স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দ্বারা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে সরকারি বিছানাপত্র আটকের ঘটনাটি নিতান্তই একটি প্রতীকী ইঙ্গিত। সেটি হল, ওই হাসপাতালের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে আছে। এই অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিলেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। খাদ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে সরকারি ঔষধ সরবরাহ; চিকিৎসক-নার্সদের অনুপস্থিতি থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয়-পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব পালন না করা; চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের সেবাপরায়ণ মনোবৃত্তির অভাব থেকে শুরু করে হাসাপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পর্যন্ত এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। ভাল কথা বলে দায়িত্ব পালন শুরু করা একজন সিভিল সার্জনের বদলিতে এ কারণেই সুনামগঞ্জবাসী ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিলেন। ওই সিভিল সার্জনের কথার মধ্যে মানুষ এক ধরনের আশার জায়গা খোঁজে পেয়েছিলেন। সকলেই ভেবেছিলেন, তিনি বোধ করি এবার ভয়াল বিস্তৃত দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে কিছুটা হলেও সফল হবেন। কিন্তু দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কারণে তিন সপ্তাহের মাথায় তাঁকেও সুনামগঞ্জ ছাড়তে হল। স্বাস্থ্যপ্রশাসন জেলাবাসীর আবেগ ও ক্ষোভের বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করলেন না। ফলত ওই সিভিল সার্জন ভাল কি মন্দ তা যাচাই করারই সুযোগ পেলেন না কেউ। এরকম অবস্থায় নাগরিক সমাজের অভিযোগ মোতাবেক জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অনিয়ম-অরাজকতা দূর তো হবেই না বরং হাসপাতালের বিছানাপত্র সমেত সবকিছুই চুরি হবে। স্থানীয়দের চোখে ধরা পড়ে যাওয়ায় শুক্রবার বিকালে পাচারের সময় বমাল ধরা পড়লেন আউটসোর্সিং কর্মচারী সোহাগ। তিনি ধরা পড়ে রহিমা নামের জনৈক সেবিকার নাম করে বললেন, তিনি তার নির্দেশে এগুলো বাইরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। নার্স রহিমা চুরির দায় স্বীকার করে লজ্জা পাবেন দূরে থাক তিনি এসে আটককারী স্থানীয়দের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হলেন।
মূলত হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে এখানকার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে অব্যবস্থার এই অচলায়তন কখনও সচল করা সম্ভব হবে না। একটি সিস্টেমে শীর্ষে একজন প্রশাসক থাকেন। সিভিল সার্জন তিনি। কিন্তু একা সিভিল সার্জন সবকিছু সামাল দিতে পারবেন না। তাঁর পুরো টিম সহায়তা না করলে তিনি কিছুতেই সফল হবেন না। তিনি যেটি করতে পারেন, দুর্নীতির সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করতে পারেন। আর তিনি যদি নিজেই দুর্নীতির অংশীদার হয়ে উঠেন তখন তো আর কিছুই করার থাকে না। শীর্ষ পদে একজন পরিচ্ছন্ন ইমেজের কর্মকর্তা ওই জন্যই প্রয়োজন, মানুষের আকাক্সক্ষাও তাই। যেখানে হাসপাতালের কোনো মালামাল বাইরে পাচার হচ্ছে কিনা সেটি সার্বক্ষণিক দেখার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, সেখানে স্থানীয়দের দ্বারা আটক হওয়ার ঘটনাটি হাসপাতালের অভ্যন্তরের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা কেমন সেটি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। আমরা এই অবস্থার অবসান চাই। জেলা সদর হাসপাতালটি বহুতল ভবন ও শয্যা সংখ্যায় উন্নীত হয়ে সেবা সক্ষমতা কাগজে পত্রে বাড়িয়েছে সত্য কিন্তু বাস্তবে সেবাগ্রহীতারা এই সুবিধা কতটুকু ভোগ করতে পারছেন সেটিই আসল পরিমাপ করার জিনিস। বলা বাহুল্য ওই জায়গায় ইতিবাচক কিছু বলার অবকাশ নেই।
আইটসোর্সিং কর্মচারী সোহাগ কিংবা সেবিকা রহিমা ছোট একটি অপকর্মের সাথে জড়িত। আসলে বড় বড় অপকর্মগুলো নির্বিঘেœ সম্পাদিত হয় বলেই সর্বস্তরে এটি মহামারির মত বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাই জড়িত সোহাগ ও রহিমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি যদি হাসপাতালের সার্বিক মানোন্নয়নে স্বাস্থ্য প্রশাসন উদ্যোগী হন তাহলে আমরা সেটিকে কাজের কাজ হিসাবে মনে করব। আমাদের এই মনে করার মাঝে এক ধরনের আশাবাদী মনোভাব কাজ করে। সত্যিই আশাবাদী হয়ে উঠার মত কিছু দেখতে পাব কি আমরা?

