এই মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে হবে। তবেই এই সেবা থেকে গোধূলির ছায়া দূর হয়ে ¯িœগ্ধ ও নরোম আলোর বিচ্ছুরণ ঘটবে। দিন ও রাতের সন্ধিক্ষণ গোধূলি। তেজি রোদ মাথার উপর থেকে নেমে যাওয়ার পর যে শান্তিময় বিকাল তা গোধূলি পর্যন্ত প্রবহমাণ। এই স্নিগ্ধ সময়টুকুকে রোগিদের জন্য ভরসার সময় করে দিতে পারেন চিকিৎসাসেবকরা।


