ভ্রমণ-দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ
(তৃতীয় পর্ব)
পৃথিবীর সব বড় বিমানবন্দর মূলত একই রকম। লন্ডন, বার্মিংহাম, মস্কো, কুয়ালালামপুর, দুবাই এক রকমই মনে হয়েছে। সবগুলোই আধুনিক, জৌলুসপূর্ণ তবে বৈচিত্রহীন। দুবাই ইমিগ্রেশনের আগেই আমি ধরা পড়লাম ইংলিশম্যান ডেভিড এর হাতে। এক যুগ আগে ইংল্যান্ডে একই প্রতিষ্ঠানে পার্ট টাইম কাজ করেছি। সে যাচ্ছে চীনে। দুবাইয়ে তার ট্রানজিট। এভাবে আমাদের আকস্মিক দেখা হওয়ায় দুজনেই অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত। কিছুক্ষণ আমার খোঁজ খবর নিয়ে ব্রিটিশ কায়দায় ফরমাল ব্যবহার করে আবার ঝড়ের বেগে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। ইউরোপিয়ানদের আবেগ বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমি আবার মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ লাইন। লাইনে আমার সামনে দাঁড়ানো সবাই আফ্রিকা থেকে এসেছেন। আফ্রিকানরা তাদের জীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবনকে উপভোগ করতে জানে। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি তাদের মধ্যে নেই। বরং তাদের উৎসর মুখর আচরণ, আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিচ্ছেদ, অঙ্গভঙ্গি আমাদেরকেও চাঙ্গা রাখে। লাইনে আমার পেছনের সবাই লন্ডন থেকে উড়ে আসা ফরমাল ইংলিশ। পেছনে ঘাড় ঘুরালেই তাদের কেতাদূরত্ব হাই, হ্যালো ও আনুষ্ঠানিক মাপা হাসি দেখতে হচ্ছে। সামনে তীব্র কালো ও পেছনে তীব্র সাদাদের মাঝখানে আমি একমাত্র উজ্জ্বল শ্যামলা! ঢাকা থেকে আমার সঙ্গে উড়ে আসা কাউকে লাইনে দেখতে না পেয়ে আমি একই সঙ্গে আনন্দিত ও উদ্বিগ্ন। আনন্দের কারণ সবাইকে যখন এন্ট্রি দিয়ে দিয়েছে তখন নিশ্চয়ই আমাকেও দেবে। উদ্বেগ! সবার সঙ্গে এক সাথে বের না হয়ে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করার উদ্বেগ।
আমরা সারিবদ্ধ মানুষজন ক্রমেই ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে অগ্রসর হয়ে অফিসারদের ভাবভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করেছি। কর্মকর্তাগণ সবাই তরুণ, চাপা দাড়ি ও আরবি পোশাকে অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল। ভোর ছয়টায় তারা কিভাবে এতো প্রাণবন্ত, তা ঢাকা বিমানবন্দরের বিরক্ত, ক্লান্ত কর্তাদের দেখে অভ্যস্ত আমি কোন ভাবেই বুঝে উঠতে পারছি না। এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। মুখোমুখি দাঁড়ালাম চেক আউটের জন্য। কর্মকর্তা আমার পাসপোর্টের পৃষ্ঠা উল্টে স্ক্যান মেশিনের সামনে ধরলেন। পাঁচ সেকেন্ডে স্ক্যান হয়ে গেল। ক্যামেরার দিকে তাকানোর পর ছবি তোলা হয়ে গেল। এবার পাসপোর্টে সিল মেরে আমাকে বিদায় জানালেন। এখন আমি কোন দিক দিয়ে বিদায় নেব? দুবাইয়ের দিকে না বাংলাদেশের দিকে? তারা তো আমার ভিসাটিও দেখলেন না! আমিরাত কর্তৃক প্রদত্ত ই-ভিসার কাগজটি কর্মকর্তাকে দেখানোর চেষ্টা করলাম। আমিরাত পাসপোর্টে অন্যান্য দেশের মতো স্টিকার ভিসা দেয় না। ভিসাটি আলাদা সিটে প্রিন্ট করা থাকে। ভিসাটি তিনি দেখতেই চাইলেন না, বরং কোন দিক দিয়ে বের হবো, সেই পথটি দেখিয়ে দিলেন। এই পথটি যে দুবাইয়ের দিকে! ঢাকায় এতো তর্জন, গর্জন আর এখানে রীতিমতো বর্ষণ! আমি তো প্রায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম। সামান্য ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হলো না। তাদের ‘হাইকোর্ট’ দেখবো বলে ঢাকা হাইকোর্টের প্র্যাকটিসের কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলাম। ইউরোপ ভ্রমণের প্রমাণপত্র সাথে ছিল। বাধাহীনভাবে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় কিছুটা হতাশ। আসলে মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রাণী। তাদের বস্তুগত কোনো কিছু পাওয়ার যে আকাক্সক্ষা, তা পাওয়ার সাথে সাথে এর তৃপ্তি দেয়ার ক্ষমতা কমতে থাকে। তবুও আমি আনন্দে আত্মহারা এবং খোঁজে না পেয়ে লাগেজহারা। কর্মচারীরা তা খোঁজে পেতে আমাকে সাহায্য করলেন। এই কর্মচারীদের কাউকে কাউকে অভাগা দেশের মানুষ বলে মনে হলো। শারীরিক মানসিক অবসাদগ্রস্ত থাকায় তাদের সঙ্গে আর কথা বলতে পারিনি। খোঁজতে খোঁজতে পঁচিশ নাম্বার বেল্টে গিয়ে একা পড়ে থাকা লাগেজটিকে আবিস্কার করলাম। অনেকক্ষণ পর লাগেজটি খোঁজে পেয়ে দীর্ঘদিন পর আপনজনকে কাছে পাওয়ার মতো আনন্দ পেলাম। এগিয়ে যেতে যেতে পরবর্তী বিশাল হলরুমে প্রবেশ করলাম। সেখানে রিসিভ করতে আসা লোকজন বিভিন্ন নামে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। প্লেকার্ড হাতে আমার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে নেই জেনেও সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। দুবাইয়ে অবস্থানকালে প্রথম সপ্তাহ আমি থাকবো বন্ধু জুয়েলের ছোট ভাই জুসেফের ডরমেটরিতে। বিমানবন্দর থেকে সেখানে কিভাবে পৌছাব, তা সে মোবাইলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল। এয়ারপোর্টের ভেতরে মানি এক্সচেঞ্জ থেকে একশ ডলার ভাঙ্গিয়ে তিনশত পঁচাত্তর দিনার পেলাম। সেখান থেকে বের হয়ে মূল সড়কে এসে মেট্রো রেলের খবর নিলাম। আমাকে জানানো হলো তা বন্দরের ভেতরে বাম দিকে গিয়ে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই মেট্রো স্টেশন পাওয়া যাবে। আবার বিমানবন্দরে ঢুকলাম। নিরাপত্তায় কোনো পুলিশ দাঁড়িয়ে নেই। আশ্চর্য! এবার মেট্রো রেলের সাইন দেখে এগিয়ে গিয়ে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে অন্তত ৫০/৬০ ফুট উপরে উঠার পর রেল স্টেশনের দেখা পেলাম। ২৫ দিনার দিয়ে টিকেটর ওয়েস্টার কার্ড কিনলাম। এই কার্ডটি রিচার্জ করে বারবার ব্যবহার করা যায়। এমনকি পাবলিক বাসেও ব্যবহার করা যায়। স্টেশনে দুবাই রেলের পুরো রোড ম্যাপ অঙ্কিত রয়েছে। রেল ব্যবস্থা শুধু শহরের ভেতরে এবং খুবই সীমিত। সর্বসাকুল্যে ৫০/৬০ টি স্টেশন হবে। যেখানে লন্ডনে আন্ডারগ্রাউন্ডেই আছে রেলের অন্তত সাড়ে তিনশ’টি স্টেশন! ভোর ছটা থেকে রেল চলে রাত বারোটা পর্যন্ত। প্রতি ৪/৫ মিনিট পরপর ট্রেন আসছে। দশ সেকেন্ড অবস্থান করে আবার উল্কার মতো ছুটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ম্যাপ দেখে অনুমানে আমার গন্তব্য ট্রেনে লাফ দিয়ে উঠলাম। লন্ডনের আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন চলাচল সিস্টেমের মতো সবকিছু অত্যন্ত সহজ। ট্রেনের বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলো উপভোগ করা যায়। ট্রেন ৬০/৭০ ফুট উঁচু দিয়ে চলাচল করায় বাইরের দৃশ্য দেখতে সুবিধে হচ্ছে। ট্রেনের ভেতরে সবগুলো স্টেশনের নাম দিয়ে রোডম্যাপ অঙ্কিত আছে। তাছাড়া প্রতিটি স্টেশনে পৌছার আগে প্রথমে আরবিতে ও পরে ইংরেজিতে ঘোষণা দিচ্ছে। আমরা কোন স্টেশনে এসেছি এবং পরবর্তিতে কোন স্টেশনে যাচ্ছি। তাছাড়া টিভি মনিটরেও স্টেশনগুলোর নাম দেখাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় ভাবে ট্রেনের দরজা বন্ধ হওয়ার পর তা চলতে শুরু করল। ছয়টি বগি নিয়ে চলতে শুরু করা ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা খুবই কম সম্ভবত ভোরবেলা বলে। তবে সময় বাড়ার সাথে সাথে যাত্রী বাড়তে লাগলো। বেশীরভাগ যাত্রীই আমাদের উপমহাদেশের। কিছু যাত্রী থাইল্যান্ড ও চীনের। এবার বাইরের প্রকৃত দুবাই দেখার চেষ্টা করলাম। সূর্যের আলো তখনও মরু স্পর্শ করেনি। ট্রেন ছুটে চলেছে শহরের পূর্ব প্রান্ত থেকে ক্রমশ পশ্চিম প্রান্তে। প্রথমে বিমানবন্দরের তিনটি টার্মিনাল অতিক্রম করার পর ৪/৫ তলা পুরনো সব ভবন। বিমানবন্দরের কাছাকাছি পুরাতন দুবাই। ভবন সবগুলো পুরনো, যেগুলো তাদের অতীতের দৈন্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পনের মিনিট চলার পর ভবনগুলোর আকৃতি, প্রকৃতি সব পরিবর্তিত হতে থাকলো। ভবনগুলো সুউচ্চ, অত্যাধুনিক সব ডিজাইন। এটি নতুন দুবাই। উচ্চ ভবনগুলো একটি থেকে অন্যটি কিছুটা দূরত্বে। এতে দৃষ্টিসীমা ঢাকা শহরের মতো বারবার আটকে যায় না। এ সময়ের মধ্যে সবুজ রং কোথাও চোখে পড়লো না। এতক্ষণে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়তে শুরু করেছে চারিদিকে। চকচক করছে দুবাই, তবে সবুজ না থাকায় জৌলুস থাকলেও তা প্রাণহীন। সুপরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখা গেল উপর থেকে। একের পর এক ফ্লাইওভার। শহরের ভেতরে প্রচুর ফাঁকা জায়গা। রাস্তার চেয়ে ফুটপাত প্রশস্ত। এরপর অনেকখানি খালি জায়গা, তারপর সুদৃশ্য ভবন। কারুকার্য মন্ডিত মসজিদ। সবগুলো একতলা এবং অসাধারণ নির্মাণ শৈলী সম্পন্ন। হঠাৎ অনেক দূরে চোখে পড়ল ‘ভূজ আল আরব’। সাগরের মধ্যে জাহাজের মতো সুদৃশ্য ইমরাত, যা অন্তত ত্রিশ বছর যাবৎ দুবাইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ ভবনটি দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে না যেতেই পৃথিবীর সব চেয়ে উঁচু ভবন ‘ভূজ খলিফা’ দৃষ্টি গোচর হলো। আমি তো মাত্রই দুবাই এসেছি। যারা নিয়মিত এ পথে চলাচল করছে, তারাও একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ভবনটি দেখে নিল। পৃথিবীর উচ্চতম ভবন নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখব। কারণ এ ভবনের সর্বোচ্চস্থানে উঠে সর্বনি¤œ অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাকে নামতে হবে ‘শারাফ ডিজে’ স্টেশনে। ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে এসে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। টিকেটের কার্ডটি যথাস্থানে স্পর্শ করাতেই ট্রেনের ভাড়া বাবদ ছয় দিনার কেটে নিল এবং বের হওয়ার পথের ব্যারিকেড স্বয়ংক্রিয় ভাবে সরে গেল। থাই ও কাঁচ দিয়ে ঘেরা চমৎকার ছিমছাম রেল স্টেশন। বের হয়ে দেখি একটি টেক্সি দাঁড়িয়ে আছে। আমি যাব জুমেরা ভিলেইজ। ড্রাইভার কে ঠিকানাটি দেখালাম। তিনি যাবেন না বলে আমাকে অন্য টেক্সি খুঁজে নিতে সাহায্য করলেন। টেক্সিতে উঠেই ড্রাইভার সাহেবের সাথে কথা বলা শুরু করে দিলাম। তিনি একজন ভারতীয় এবং হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করে দেয়ায় আমি হিন্দি বুঝি না বলে জানালাম। আমি শ্রীলংকান কিনা জিজ্ঞেস করাতে কিছুটা আহত হলাম। কারণ আমাদের এই অঞ্চলে শ্রীলংকানরাই বেশী কালো। তার বারো বছরের দুবাইয়ে অবস্থানকালীন সময়ে হিন্দি না জানা বাঙালি নাকি তিনি দেখেননি। কথা বলতে বলতে পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা গন্তব্যে চলে এলাম। টেক্সির মিটারে উঠলো বাইশ দিনার। ডরমেটরির প্রবেশদ্বারে ছোটভাই জুসেফের কথা বলাতে উজবেকিস্তানী গার্ড আমাকে সসম্মানে ওয়েটিং রুমে বসালেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি আমার কাছে জুসেফকে নিয়ে এলেন। সে জুসেফ জাম্বিয়ার অধিবাসী। একটা মানুষ যতখানি মোটা হতে পারে , তিনি ততখানি মোটা। একটা মানুষ যতখানি লম্বা হতে পারে তিনি ততখানি লম্বা, একটা মানুষ যতখানি কালো ……। তিনি কড়কড়ে লাল চোখে, দৈত্যিক পায়ে আমার সামনে এসে হুংকার দিয়ে বললেন, এতো সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে কী চাও আমার কাছে?……. (চলবে)