স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ পৌরবাসীকে এক কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছে ভারত সরকার। সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত’এর হাতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের চাবি তুলে দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার নীরাজ কুমার জায়সওয়াল।
চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, সিভিল সার্জন ডা. শামছ উদ্দিন আহমদ, শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল, জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অসিম চন্দ্র বণিক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সাঈদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেছেন, বন্ধুপ্রতিম ভারতের সরকার সবসময়ই বাংলাদেশের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সহযোগিতা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশ। করোনা যুদ্ধেও বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে ভারত। ভারতের দেওয়া জীবন রক্ষাকারী একটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স’এর চাবি সুনামগঞ্জ পৌরসভায় হস্তান্তর করা হচ্ছে, এটি নিশ্চয়ই আনন্দের খবর। এই উপহারের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একইসঙ্গে সিলেট উপ-হাইকমিশনে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার নীরাজ কুমার জায়সওয়ালকে ধন্যবাদ জানাই। তিনিও বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট রাখার জন্য কাজ করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য সকলের প্রতি দোয়া চেয়ে বলেন, তাঁর (প্রধানমন্ত্রীর) সকল ভাবনা দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে।
ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার নীরাজ কুমার জায়সওয়াল বলেন, সুনামগঞ্জ হাওরের জেলা, এ জেলার মানুষ খুব পরিশ্রমী। এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। ভারতের সরকার প্রধানও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজে লাগানোর জন্য তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ইতিমধ্যে দিয়েছেন। এর একটি আজ সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়রের হাতে তুলে দেওয়া হলো। আমাদের মনে হয়েছে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র কর্মট-পরিশ্রমী মানুষ। তিনি এই অ্যাম্বুলেন্সটি যতœসহকারে রাখবেন, মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজে লাগাবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসাবে করোনাকালীন সময়ে লাইফ সাপোর্ট এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত সরকার ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছে। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের গুণী মরমি সাধকদের গানের কথা এই অঞ্চলের মানুষকে মিলে মিশে থাকতে উজ্জীবিত করে, অনুপ্রাণিত করে। এই অঞ্চলের মরমি সাধক রাধারমণ, হাছনরাজা, শাহ্ আব্দুল করিম’এঁর নাম বাংলাদেশে আসার আগেই শুনেছি, তাঁদের মরমিয়া গানের সঙ্গে আমি আগে থেকেই পরিচিত। এই মরমিয়া সাধকদের গানের আদান-প্রদান হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্সটি ভারতের জনগণের পক্ষ থেকে উপহার দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসেছিলেন বাংলাদেশে। তখন কথা দিয়েছিলেন ১০৯ টি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেবেন বাংলাদেশকে। এর অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জে তৃতীয় অ্যাম্বুলেন্স উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। আশা করি এই লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। এই অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্যারামেডিকেল লোক ও চালক প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ পৌরসভার সক্রিয় মেয়র এই জিনিসগুলো পূরণ করতে পারবেন।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মহিবুর রহমান মানিক বললেন, শ্রদ্ধা জানাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি, যার ডাকে এক সাগর রক্তের মাধ্যমে স্বাধীনতা এসেছে। শ্রদ্ধা জানাই, সেই সময়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যিনি সারা দুনিয়ার জনমতকে গড়ে তুলার জন্যে এবং বাংলার স্বাধীনতার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং যার চেষ্টার ফলশ্রুতিতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি সেই প্রয়াত নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির প্রতিও।
তিনি বলেন, ভারতের সাথে আমরা রক্ত ঋণে আবদ্ধ, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু বাংলার মানুষ নয়, ভারতের জনগণ আমাদের এককোটি মানুষকে নয় মাস তাদের জায়গা, খাবার ভাগাভাগি করেছে। আজকের ভারতের যে অবস্থা তখন এই অবস্থা ছিলো না। কিন্তু সেই সময়ও তারা আমাদেরকে ঠাঁই দিতে কার্পন্য করেননি। আমাদের স্বাধীনতার জন্যে ভারতের জনগণ, মিত্রবাহিনী সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।
এমপি মানিক বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন। তখন বৈশি^ক মহামারি থেকে বাঁচতে তিনি সাথে করে আমাদের জন্য ভ্যাকসিন নিয়ে এসেছিলেন। আজকে যে অ্যাম্বুলেন্স দেয়া হয়েছে , সেটি স্বাভাবিক কোনো অ্যাম্বুলেন্স নয়। খুবই আধুনিক এবং জীবন রক্ষাকারী।
তিনি বলেন, জেলায় ৩ টি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেলো। জেলার তাহিরপুরে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স দেয়া হলে পরিপূর্ণতা পাওয়া যাবে। এই ভালোবাসার মাধ্যমে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য সুবিধার যে অপ্রাপ্তি ছিলো, কিছুটা হলেও পূরণ হবে।
অনুষ্ঠানে ভারতীয় সহকারি হাই কমিশনার নীরাজ কুমার জায়সওয়াল ও দ্বিতীয় সচিব টিজি রমেশকে সুনামগঞ্জ পৌরবাসীর পক্ষ থেকে ক্রেস্ট, এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বইসহ নানা উপহার তুলে দেন- নারীনেত্রী শীলা রায়, মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, কবি মুনমুন চৌধুরী, গৌরী ভট্টাচার্য, ঝরণা বখ্ত এবং সুনামগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলরগণ।
সভাপতির বক্তব্যে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত বলেন, সুনামগঞ্জের পৌর নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য আমি একটি অ্যাম্বুলেন্স’র স্বপ্ন দেখতাম। আমি নিজে ভালো গাড়ি ব্যবহারের চিন্তা করি না। মোটরসাইকেলে ঘুরে পৌরবাসীর কাজ করার চেষ্টা করি। আজ একটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স’র স্বপ্ন পূরণ হলো। আজকের দিনটি আমার জন্য অনেক পরিপূর্ণতার। আজ আমার জন্মদিন। এইদিনে বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্রের একটি বড় উপহার আমার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এটি অনেক আনন্দের। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই ভারত সরকারের প্রতি।
চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পৌরসভা।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীনের সঞ্চালনায় এই পর্বে বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন দত্ত, দুর্বিণ শাহ ও মরমি কবি হাছন রাজার গান পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীরা।
এর আগে সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, ভারতীয় সহকারী কমিশনার নীরাজ কুমার জায়সওয়াল, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন, সিলেট’এর দ্বিতীয় সচিব টিজি রমেশ ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত সুনামগঞ্জ পৌরসভা চত্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান। এসময় অতিথিরা পৌর চত্বরে দুট ফলজ বৃক্ষও রোপণ করেন।
- পরিবহণ খরচের টাকা হিসাবরক্ষকের পেটে
- পৌরসভাকে ভারতের অ্যাম্বুলেন্স উপহার- এর উপযুক্ত কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে


