ভ্রমণ কাহিনী- মালদ্বীপ, শ্রীলংকা সাত দিনের সাতকাহন-১২

স্বপন কুমার দেব
টু্থ টেম্পল, ক্যান্ডি
ক্যান্ডি শহরে দেখার মূল আকর্ষণ হলো টু্থ টেম্পল। বাংলায় বলতে গেলে বলতে হয় দাঁতের মন্দির। মনে হবে ডেন্টিস্টদের জন্য বিশেষ কোন স্থান। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। ক্যান্ডির এই বিখ্যাত টেম্পলটি অত্যন্ত পবিত্র ও জগৎবিখ্যাত একটি বৌদ্ধ মন্দির। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের নির্বান (সকল প্রকার বন্ধন থেকে মুক্তি, মোক্ষ প্রাপ্তি, মৃত্যু) লাভের পর উনার একপাটি দাঁত ভারতের কলিঙ্গ রাজ্যের একটি বৌদ্ধ বিহারে পরম যতেœ সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছিলো। এটি বিবেচিত হয় পবিত্র পুন্য বস্তু ও শান্তির আঁধার হিসেবে। সমকালীন সময়ে শ্রীলংকার অনুরাধাপুরে বৌদ্ধ রাজার রাজত্ব চলছিল। প্রিন্সেস হেমামাল ও উনার স্বামী প্রিন্স দান্তা। প্রিন্সেস এর পিতা রাজা গুয়াসিভা। রাজার নির্দেশে মেয়ে ও মেয়ে জামাতা এই পবিত্র দন্তরাজি কলিঙ্গ থেকে শ্রীলংকায় নিয়ে আসার কার্য্যে নিয়োজিত হন। বুঝা যায় বৈধতার ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সম্ভববত: কিছুটা জটিলতা ছিলো। যাই হোক দন্ত আনার কার্য্যে যারা নিয়োজিত হয়েছিলেন তারা দীর্ঘদিন চেষ্টার পর কার্য্যে সফলতা লাভ করেন। ৩০১ থেকে ৩০৮ খৃ: এর মধ্যে কোন এক সময়ে দন্ত পাটি নিয়ে শ্রীলংকায় ফিরে আসতে সমর্থ হন এবং যথা নিয়মে অনুরাধাপুরের রাজার কাছে হস্তান্তর করেন। রাজা পবিত্র দন্তপাটি একটি বৌদ্ধ বিহারে সযত্নে ও সাবধানতায় সংরক্ষণ করে রাখেন। গৌতম বুদ্ধের দাঁতের পাটি সংরক্ষণের অধিকারী হওয়ায় অনুরাধাপুরের  রাজা হয়ে উঠেন শাসক হওয়ার বৈধতার প্রতীক। পরবর্তীকালে রাজা, রাজ মহলের ভিতরেই এটিকে কেন্দ্র করে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। পরে এক সময়ে ক্যান্ডির রাজ  পরিবারের অধিকারে চলে আসে এই দাঁতের পাটি। এবং ক্যান্ডির রাজমহল কমপ্লেক্সের ভিতরেই বর্তমানের দৃষ্টিনন্দন টু্থ টেম্পলটি নির্মাণ করেন ও মন্দিরে তা সংরক্ষণ করেন। পর্তুগীজ শাসনকালে পর্তুগীজরা মন্দির আক্রমণ করে দাঁতের পাটি লুকিয়ে রেখেছিলো। পরবর্তী সময়ে তা আবার উদ্ধার করা হয় ও যথাস্থানে অর্থাৎ মন্দিরে সংরক্ষিত হয়। মন্দিরের দেয়ালগুলির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। দেয়ালের ভিতর ফোকর দিয়ে ঘন ঘন দুরত্বে সারাক্ষণ প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা আছে। প্রদীপ জ্বলে নারকেল তেলে। সাতটি ছোট ছোট কৌটায় দাঁতের পাটি সাজিয়ে রাখা আছে। কৌটাগুলি সোনা ও বিখ্যাত শ্রীলংকান রতœ পাথরে (GEM STONE) তৈরী। মন্দির লাগোয়া পুরাতন রাজ প্রাসাদ, অডিয়েন্স হল, বাগান ইত্যাদি। সর্বক্ষণ দর্শনার্থী ভক্তদের ভীড়। সম্প্রতি বাংলাদেশ শ্রীলংকা ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে একাধিকবার টু্থ টেম্পল টি টিভিতে দেখানো হয়েছে। ক্যান্ডি শহরে ঢুকার আগে রাস্তার বা দিকে কয়েক কি.মি ভিতরে পিনাওয়ালা নামক স্থানে হাতীর একটি          
