স্বপন কুমার দেব
নোয়ারা এলিয়াতে শেষ কয়েক ঘন্টা
শেষ কয়েক ঘন্টা মানে নোয়ারা এলিয়ার হোটেলে রাত কাটানো থেকে পরের দিন দুপুরের লাঞ্চ পর্যন্ত। এই সময়টা এমন আর কি বলার মতো বা লেখার মতো হতে পারে। কিন্তু শীতের কারণে রাতের ঘুম কষ্টকর হলে অনেক কিছুই বলার মতো হয়ে যায়। রাতে হোটেল রুমে ঢুকার পর রুম সার্ভিসের ছেলেটি আমাদের জন্য চা ও কফির সরঞ্জাম দিয়ে গেল। দেখিয়ে দিয়ে গেল রুম হিটার আর কিভাবে চালাতে হয় তার নমুনা। সীতাদেবীর মন্দির পরিদর্শন আর ঘুরাঘুরিতে আমরা তখন ক্লান্ত। বিশেষ ভাবে আর কিছুতে নজর দেই নি। কাপড় বদলে গরম পানিতে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর কিনে আনা পাউরুটি মাখন-চা কফি সহযোগে রাতের খাওয়া বা ডিনার শেষ করে প্রথমে নজরে এলো বিছানায় কোন কম্বল নেই। সর্বনাশ এই শীতে রাত কাটবো কি ভাবে? রুম সার্ভিসকে ডাকাটা কেমন যেন বোকা বোকা লাগে। ভালো মানের হোটেল। শীতের রাতে ঘুমানোর জন্য গায়ে দেবার মত কোন শীতবস্ত্র থাকবে না তাই বা কেমন করে হয়। একপাশে বড় একটি ওয়ারড্রোব চোখে পড়ল। ডালা খুলে দেখি খালি কাঠের তাক্ আর ঝুলানো হুক। হঠাৎ কি মনে করে নিচের দিকে তাকাই। পেয়ে গেলাম পরম কাংখিত জিনিস। তবে কম্বল নয় সাদা ওয়ার দেয়া আমাদের দেশী লেপ্। বের করে বিছানায় নিয়ে আসি লেপ্ দুটি। কিন্তু শীত যে বাড়ছেই। লেপে কুলোচ্ছেনা। হিটারের কথা মনে হতেই ঝট করে উঠে গেলাম। হিটারটি রুমের এক কোনায়। সাইজে ছোটখাটো। সুইচ টিপে দিলাম। চালু হলো হিটার। শব্দ করে গরম বাতাস বেরুচ্ছে। অনেকটা নিশ্চিন্ত হই। বিছানায় এসে দেখি গরম বাতাসের হলকা বিছানা পর্যন্ত পৌঁছায় না। একে তো হিটার ছোট তার উপর অবস্থান দূরে। ছোট আয়তনে গরম বাতাসের ঘুরাফেরা। সামান্য একটু আঁচ গায়ে লাগে। এরপরে শুরু হলো আরেক সমস্যা। একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর হিটার নিরব হয়ে যায়। গরম বাতাস বিতরণ বন্ধ। ঐ সময় টুকু পার হলে আবার শব্দ করে চালু হয় হিটার। বুঝলাম এ ধরণের হিটারে এটাই হয়তো নিয়ম। আর এটাই নিয়তি। এভাবেই আধো ঘুম আর আধো জাগরণে রাত কেটে গেল। ভাগ্য ভালো সকালে সূর্য্য উঠেছে। জানালা খুলে দেই। সূর্য্যরে আলো রুমে প্রবেশ করলে ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়। হিটার বাবাজির সুইচ বন্ধ করে দিলাম। আর দরকার নেই হিটারের আলো আঁধারী খেলা। সূর্য্যরে আলোয় আমরা আরো কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকি। অবশেষে গাত্রোত্থান বা বিছানাত্যাগ। বাথরুমের কাজ কর্ম ও ¯œান টান শেষে রেডি হয়ে গেলাম। সকাল আটটা থেকে যথারীতি ব্রেকফাস্ট টাইম শুরু। চলবে এগারোটা পর্যন্ত। আমরা হাজির হয়ে গেলাম ডাইনিং হলে। অনেক বড় হল। এক পাশে লম্বা জানালা খোলা। আজকে আকাশ পরিস্কার। সূর্য্যরে আলোক ছটায় হলের ভিতর এক ধরণের উষ্ণ পরিবেশ। খোলা বাতায়ন দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। উজ্জ্বল বাড়ী ঘর আর নয়নাভিরাম দৃশ্য। ধীরে ধীরে হোটেলের অতিথিরা আসছেন। এই হোটেলে প্রচুর পরিমাণে খাবারের আয়োজন। ফলের জুস দিয়ে শুরু করে প্যান কেক, রুটি নানা রকম নাম না জানা ¯œ্যাকস, দুধ ইত্যাদি। একটু একটু করে খেলেও অনেক খাওয়া হয়ে যায়। চা কফি দিয়ে সমাপ্তি। কিন্তু আসলে সকাল বেলা বেশী খাওয়া যায় না। আমরা হলাম দুপুরে পেট পুরে খাওয়ার দেশের মানুষ। দুপুরে ক্ষিদে লাগবেই। হোটেল থেকে মালপত্র নিয়ে একেবারে চেক আউট করে বেরিয়ে গেলাম। নীচে মাহেন্দ্র প্রস্তুত। উদ্দেশ্য নোয়ারা এলিয়া শহরে কিছুক্ষণ প্রদক্ষিণ করে দেখাদেখির কাজ শেষ করে সময় বুঝে কলম্বো পানে রওয়ানা দেব। হোটেল থেকে গাড়ী বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠে গেল। পাহাড়ী রাস্তা এমনিতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। সকালবেলা আরো ঝকঝকে তকতকে। তার উপর রৌদ্র উঠে শহর যেন হাসছে। গলফ ক্লাবের পাশ দিয়ে গাড়ী ছুটছে। গাড়ীতে বসেই দেখা। বিখ্যাত বিখ্যাত সব লোকেরা এখানে খেলতে আসেন। ব্যবসায়ী, ক্রিকেটার, রাজনীতিবিদ। সবুজ বিস্তৃত পাহাড়ী ছন্দের ঢালী জমি। অত:পর একটার পর একটা পার্ক। নোয়ারা এলিয়ায় হাক্গালা নামের বোটানিকাল গার্ডেন খুব নামকরা। শ্রীলংকর পাঁচটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের মধ্যে এটি অন্যতম। ১৮৬১ খৃ: গার্ডেনটি নির্মিত হয়। শহর থেকে সামান্য কিছু দূরত্বে। প্রথমে চা বাগানের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হলেও পরে এটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে রূপান্তরিত হয়। কথিত আছে এক সময় রাবণ এখানে সীতাদেবীকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। প্রায় দশ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ এই গার্ডেনে আছে। বসন্তকালে ফুল ফুটলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এখানকার অর্কিড ও গোলাপ ফুল বিখ্যাত। যেহেতু ইংরেজদের হাতে এই শহরের পত্তন তাই অনেকগুলি পুরানো বাংলো বাড়ী এখনকার সৌন্দর্য্যরে আরেকটি আকর্ষণ। পুরানো বাংলো বাড়ী অনেকগুলি ভাড়া পাওয়া যায়। আপনি যে কোন একটি ভাড়া নিয়ে অবস্থান করে পুরানো দিনে ফিরে যেতে পারেন। জেনারেল’স হাউস নামে একটি বাড়ী উনিশ শতকে বৃটিশরা তৈরী করেন। বৃটিশ সেনা অফিসারদের আবাস ছিল এটি। ১৯৪৮ খৃ. শ্রীলংকা স্বাধীন হলে শ্রীলংকান সেনাঅফিসাররা এখানে বসবাস করেন। পরবর্তী সময়ে তা পার্লামেন্ট মেম্বারদের বসবাস ও ব্যবহারের জন্য রূপান্তরিত হয়। এই বাড়ীতে একজন ইংরেজ রমনীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল। কথিত আছে তার আত্মা ভুতের রূপ ধরে এখনও এখানে ঘুরাঘুরি করে। কুইনস কটেজ নামে আরেকটি পুরানো বাড়ী আছে। পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত। পরবর্তী কালে শ্রীলংকার রাষ্ট্রপ্রধানদের অবকাশকালীন বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বৃটিশ আমলে বৃটিশ গভর্নর এবং তাদের অতিথিরা বাড়ীটি ব্যবহার করতেন। নোয়ারা এলিয়াতে পুরাতন পোস্ট অফিস বাড়ী যেমন প্রাচীন তেমনি ঐহিহ্যের সৌন্দর্য্য বহনকারী LITTLE ENGLAND এর প্রতিচ্ছবি। লাল ইটের তৈরী বাড়ীটি ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে তৈরী শ্রীলংকার প্রাচীনতম পোস্ট অফিসের মধ্যে অন্যতম। ১৮৯৪ খৃ. বাড়ীটি তৈরী হয়। ২০১২ সাল থেকে উপরের তলাটি হলিডে বাংলো হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বৃটিশ স্থপতিদের তৈরী এই বাড়ীটি নোয়ারা এলিয়াতে পর্যটকদের আকর্ষণের আরেকটি কেন্দ্রবিন্দু। এই ছোট শহরে দেখার অনেক কিছুই আছে। তবে শর্ত হলো থাকতে হবে সময় নিয়ে। অন্তত. এক সপ্তাহ। দেখার মতো আরো আছে নয়ন মনোহর জলপ্রপাত। যেমন ডেভন ফল্স বা জলপ্রপাতের জলধারা। ৯৭ মিটার উচ্চতা থেকে বেগবান জলধারার নীচে নেমে আসা দেখে অবশ্যই আপনার চোখ জুড়াবে। আর একটি সুবিধা হলো বড় রাস্তা থেকেই এই জলপ্রপাতটি পরিস্কার ভাবে দৃশ্যমান। কাছে গেলে অতিরিক্ত আনন্দ হিসাবে এখানকার বিখ্যাত এক কাপ চা এর স্বাদ নিতে পারেন। এক পাশে জলপ্রপাত আরেক পাশে টি সেন্টার। বেলা প্রায় বারোটা বাজে। এবারে তাড়াতাড়ি কিছু একটা খেয়ে কলম্বোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে। নইলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশী রাত হয়ে যাবে। মাহেন্দ্র নিয়ে এলেন একটি ভারতীয় রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টটি ভালো। ভালো বলতে বেশ স্ট্যান্ডার্ড। টেবিল খালি পাওয়াই যেন ভাগ্য। এই সব উঁচু মানের রেনস্টুরেন্টে আমি বেশ বিব্রতবোধ করি। খামোকা বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। মাহেন্দ্র বাইরে। হয়তো তার মতো করে কিছু খেয়ে নিবে। আমরা কোনার এক টেবিলে বসেছি। ইউনিফর্ম পড়া হোটেল বয়রা বিভিন্ন টেবিলে খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত। ডাকলেও আসছে না। যাই হোক এরপর দু খানা মেনু বই দিয়ে গেল। এটি আরেক বিড়ম্বনা। বিচিত্র সব খাবার। কোনটি যে কি রকম হবে তা আমি বুঝি না। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আরো অসুবিধা। একবার সব খাবার একই রকম হয়ে যায়। মূল খাদ্য ভাত বা রাইছ ই ছিল না। এখানে মেনুর সমস্যা ঘাঁটতে ঘাঁটতে যখন হতাশ তখনই চোখে পড়ল বিরিয়ানি। ব্যস একদম সহজ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বিরিয়ানির অর্ডার দিয়ে দেই। মুশকিল আসান বিরিয়ানি আসতে আসতেও বেশ সময় লেগে গেল। তাড়াহুড়া করে খেয়ে নিলাম। কিন্তু বিল নিয়ে আর আসেনা। অবশেষে ম্যানেজার কাউন্টারে গিয়ে অনুরোধ করে বিল পরিশোধে তাড়াতাড়ি বাইরে পা রাখলাম। পথে চা, কফি খাওয়া যাবে। মাহেন্দ্র কে আর কিছু বললাম না। শুধু বললাম দেরী হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি গাড়ী চালান। মুচকি হেসে মাহেন্দ্র গাড়ীতে স্টার্ট দিলেন। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক
- হাওরে অকালবন্যায় ১১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন
- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নভাঙা মানুষগুলোকে আশার বাণী শুনান


