ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) এখানে ঘটেছে অর্থের প্রসার।”(১২) ভাষাপরিসরে প্রচলিত জনবোধ্য শব্দের মধ্যে নিহিতার্থের রূপান্তর অর্থাৎ শব্দার্থের দ্যোতনার বিবর্তন সংঘটিত হয় কালপরিক্রমার সঙ্গে সঙ্গতিরক্ষার কল্যাণে। প্রকৃতপ্রস্তাবে শব্দের অর্থের প্রসার কিংবা অপ্রসারে, অর্থের উৎকর্ষ কিংবা অনুৎকর্ষে, অর্থটার সম্পূর্ণ বিপরীতার্থে বা অপঅর্থে পর্যবশিত হওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের বদল ঘটে চলছে প্রতিনিয়ত। মধুর শব্দটির প্রকৃতার্থ মধুযুক্ত কিন্তু অর্থপ্রসারে শব্দটির অর্থ হয়ে গেছে প্রীতিপ্রদ। জমিজমা শব্দের মূল অর্থ জমি ও নগদ টাকা, অর্থসংকোচের ফলে অর্থ থেকে টাকা হারিয়ে গিয়ে হয়ে গেছে কেবল জমি। তেমনি জঘন্য শব্দের সংস্কৃতমূল অর্থ নিতম্বস্থ বা জঘনের মতো। কিন্তু কালচক্রে অর্থ বদলে হয়ে গেছে ঘৃণিত, নোংরা, গর্হিত, কদর্য ইত্যাদি। এমনি করেই ভাষা বেঁচেবর্তে থাকে আর ভাষা মরে না যাওয়া পর্যন্ত শব্দার্থের এই বদল ভাষার স্বকীয় পদ্ধতির বাতাবরণে কার্যকর করণকৌশলে অব্যাহত থাকে ও থাকবে। ডেপুটি কমিশনারের অর্থ যদি কোনওক্রমে বদলে যায় কীইবা করার আছে! বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত হয়ে রাজাকার শব্দটির অর্থ কি কদর্থে বদলে যায়নি নি? ‘ডিসি’ না হয় ‘সদর্থে’ অর্থাৎ প্রভুত্বাভিমানের ‘বু’ গাঁয়ে মেখে বদলে গিয়ে ভাষাদেশে বাবু হয়েই বসে রইল, তাতে কী ? কিন্তু কথা হলো, “এই ‘সদর্থ’ কতোটা ‘সৎ’?” এই প্রশ্নটা ‘জেলা প্রশাসক’ শব্দবন্ধের ব্যুৎপত্তির বিশ্লেষণে কূটাভাসের তীক্ষ্ম কণ্ঠকরূপে বিরাজ করবে এবং তৎসঙ্গে আমলাতান্ত্রিকতার প্রভুত্বব্যঞ্জক (সামন্ততান্ত্রিক আভিজাত্যের লেজাবশেষ) অবিমৃষ্যকর কেরদারিশমার গুণকীর্তনে ঐতিহাসিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এতে ‘ডেপুটি কমিশনার’ শব্দবন্ধের মূলার্থ (উপ—কমিশনার অথবা উপ—মহাধ্যক্ষ) প্রথিত না হয়ে প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রোথিত হবে, এই আর কি।
এ সম্পর্কে গুরু বাতেলাপীর গোলাম গুলমগির বললেন, “যে—কোনও ভাষায় এমন বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটতেই থাকে। এটা ভাষার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শহীদ মুনীর চৌধুরী বলেছেন, ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়।’ এটাই নিয়ম। ভাষা তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাভাষাটা তো আর মরে যায় নি, যদিও মেরে ফেলার প্রাণান্ত চেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকরা করেছিল। তদুপরি কালে কালে শত বিরোধিতা—বিদ্বেষ তো লেগেই ছিল বাংলাভাষার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে। সুতরাং এটা ক্রমাগত বদলাবেই। ‘হুয়াইট ওয়াস’, ‘সেলফি’ হয়ে যাবে ‘ধবল ধুলাই’, ‘নিজস্বী’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনার’ হয়ে যাবে ‘জেলা প্রশাসক’। ভাষার এই ‘প্রথিত—প্রোথিত’র খেলা চলতেই থাকবে।”
তথ্যসূত্র :
১. দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সোনা ঝরা দিনগুলি, উৎস প্রকাশন ঢাকা, অমর একুশে বইমেলা ২০০৪, পৃষ্ঠা : ১০৩।
২. আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ৪৯।
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা শব্দতত্ত্ব, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ কলিকাতা, তৃতীয় স্বতন্ত্র সংস্করণ : বৈশাখ ১৩৯১, পৃষ্ঠা : (২৯৮Ñ২৯৯)।
৪. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা : ৫, স্তম্ভ : ১, শিরোনাম : ৩ মার্চ ডিএসই নির্বাচন \ সংশোধিত সংঘবিধি অনুমোদন করেছে এসইসি ।
৫. মনসুর মুসা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাঙালীর ভাষিক আচরণ : পুনর্বিবেচনা, নতুন দিগন্ত, একাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা জানুয়ারি—মার্চ, ২০১৩, পৃষ্ঠা : ৪৯।
৬. মনসুর মুসা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাঙালীর ভাষিক আচরণ : পুনর্বিবেচনা, নতুন দিগন্ত, একাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা জানুয়ারি—মার্চ, ২০১৩, পৃষ্ঠা : ৪৯।
৭. মনসুর মুসা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাঙালীর ভাষিক আচরণ : পুনর্বিবেচনা, নতুন দিগন্ত, একাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা জানুয়ারি—মার্চ, ২০১৩, পৃষ্ঠা : ৫৩।
৮. মনসুর মুসা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাঙালীর ভাষিক আচরণ : পুনর্বিবেচনা, নতুন দিগন্ত, একাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা জানুয়ারি—মার্চ, ২০১৩, পৃষ্ঠা : (৪৯Ñ৫০)।
৯. মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বাস্তবতার কুহক আর কুহকের বাস্তবতা, দেশ, ২৭ জানুয়ারি ২০০০, ৬৭ বর্ষ ৬ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ৩০।
১০. আবুল কাসেম ফজলুর হক, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্ভবনার নবদিগন্ত, ফেব্রুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা : (৮০Ñ৮১)।
১১. প্রশাসনিক পরিভাষা, বাংলা একাডেমী ঢাকা, পঞ্চম মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, পৃষ্ঠা : ৬৯।
১২. সুভাষ ভট্টাচার্য, বাংলা ভাষার সাত সতেরো, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : জুলাই ১৯৯২, পৃষ্ঠা : (২৩Ñ২৪)।
০৪. নামফলকের নামনির্মিতি : খিচুড়িমতো অথবা জগাখিচুড়ি নাম
দু’টি শব্দের প্রথমটির মাথা ও দ্বিতীয়টির লেজ এক সঙ্গে জোড়া দিয়ে তৈরি হয় খিচুড়িশব্দ। এই বিশেষ পদ্ধতিতে সৃষ্ট শব্দগুলো আবার অভিধানে স্বীকৃতি পায় অনায়াসে। কিন্তু পরিমাণে একেবারেই যৎঞ্চিৎ, যাকে বলে অঙ্গুলীমেয়। শব্দশিল্পীদের সকলে নয়, কেউ কেউ, খেয়ালের বশে দু’চারটি খিচুড়ি শব্দ তৈরি করে ফেলেন। কোনও এক লেখা, হতে পারে তা গদ্যপদ্য যে—কোনও কীছু, লিখতে গিয়ে তিনি যখন ভাবপ্রকাশের তুরীয়ানন্দে প্রপন্ন বা শরণাগত থাকেন তখন সৃষ্টিশীলতার এমন অকল্পনীয় ঘটনাটি