ভাল স্থানীয় সরকারের জন্য সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা প্রয়োজন

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ পর্যন্ত ৯২ প্রাণহানি ঘটেছে বলে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ পরিবেশন করেছে। শুধু শনিবারের নির্বাচন চলাকালেই মারা গেছেন ৯ ব্যক্তি। আহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬০০। জাল ভোট দেয়া, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালটে সিল মারা, ভোটকেন্দ্রে হামলা এমন নির্বাচনকালীন অপতৎপরতার সাথে নির্বাচনপূর্ব ব্যাপক মনোনয়ন বাণিজ্য এবং প্রার্থী বাছাইয়ে নানাবিধ অনিয়ম-অভিযোগসহ নির্বাচন পরবর্তী প্রতিহিংসাপরায়ণতা রাজনৈতিক ইউপি নির্বাচনকে অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে সকলের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনী সহিংসতা কিংবা মনোনয়ন বাণিজ্য যাই বলা হোক না কেন, প্রায় সবক্ষেত্রে প্রধান অভিযুক্ত সংগঠন হিসাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নামই উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থীর সাথে দলের এক বা একাধিক প্রার্থীর প্রতিযোগিতা অনেকক্ষেত্রে রীতিমতো যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বহু ইউনিয়নে মূল প্রার্থীদের ধরাশায়ী করে দলীয় বিদ্রোহীদের বিজয়লাভ মনোনয়ন প্রদানের দুর্বলতাকেই প্রকটিত করেছে। নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যত দুর্বল ভূমিকা নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং পঞ্চম ধাপের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এটুকো বলা অসঙ্গত হবে না যে, রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম ইউপি নির্বাচনটি নিজের উপযোগিতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে এ নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক আলাপ-আলোচনা হবে এবং প্রচলিত পদ্ধতিটির পরিবর্তনও হতে পারে।
দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যেহেতু কোন না কোন রাজনৈতিক দল থাকেন সেহেতু সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধির দায়িত্বে থাকলে একঅর্থে দেশ পরিচালনা সহজ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমনকি আমাদের পাশ্ববর্তী ভারতের স্থানীয় সরকার কাঠামোও রাজনৈতিক পরিচয়েই নির্বাচিত হয়। রাজনৈতিক দলের মেনিফেস্টো বাস্তবায়নের জন্য মাঠ পর্যায়ে একই মতাদর্শে নিবেদিত ব্যক্তিবৃন্দের সমাবেশ ফলদায়ক হয়Ñ এমনটিই বিবেচিত হয়ে থাকে। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সমন্বয়কে ছাপিয়ে অসৎ ও অনৈতিক কার্যকলাপ প্রাধান্য পেয়ে যায় তখন বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে পড়ে বৈকি। আমাদের দেশে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রথম ইউপি নির্বাচনটি অনুরূপ বিতর্কের সূচনা করেছে। সুতরাং ব্যবস্থাটি ভাল হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ের সীমাবদ্ধতার কারণে এর ভাল ফল ঘরে তোলা সম্ভব হলো না, এই আফসোস সকলের মধ্যেই থাকবে।
আসলে রাজনীতি ক্রমশ দুর্বৃত্তায়িত হচ্ছে। এর প্রতিফলন ঘটছে সকল স্তরের নির্বাচনসহ প্রশাসনিক স্তরগুলোতে। আজ সর্বত্র এক সর্বগ্রাসী দুর্নীতিপ্রবণতার মহোৎসব চলছে। সকলেই কোন কিছু পাওয়ার পিছনে ছুটছেন। এই ছুটতে যেয়ে ন্যায়-সমতা-সততা যে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে সে খেয়াল করছেন না কেউ। রাজনৈতিক পরিকাঠামোর জন্য এ এক মহা অশনিসংকেত। রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা এখন সবচাইতে জরুরি জাতীয় দায়িত্ব হওয়া উচিৎ। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই সংশোধিত হবে খারপ যত অনুষঙ্গ সমাজদেহে বাসা বেধেছে তার সবকিছু। অবধারিতভাবেই তখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বর্তমান আগ্রাসী অবস্থারও পরিবর্তন ঘটবে। সুতরাং একটি ভাল স্থানীয় সরকার কাঠামো দাঁড় করানোর অপরিহার্য পূর্বশর্ত সৎ ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চায় মনোনিবেশ করা সকলের কর্তব্য।
সামনের শনিবার জেলার শেষ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়। জেলার এ যাবত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো শান্তিপূর্ণভাবে এবং বড় কোন অভিযোগ ছাড়াই শেষ হয়েছে। জাতীয় পরিস্থিতির সাথে তুলনা করলে জেলার নির্বাচনী পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করতে হয়। এজন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী, ভোট পরিচালনাকারী প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ ভোটারদের সহিষ্ণুতা ও দায়িত্বশীলতা প্রশংসিত হয়েছে।  ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকবে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি।