ভোট বিশ্লেষণ- বিদ্রোহী ও দ্বন্দ্ব-কোন্দলেই তাহিরপুরে নৌকার ভরাডুবি

বিশেষ প্রতিনিধি
দলীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসাবে পরিচিত জেলার তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টিতেই চেয়ারম্যান পদে হেরেছেন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীরা। সদর ও বড়দল উত্তর ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেনি আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী।
টানা ৩ ও ৪ বারের হ্যাট্রিক করাসহ বর্তমান চার ইউপি চেয়ারম্যানও এবারের নির্বাচনে হেরে গেছেন। নৌকা প্রতীক নিয়ে হেরেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি উত্তর শ্রীপুর ইউপির টানা ৪ চারের ও বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খান, বালিজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি টানা তিন বারেরসহ বর্তমান চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, বাদাঘাট ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, উত্তর বড়দল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের দলীয় প্রার্থী  ইউনুছ আলী, সদর ইউপির দলীয় প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন আখঞ্জী শামীম।
৭ ইউনিয়নে ৪টিতে বিএনপি, ২ টি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও ১ টিতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খাঁন পেয়েছেন ৮ হাজার ৯৫৮ ভোট, বিএনপি প্রার্থী খসরুল আলম ৯ হাজার ২৬৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। দক্ষিণ শ্রীপুরে আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়রম্যান প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ সরকার ৩ হাজার ৭৬৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন, তার   নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাড. মহসিন রেজা মানিক পেয়েছেন ২ হাজার ৭১২। বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম ইউনুছ আলী পেয়েছেন ২ হাজার ২৭০ ভোট,  বিএনপির প্রার্থী আজহার আলী ২ হাজার ৭০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বড়দল উত্তর ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী আবুল কাসেম ৬ হাজার ৬২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, এই ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেনি বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাসুক মিয়া ৫ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন। বাদাঘাট  ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন পেয়েছেন ৯ হাজার ২৯৫ ভোট, এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আফতাব উদ্দিন ১০ হাজার ২৬৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাহিরপুর সদর ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন ২ হাজার ২৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, এই ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেনি দলীয় প্রার্থী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন আখঞ্জী শামীম, ১ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন সতন্ত্র প্রার্থী আতিকুর রহমান। বালিজুরী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আতাউর রহমান পেয়েছেন ৩ হাজার ১৪ ভোট। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আব্দুল জহুর তালুকদার ৩ হাজার ৯১২ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
সবক’টিতেই দলীয় লোকজনের কারণে নৌকার এই ভরাডুবি হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের কারণে আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে দাবি একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাংগঠনিক সম্পাদকের।
তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তিনি বলেন,‘বিভিন্ন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই সঠিকভাবে করা হয়নি। শুরু থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের বিষয় আমি মনোনয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল নেতা সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে অবগত করেছি। প্রার্থী বাছাইয়ের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই ফলাফল হয়েছে। তবে যেসব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তারাও আমাদের দলের লোকই। যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন তারা নানা কারণে এখন অনেক কিছু বলছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলের প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে দলের কেউ কাজ করে নি।’
বালিজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন,‘ আমি আওয়ামী লীগের নেতা, ও দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী। কিন্তু প্রশাসন আমাকে যেভাবে বার বার হয়রানী করেছে এভাবে বিরোধী দলের একজন সদস্যের সাথে করা হয়নি। অদৃশ্য ইশারায় সবকিছুই হয়েছে। আমি শুনেছি স্থানীয় সংসদ সদস্যের কথায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার ও নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। যার কারণে নৌকা প্রতীকের এই ফলাফল হয়েছে।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর খোকন বলেন,‘দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে তাহিরপুরে নৌকার এমন পরাজয় হয়েছে। দলে গ্রুপিং ও কোন্দল সৃষ্টি করেছেন সংসদ সদস্য। তিনি দলের এমপি হয়েও সব সময় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান করেন। ’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি উত্তর শ্রীপুর ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খান বলেন,‘তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের এলাকা। কিন্তু এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে আমাদের এই ফলাফল হয়েছে। দলের কিছু নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশে মাঠে কাজ করেছে। প্রশাসন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সাথে বিরোধী দলের চেয়ে খারাপ আচরণ করেছে। আমাদের সাথে নিরপেক্ষ আচরণ পর্যন্ত করা হয়নি। নির্বাচনের দিন ১৪টি ভোট গুনতে রাত ১০ টা বাজানো হয়েছে। আবার কোন কেন্দ্রের ৩ হাজার ভোট সন্ধ্যার আগেই গণনা শেষ করা হয়েছে। যা কিছুই হয়েছে আমাদের এমপি সাহেবের কারণে হয়েছে। উনি নিরপেক্ষ থাকলে আমাদের এই অবস্থা হতো না।’