ঘটে। একজন শব্দশিল্পীর জন্যে সে আর এক অন্যজগৎ। সে জগতের সন্ধান সকলে পায় না। বোধ করি, দু’চারজন দৈবক্রমে পেয়ে থাকেন। তাঁরা যদি দু’চারটি করে শব্দ প্রতিনিয়ত এমনি করে তৈরি করতে থাকেন তবে শেষ পর্যন্ত সংখ্যাটা না চাইতেই অনায়াসে বৃহৎ হয়ে পড়ে। তিলে তিলে তাল হয়ে ওঠা যাকে বলে। অর্থাৎ শব্দ স্রষ্টা ‘কেউ কেউ’য়েরা সংখ্যায় যতই কম হোন, তাদের সকলের দু’চারটি করে তৈরি করা খিচুড়িশব্দের সংখ্যাটিকে শেষ পর্যন্ত ধর্তব্যের বাইরে রাখা যায় না। এদিক থেকে বিবেচনায়, পৃথিবীর প্রতিটি আধুনিক ভাষাই এক একটি নতুন শব্দসর্জনের প্রকৃষ্ট কারখানা। সেখানে স্রষ্টা কবিসাহিত্যিকরা আপন খেয়ালে ভাষার বিভিন্ন প্রকরণ প্রয়োগ করে নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টির খেলায় মত্ত ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এইভাবে বিভিন্ন ভাষায় প্রচুর পরিমাণে খিচুড়িশব্দ সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তাঁদের বিভিন্ন রচনায় এবং বার বার প্রমাণিত হচ্ছে, জীবিত ভাষা প্রকারান্তরে একটি নতুন শব্দসৃষ্টির সচল গবেষণাগার। বাংলাভাষা এইরূপ শব্দসর্জনক্রিয়ার জায়মানতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও ভাষা নয়। এইসব সৃষ্টশব্দের গুটিকয় শব্দ হয় তো অভিধানকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলো, বাকিরা থেকে গেলো অভিধানভুক্তিবঞ্চনার ভাগ্যবরণ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে। বাংলাভাষাও এই প্রকরণের বাইরে পড়া কোনও ব্যতিক্রমী ভাষা নয়। তেকারণে বাংলাভাষায় সর্জিত হাজার হাজার শব্দের মধ্যে গুটিকয়েক মাত্র অভিধানে স্থান করে নিতে পারে, বাকি সিংহভাগ বাইরে থেকে যায়।
সুনামগঞ্জে একজন গোলাম রাব্বি ছিলেন। তিনি আলাপাচারিতার সময় নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে চলতেন প্রতিনিয়ত। তাঁর মুখে শুনেছি সম্ভাবিলিটি (বাংলা সম্ভব+ইংরেজি পসিববিলিটি), চলেবল (বাংলা চল+ ইংরেজি অ্যাবল) ইত্যাদির মতো অনেক সুন্দর সুন্দর আর জুতসই শব্দ, উপস্থিত মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এরকম হাজার হাজার গোলাম রাব্বি আছেন বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাঁদের কারও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেই। কী আর করা। কা কস্য পরিবেদনা।
প্রথিত ‘বাগর্থকৌতুকী’র প্রণেতা জ্যোতিভূষণ চাকী লিখেছেন, “ব্যাকরণ মানার দরকারও নেই, ব্যাকরণই মেনে নিয়েছে এই ধরনের শব্দকে। একটা নামও দিয়েছে তার portmanteau word বা শুধু portmanteau (poter = to carry, manteau = mantles)। যা ছিল বিশেষ ধরনের পেটিকার নাম তা নতুন অর্থ পেল। আমরা বাংলায় বললাম জোড়—কলম শব্দÑ অর্থাৎ দুটো শব্দের অংশ ও তার অর্থ এক সঙ্গে প্যাক করা নতুন শব্দ। আমাদের খেয়ালরসের কবি এইভাবেই উপহার দিলেন তার হাঁসজারু, বকচ্ছপ, সিংহরিণ, হাতিমি, গিরগিটিয়া ইত্যাদি শব্দ। আলিপুর চিড়িয়াখানায় আমরা পেলাম বাংহ, বা টাইগন বা সিংঘ্রকে। এই হাঁসজারু বা খিচুড়ি শব্দের গুরুঠাকুর চার্ল্স্র্ ডজসন (১৮৩২-৯৮), Lewis Carroll নামে যিনি বিশ্ববন্ধু।”(১) বাঘ ও সিংহ বা সিংহ ও ব্যাঘ্র প্রজাতির সঙ্গমে যে বাচ্চা জন্ম নিল তার নাম যথাক্রমে বাংহ (বাঘ+সিংহ) বা সিংঘ্র (সিংহ+ব্যাঘ্র)। এই সব বাংহ—সিংঘ্র ইত্যাদির শরীরী কিংবা জৈবিক জন্ম প্রকৃতির নিবন্ধনসঞ্জাত। কিন্তু খিচুড়িশব্দ সৃষ্টির এই অভিনব পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলা ও ইংরেজি মিলে বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি), বাংলা ও ইংলিশ মিলে বাংলিশ (বাংলা+ইংলিশ), বাংলা ও আরবি মিলে বাংরবি (বাংলা+আরবি), আরবি ও বাংলা মিলে আরংলা (আরবি+বাংলা), আরবি ও ইংলিশ মিলে আরলিশ (আরবি+ইংলিশ), বাংলা ও হিন্দি মিলে বাংদি (বাংলা+হিন্দি) শব্দ তৈরি হয় এবং শব্দশিল্পীদের একান্ত ব্যক্তিগত কারখানায় যথারীতি নিরন্তর তৈরি হচ্ছে বিশ্বের আধুনিক সব ভাষায়, এসবই ‘আলোর আনন্দকসুম’ তৈরির মতো ভাষা নিয়ে ভাষীর ভাবসৃষ্টির খেলা। আমাদের বাংলাও এ পদ্ধতি অনুসরণে পিছপা নয় একেবারেই। যেমন দখল অর্থে ‘দখুপাই’ (<দখল+অকুপাই), পার্থক্য অর্থে তফারেন্স (<তফাৎ+ডিফান্সে) ও ফাঁরাফাৎ (ফাঁরাক+তফাৎ), কিংবা বিবরণ অর্থে বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা), দক্ষতা অর্থে পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পারঙ্গম) ইত্যকার শব্দসমূহ বাংলা ও ইংরেজি কিংবা বাংলা ও বাংলা শব্দের জোড়কলম বা খিচুড়িশব্দ। ‘দখল’ ও ‘তফাৎ’কে যদিও বাংলা বলছি, আদতে তারা বনেদি বাংলাশব্দ নয়, আরবি থেকে বাংলায় প্রবসিত কৃতঋণশব্দ, এই সুবাদে তারা বাংলা। ‘দখুপাই’ ও ‘তফারেন্স’ শব্দদুটিকে ভাষাগবেষক অভ্র বসু তার বাংলা স্ল্যাং অভিধানে ব্যুৎপত্তিসহ প্রয়োগবাক্য ব্যতিরেকে সংকলিত করেছেন, “দখুপাই বি. (বা. দখল+ইং. occupy ) দখল।” এবং “তফারেন্স বি. (আ. তফাৎ+ইং. difference ) পার্থক্য ।”(২) এই ‘তফারেন্স’—এর একটি প্রয়োগবাক্য, “সাধু চোরে নাই তফারেন্স ভাবলে পাবে অবশ্যি”।(৩) অর্থাৎ ‘তফারেন্স’—এর দৃষ্টান্ত বাক্য যেমন বিরল নয় তেমনি ‘দখুপাই’—এর দৃষ্টান্ত বাক্য একটু অনুসন্ধানে যে বেমছর হবে না, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। নতুন অর্থসমৃদ্ধ ও অপেক্ষাকৃত অধিক ভাবার্থ প্রকাশক শব্দসৃষ্টির প্রচেষ্টারূপে প্রচলিত এই খিচুড়িশব্দনির্মিতির নিয়ম বাংলা ব্যাকরণেও কবি সুকুমার রায়ের কাল থেকে স্বীকৃত।
সুকুমার রায়—এর আবোল তাবোল বইয়ের দ্বিতীয় কবিতার নাম খিচুড়ি। খিচুড়ি খাদ্য হিসেবে মন্দ নয়, কিন্তু ‘খিচুড়ি’ কবিতায় সৃষ্ট ‘খিচুড়ি’ ভাষিক স্বভাবে অস্বাভাবিক এবং সেটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ তো বটেই, এমনকি সে—খিচুড়ির অসঙ্গত সংকরতা সৃষ্টি করে এক অদ্ভুত রস। খিচুড়ি আরম্ভ হয়েছে, “হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),/ হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’, কেমনে তা জানি না।”(৪) এই চরণ দু’টি দিয়ে। পরবর্তী পঙক্তিগুলোতে পাওয়া যায় ‘বকচ্ছপ’ ও ‘হাতিমি’ দু’টি শব্দ, যেগুলো বক+কচ্ছপ ও হাতি+তিমি—এর একত্রীকরণে নির্মিত ভাবার্থের স্বাদেগন্ধে অপূর্ব খিচুড়ি। সম্ভবত ছড়াকবিতার এই ‘খিচুড়ি’ নাম থেকেই শ্রীচাকী ‘খিচুড়িশব্দ’ অভিধাটি প্রণয়ন করতে সমধিক প্রাণীত হয়েছেন। দয়া করে আবার এই ‘খিচুড়িশব্দ’—কে অভিধানের পাতায় গরুখোঁজা করবেন না যেনো। যে দু’টি শব্দ নিয়ে জোড়কলমশব্দ গঠিত হয়, আগেই বলেছি, তাদের প্রথমটির শেষাংশ ও দ্বিতীয়টির প্রথমাংশ ছেঁটে ফেলে যা থাকে তার একত্রীকরণে তৈরি হয় শব্দটি, অনেকটা গাছের অঙ্গজপ্রজননের জোড়কলম পদ্ধতির মতো। জোড়কলমের ধারণাটি এরকম, “একটি সমূল চারা গাছের সঙ্গে একটি ভালো জাতের ডালকে জোড়া লাগিয়ে একটি নতুন গাছ তৈরি করার পদ্ধতিকে জোড়কলম বলা হয়। জোড়কলম করার জন্য দুটো গাছ দরকার। এর মধ্যে একটি গাছ শিকড়ের কাজ করে ও অপরটি শাখাপ্রশাখার কাজ করে।”(৫) সম্ভবত গাছের অঙ্গপ্রজননের এই প্রকরণগত ধারণা থেকেই জোড়কলমশব্দ নামটির উৎপত্তি। বাংলাভাষায় সুকুমার রায়ের ‘ব্যাকরণ মানি না’র ব্যাকরণ মেনে নিয়ে শব্দসৃষ্টির এই অপূর্ব কৌশলটি কেবল বাংলাতেই আছে এমন নয়, বিশ্বের প্রাগ্রসর অন্যান্য ভাষাগুলোতে ব্যাকরণের নিয়ম ভেঙ্গে ব্যাকরণের অন্যরকম নিয়মানুবর্তিতার এই পদ্ধতির ব্যবহারব্যাপকতা উত্তরোত্তর বর্ধিষ্ণু একটি প্রবণতা এবং ভাষীদের কাছে ভীষণ প্রথিতপ্রিয়।
সুকুমার রায় যেমন ‘হাঁসজারু’ লিখেছেন তেমনি কেউ কেউ লিখেছেন ধোঁয়া ও কুয়াশা মিলিয়ে ধোঁয়াশা (<ধোঁায়া+ কুয়াশা)। এই ‘ধোঁয়াশা’ শব্দটি বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শীর্ষশব্দ ‘ধোঁয়া’র একটি উপভুক্তিতে পাওয়া যায়। অদূর ভবিষ্যতে হয় তো ’ভারোপ’ বা ‘ভারোপীয়’ও ‘ধোঁয়াশা’ শব্দটির মতোই অভিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে। একজন লেখক লিখেছেন, “দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ভারোপীয় (রহফড়— indo-european ) ভাষায় দুই ধরণের কালভাজন পাওয়া যায়Ñ […]।”(৬) এই বাক্যে ‘ভারোপীয়’ শব্দটি ‘ভারত’ ও ‘ইউরোপ’ শব্দদ্বয়ের প্রথমটির লেজ ‘রত’ কেটে দিয়ে মাথা ‘ভা’ ও দ্বিতীয়টির মাথা ‘ইউ’ কেটে দিয়ে লেজ ‘রোপ’ জোড়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘ভারোপ’ শব্দটি, তারপর এই ‘ভারোপ’—এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে ‘ঈয়’ প্রত্যয়, তারপর পাওয়া গেছে ‘ভারোপীয়’ (ভারত+ইউরোপ+ঈয়) শব্দটিকে। এটাও একধরণের সন্ধি, তবে একটু অন্যরকমের। এই অন্যরকম সন্ধির বিবরণ তো দেওয়াই হয়েছে : এ সন্ধিতে পূর্বপদের মাথা ও পরপদের লেজ—এর সঙ্গম হয়ে থাকে। এই ‘ভারোপীয়’ শব্দটা যে—কোনও বাংলা অভিধানে অপাঙক্তেয়। তেমনি করে অপাঙক্তেয় দাঙ্গামা (দাঙ্গা+হাঙ্গামা), তফারেন্স (তফাৎ+ডিফারেন্স), কেরদারিসমা (কেরদানি+ক্যারিশমা) কিংবা চাড্ডা (চা+আড্ডা) ইত্যাদি।
লক্ষণীয় যে, লেখক প্রথম বন্ধনীর ভেতরে ‘ভারোপীয়’র ইংরেজি প্রতিশব্দ Indo-European নির্দেশ করে দিয়েছেন। বলি কি, একটু অনুসন্ধিৎসু হলেই যে—কারও সহজে হৃদয়ঙ্গম হবে যে, বাংলা ভাষায় জোড়কলমশব্দের সৃষ্টি ও ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছ। যেমন : ধোঁয়াশা (ধোঁয়া+কুয়াশা), চম্বা (<চম্পট+লম্বা), থিয়েত্রা (থিয়েটার+যাত্রা), কেলেংকারিয়াস (বা. কেলেংকারি+ ই. ous ), অস্ত্রোপারেসন (অস্ত্রোপচার+অপারেসন), নোয়াশাল (<নোয়াখালি+বরিশাল) কিংবা কেরোসেডিং (কেরোসিন+লোডসেডিং) ইত্যাদি। অর্থাৎ নতুন শব্দনির্মাণের এই আধুনিক নিয়মটি বাংলা নতুন শব্দসৃষ্টির বিধি হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ব্যাপকাকারে। যেটাকে আর অভিনব বলে আখ্যায়িত করার কোনও অবকাশ নেই। অবস্থাদৃষ্টে বোধোদয় হচ্ছে, প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে বাংলা শব্দের উৎসভিত্তিক শ্রেণি পাঁচটির স্থলে আরও দুয়েকটি সংযোজন করার সময় সমাগত।
শহর সুনামগঞ্জের নামফলক বা নামপাটাগুলোর প্রত্যেকটি, সাধারণত যেমন হয়ে থাকে, একটিমাত্র শব্দের নয়, ব্যতিক্রমী দুয়েকটি বাদে। পৌরবিপণির ‘মধ্যবিত্ত’ দোকানটির নামপাটা এক শব্দের। এমনি দুয়েকটি ছাড়া বাদবাকি প্রায়গুলোই একাধিক শব্দের সমষ্টি, তারা পৃথক পৃথক শব্দরূপে সন্নিবেশিত, সুতরাং এগুলোকে কীছুতেই খিচুড়িশব্দ বলাটা সঙ্গত না হলেও এই খিচুড়িমার্কা নামফলককে ‘খিচুড়িশব্দবন্ধ’ বললে অসঙ্গত কীছু হবে না বলেই মনে হয়। সুনামগঞ্জ শহরে বিশুদ্ধ বাংলাশব্দে বিন্যস্ত হাতে গোনা কীছু নামফলক ছাড়া প্রায় সব নামফলকই বাংলা, আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দে বিন্যস্ত ঝকমকে জগাখিচুড়িমার্কা খিচুড়িশব্দবন্ধ। সে—সব খিচুড়িমার্কা নামপাটার নির্মিতি জোড়কলম শব্দ না হলেও সে—সব শব্দ বা শব্দগুচ্ছ প্রকারান্তরে বা উৎসবিচারে তারা বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি), বাংরবি (বাংলা+আরবি), আরংলা (আরবি+বাংলা) বা আরলিশ (আরবি+ইংলিশ) ইত্যাদি জোড়কলমশব্দের লক্ষণাক্রান্ত এবং খিচুড়ির মতো সুস্বাদু না হলেও সমাহার তো বটেই। অন্তত এই সব নামকরণের ভাষাতাত্ত্বিক চারিত্র্যলক্ষণ তাই ইঙ্গিত করে। সুতরাং এগুলোকে বলা যায় ‘খিচুড়ি নামফলক’ কিংবা ‘খিচুড়ি নামপাটা’, ‘জগাখিচুড়ি নামফলক’ কিংবা ‘জগাখিচুড়ি নামপাটা’। এমনকি ‘জগাখিচুড়িবৎ নামফলক’ কিংবা ‘জগাখিচুড়িবৎ নামপাটা’ও যদি কেউ বলে তবে আপত্তির কীছু আছে বলে মনে হয় না।
‘বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র’ বইয়ে হুমায়ুন আজাদ ‘নামকরণ ও বাঙলা’ শীর্ষক একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ সন্নিবেশিত করেছেন। সেখানে তাঁর বক্তব্যের সরলার্থ হলো রাস্তা, দোকানপাট ও শিক্ষায়তনের বা যে—কোনও প্রতিষ্ঠানের নামকরণে ইংরেজির প্রবল প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেছেন, “দোকানপাটের নামে ইংরেজিরই প্রাধান্য; তবে এ—এলাকায় ব্যক্তিনামের মতোই প্রক্রিয়া চলছে। আদার দোকান থেকে জাহাজ কোম্পানির নাম হয় সাধারণত ইংরেজিতে; (চলবে)