অরফ্যানেজ বা এতিমখানা আছে। এতে ৮৮টি হাতীর বসবাস। তন্মধ্যে ৩৯টি পুরুষ হাতী ও ৪৯ টি মহিলা হাতী। তিন পুরুষ ধরে তারা এখানে বসবাস করছে। ১৯৭৫ খৃ: এটি স্থাপিত হয়। বিশেষত; অনাথ, দলছুট এবং পাগলা হাতীদের এখানে রেখে সেবা শুশ্রুষার উদ্দেশ্যে এটি তৈরী করা হয়। প্রায় ২৫ একর জঙ্গল এরিয়া নিয়ে এটি অবস্থিত। এই সব হাতীদের দেখ্ ভাল্ করার জন্য প্রায় ৪৮ জন মাহুত নিয়োজিত আছেন। মাহুতরা বাচ্চা হাতীদের খাওয়ানো, স্নান করানো, সাথে নিয়ে বেড়ানো ইত্যাদি কার্য্য সম্পন্ন করে থাকেন। হালকা কাজকর্ম দেয়া হয় হাতীদেরকে। প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল, নারকেল, ঘাস, তেঁতুল ইত্যাদি খাওয়ানোর জন্য মজুদ থাকে। এতিম বাচ্চাদের-বড় মা হাতী দিয়ে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা আছে। হাতীর জন্য এই ধরনের মমতা মনে করিয়ে দেয় ‘হাতী মেরে সাথী’ সিনেমার কথা। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের একটি ফিল্ম। রাজেশ খান্না অভিনয় করেছিলেন। তবে হাতীই ছিলেন মূল নায়ক। যাই হোক সময় অভাবে আমাদের এই বিখ্যাত ও ব্যতিক্রমী হাতীর আশ্রমটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে ক্যান্ডি শহরে ঢুকার আগে (GEM STONE) বা রতœ পাথরের দোকানে একখন্ড পাথর কেনার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম। শ্রীলংকা নানা ধরণের খাঁটি রতেœর জন্য বিখ্যাত। শ্রীলংকান রতেœর অনেক কদর বর্হিবিশ্বে। একজনের জন্য একখন্ড পাথর কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ ছিল। নির্জন এলাকায় বিশাল দোকান। মালিক একজন মুসলমান ব্যবসায়ী। হাইফাই দোকান যাকে বলে। রাজ প্রসাদের মতো অবয়ব। প্রথমে আমাদের নিয়ে বসানো হলো একটি ওয়েটিং রুম জাতীয় হলে। সামনে সিনেমার স্ক্রীন। দেখানো হচ্ছে নানা জাতীয় পাথরের সম্ভার, রং, উৎপত্তি স্থল ইত্যাদি। আমরা সেলসম্যানকে বুঝিয়ে বললাম হাতে সময় কম বিধায় বিক্রয় কাউন্টারে যেতে চাই। সে সরাসরি সেখানে নিয়ে গেল আমাদেরকে। প্রচুর পাথর খন্ড। নানা সাইজ, নানা কোয়ালিটি আর নানা দাম। ফরমাইশ ছিল ব্রাইট কালারের পাথর কিনতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেনা হলো হালকা কালারের একটি স্টোন। দাম প্রায় বিশ হাজার শ্রীলংকান রুপী। কেনাকাটা জিনিসটা পরের হাত দিয়ে হয় না। নিজের পছন্দের জিনিস নিজেই পছন্দ করা উত্তম। নইলে আফশোস থাকবেই। পাথর কেনা শেষ হলো। তারা ফলের রস খাওয়ালেন। এরপর সেখান থেকে সামান্য সময়ে ক্যান্ডি। একটা কথা বলে রাখি যার জন্য পাথর কেনা তার কিন্তু এটা পছন্দ হয়নি। আমি জানতাম এটা হবে না। সত্যিই তো, কি বলেছিল আর আনলাম কি? টু্থ টেম্পল দেখে যখন হোটেলে ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ক্যান্ডিতে ভবনগুলি পুরনো স্টাইলের সাহেবী কায়দায়। পুরনো পার্লামেন্ট ভবন, প্রেসিডেন্ট ভবন আশেপাশেই দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতি আর ঐতিহ্য নিয়ে। হোটেলে পৌঁছে দিয়ে মাহেন্দ্র বিদায় নিলেন। কাল সকালে আমাদেরকে নিয়ে রওয়ানা দিবেন শৈলশহর নোয়ারএলিয়াতে। শ্রীলংকায় যার পরিচিতি প্রাচ্যের স্কট্ল্যান্ড হিসেবে। তবে পাশেই রাবনের দেশ অশোকবন। সীতাদেবীর মন্দির। সীতাদেবীকে অপহরণ করে রাবণ তাঁকে অশোক বনে বন্দী করে রাখেন। রামচন্দ্র যুদ্ধ করে এখান থেকেই রাবণ বধ করে সীতাদেবীকে উদ্ধার করে অযোধ্যা নিয়ে আসেন। হোটেলে আসার পথে মাহেন্দ্র’র সঙ্গে একটু রাজনৈতিক আলাপের সূত্রপাত করি। মাহেন্দ্র এসব ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানী। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই বললেন। তবে তামিলনাডু ও সদ্য প্রয়াত জয়ললিতাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। বিগত দিনে এলটিটিই কার্য্যকলাপের জন্য তামিলনাডু ও জয়ললিতাকে প্রকারান্তরে দায়ী করেন। আমিও আর এপথে এগুলাম না। হয়তো ভারতের সঙ্গে শীতল স্নায়ুযুদ্ধ আছে। প্রয়াত রাজীব গান্ধী এলটিটিই দমনে সেনা পাঠালেও কোন পক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। উপরন্ত: শ্রীলংকা সফরে এলে গার্ড অব অনারের সময় একজন নৌ সেনার আক্রমণের শিকার হন। রাইফেলের হাতলের আঘাত মাথায় লাগলে কি হতো বলা যায় না। শেষ পর্যন্ত রাজীব গান্ধী এলটিটিই মহিলা সুইসাইড স্কোয়াডের হাতে তামিলনাডুর মাটিতেই নিহত হন। যাই হোক হোটেলে রাতের খাবার খেলাম সংক্ষিপ্ত মেনুতে। পরের দিন ফ্রিতে ব্রেকফাস্ট তো আছেই। ভ্রমণের ঘটনা গত ডিসেম্বর মাসের। লিখছি পরের এপ্রিল মাসে অর্থাৎ এই মাসে। চারিদিকে দুর্যোগের ঘনঘটা চলছে। ফসল প্রায় নি:শেষিত। পাউবো দায় এড়াতে পারেন না। বহুলাংশেই দায়ী। বছর বছর একই নাটক মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু পাউবো ও তার ঠিকাদাররা দিনকে দিন হৃষ্ট-পুষ্ট বা নাদুস-নুদুস হচ্ছেন। হয়ত রাজা কর্তৃক ডাক আসবে তাদের শূলে চড়ানোর। কিন্তু তাদের আবার বন্ধু ভাগ্য ভালো। বন্ধুরা হয়তো উল্টো বুঝিয়ে রাজাকেই শূলে চড়িয়ে দেবে। কে জানে। তবে বিদ্যুতে এখন যতই অনিয়ম হোক আপাতত: তারা জনরোষের বাইরে। এখানেও একটা মজা বটে। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক