সুনামগঞ্জ জেলায় শতকরা ৯৪.১৩ ভাগ পাসের হার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সিলেট শিক্ষা বোর্ডসহ সারা দেশের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। সুনামগঞ্জ জেলায় ১২৬৫৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে এই ফলাফল অর্জিত হয়েছে। জিপিএ -৫ পেয়েছে ২৫৯ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৯৩জন ছেলে ও ১৬৬ জন মেয়ে। ফলাফল বিশ্লেষণে ছেলেদের চাইতে মেয়েরাই এগিয়ে আছে। বিগত বেশ ক’ বছর ধরেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভাল করছে। মেয়েদের এই অগ্রগতি প্রমাণ করে তারা এখন সব ধরনের প্রতিযোগিতায় সমান তালে লড়ার উপযোগিতা অর্জন করেছে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের অগ্রগমনই মূলত জাতীয় উন্নতিকে তরান্বিত করে। মেয়েদের এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির আগাম বার্তা ঘোষণা করে। অভিনন্দন এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সকল পরীক্ষার্থীদের। এবার করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ছোট সিলেবাসে কম বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে এবং স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। পরীক্ষা গ্রহণের সাথে জড়িত শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ এজন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাঁরাও অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।
এই শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য এক বিড়ম্বনাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে। মূলত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই তথাকথিত ভর্তি কোচিং -এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁদের এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা যে অরাজক অবস্থায় ফেলে রেখেছি সেখানে এইচএসসি পাস করার পর কে কোথায় ভর্তি হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। একই পরীক্ষার্থীকে মেডিক্যাল, প্রকৌশল, কৃষি বিশ^বিদ্যালয়সহ সাধারণ ও বিশেষায়িত আরও অন্তত অর্ধশত বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হবে। সকালে এক পরীক্ষা তো বিকালে আরেকটি। আজ সিলেটে তো কাল রাজশাহীতে। ভো দৌঁড় শুরু হয় ভর্তিচ্ছুক ও তাদের অভিভাবদের। কত টাকা খরচ হয় এতে তার কোন হিসাব নেই। মেয়ে শিক্ষার্থীদের এ খাতের খরচ দ্বিগুণ তিনগুণ হয়ে যায়। শিক্ষায় এগিয়েছে এমন কোন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য এরকম যন্ত্রণাদায়ক ব্যবস্থা রয়েছে কি-না আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের দেশে যে আছে তা অভিভাবক ও শিক্ষার্থী মাত্রই জানেন। নৈরাজ্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে এইচএসসি পাস করা সকল শিক্ষার্থীকেই এই মহাবিড়ম্বনার সামনে পড়তে হবে। অথচ শিক্ষা-চিন্তকরা একটু উদার হলেই এমন অবস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের রেহাই দিতে পারেন। মূলত এইচএসসি পর্যায় পর্যন্ত আগের ১২ বছরের শিক্ষা জীবনের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পরবর্তী উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রবেশ করার পথ নির্ধারিত হওয়ার কথা। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এই মূল্যায়ন হয়ে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু আমাদের দেশে পাস করা সকল শিক্ষার্থীই মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়। কেউ কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে চান না। এতে করে যেটা হয় তা হলÑ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবাঞ্ছিত ভিড় তৈরি হয়। আর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ইচ্ছার কারণে এই অবাঞ্ছিত ভিড়কে লালন করা হয় । যত বেশি পরীক্ষার্থী তত বেশি আয়, আয়ের বণ্টন থেকে ভাল অংকের সুবিধা পেতে এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-প্রশাসকরা বেশ উৎসাহী। এই বাণিজ্যিক মনোভাবকে রুখতে না পারলে আমাদের কোমলমতি সন্তানদের ভবিষ্যৎ অশুভ।
প্রকৃত মেধা যাতে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ পায় তার অবারিত সুযোগ তৈরি করা একটি শিক্ষা-বান্ধব সমাজের দায়িত্ব। শিক্ষাকে মানবিক ও বহুমুখী করাও দেশের সকল খাতের সুষম উন্নয়নের জন্য জরুরি। এই জায়গায় রাষ্ট্রের একটি সঠিক অর্থবহ শিক্ষা দর্শন থাকা আবশ্যক। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে এরকম কোন দর্শন নেই। তাই উচ্চশিক্ষা স্তরে পরিকল্পিত ও উপযুক্ত মেধা-বিকাশ-পরিবেশের বদলে আমরা এখন বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও কুৎসিৎ একটি অসম প্রতিযোগিতা দেখতে পাই। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

