বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিদেশে দেশের লোকজন পেলে কি যে আনন্দ লাগে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। আমেরিকাতে এসে এখনও সুনামগঞ্জের কোন লোকজনের সাথে দেখা হয়নি। সুনামগঞ্জের লোকজনের সাথে দেখা না হওয়ায় আমার প্রাণটা আটকে আছে। আমাদের এলাকার বেশী লোকজন থাকেন নিউ ইয়র্কে। তাছাড়া মিশিগান, আটলান্টা, নিউ জার্সি এই সকল শহরেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন সুনামগঞ্জের লোকজন। আমেরিকা আসার পর অনেকের সাথেই ফোনে আলাপ হয়েছে। সবাই আন্তরিকতার সাথে আমাকে তাদের শহরে যাওয়ার আমন্ত্রন জানাচ্ছেন। এদিকে আমার দেশে ফেরার সময় চলে আসেছে। সব শহরে গিয়ে সবার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে এটা সম্ভব নয়। নিউ ইয়র্ক থেকে মিশিগান প্লেনে যেতে প্রায় তিন ঘন্টা লেগে যায় তাছাড়া সাথে এত ডলার নেই যে প্লেনে ঘুরে ঘুরে বেড়াব। আমার ফিরতি ফ্লাইট নিউ ইয়র্ক থেকে তাই নিউ ইয়র্কে যারা আছেন তাদের সাথে দেখা করেই চলে যাব মনস্থ করলাম। এরি মাঝে নিউ ইয়র্কে থাকা বন্ধু নুরুজ্জামান চৌধুরী শাহী, সউদ আহমদ চৌধুরী, মোস্তাকিম আলী (জগলুল), ছোট ভাই ইশতিয়াক রুপু আহমদ, মারুফ চৌধুরী, আমার একই উপজেলার বাসিন্দা রিন্টু, ভাতিজা সাগর রায়, বড় ভাই তোফাজ্জল করিম (আবু ভাই), জার্মানীতে থাকা অবস্থায় বন্ধু মুকিত চৌধুরী এদের সাথে প্রতিনিয়ত ফোনে কথা হচ্ছে। একটু সময় নিয়ে নিউ ইয়র্ক আসার জন্য সবাই বলছেন। আমি একাই প্রথমে নিউ ইয়র্ক আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার স্ত্রী মুনমুন, মেয়ে দীয়াকে নিয়ে পরে দীপ আসবে নিউ ইয়র্কে। তারপরে আমাদেরকে বিদায় করে দীপ আবার চলে যাবে এরিজোনায়। নিউ ইয়র্কে আমার বাল্য বন্ধুদের মাঝে শাহী, সউদ আর মোস্তাকিম থাকে। একসাথে পড়াশুনা করেছি একসাথে এই ছোট্ট শহরে বড় হয়েছি। নিউ ইয়র্কে গেলে তাদের এখানে থাকবো বলে মনে মনে ঠিক করেছি। এই তিনজনেরই আমেরিকাতে আসার বিরাট এক কাহিনী আছে। প্রথম প্রজন্ম হিসাবে তারা আমেরিকাতে তাদের উত্তরসূরীদের জন্য ভিত সৃষ্টি করেছেন।
আমেরিকাতে প্রথম প্রজন্মরা অনেক কষ্ট করে দাড়ান পরবতী প্রজন্মরা সেটা ভোগ করেন আর তৃতীয় প্রজন্ম বলেন এখানে আমার চাচা খালারা জন্মেছেন, এটাই আমার দেশ। এটাই সত্যি কথা। আমাদের এই বন্ধুদের মাঝে নুরুজ্জামান চৌধুরী শাহী ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী সুনামগঞ্জ মহকুমা ছাত্র লীগের সভাপতি। এক সময়ের তুখোর ছাত্র নেতা। পচাত্তরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু সংখ্যক বিপদগামী সেনা অফিসারদের দ্বারা নিহত হলে দেশে সামরিক শাসন জারী হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ সহ প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক দলের নেতাদের ধরে ধরে জেলে ঢুকানো হয়। শাহীকেও কারাবরন করতে হয়। এক সময় জেল থেকে ছাড়া পেলেও রাজনিতী করার মন মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। দেশ থেকে পালিয়ে গেলেই যেন বাঁচা যায়। শাহী আর আমাদের বন্ধু মরহুম মোসাদ্দেক রেজা একসাথে ১৯৭৯ সালে চলে আসে হল্যান্ড। আমি তখন পশ্চিম জার্মানীতে থাকি। মোসাদ্দেক হল্যান্ডে থেকে গেলেও শাহী চলে আসে পশ্চিম জার্মানীতে। পশ্চিম জার্মানীতে থাকার তখন একমাত্র রাস্তা রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া। শাহী পশ্চিম জার্মানীর ভেসেল শহরে থেকে যায়। শহরটি হল্যান্ডের বর্ডারের পাশে থাকায় শাহীর জন্য সুবিধা হয়েছিল। ভাবী মনোয়ারা এবং ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে সুমিকেও সে নিয়ে আসে । পশ্চিম জার্মানীতে থাকা অবস্থায় শাহীর কাজ করতে মন চাইত না। সব সময় আমেরিকাতে যাওয়ার জন্য মনটা উসখুস করত। আমেরিকাতে তার মামাত ভাই জামসেদ চৌধুরী থাকতেন। উনার সাথে যোগাযোগ করত আর আমেরিকা যাওয়ার পথ খুজত। এক সময় ভেনেজুয়োলার ভিসা নিয়ে বলেছিল ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকা চলে যাবে। আমরা যখন বললাম ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকা যাওয়া সহজ হলে ঐ দেশটির মানুষ সবাই আমেরিকা
চলে যেত। তারপরে ভেনেজুয়েলার পথে সে পা বাড়ায়নি। তবে তার মন থেকে আমেরিকা যাওয়ার ইচ্ছা সরানো যাচ্ছিলনা। পথ একটা বের হল। জার্মানরা বাহামা দ্বীপপুঞ্জে অবকাসকালীন সময় কাটান। বাহামা দেশটা আবার কমনওয়েলভুক্ত দেশ। এই দেশে যেতে বাংলাদেশীদের কোন ভিসা লাগেনা। বাহামার রাজধানী নাসাউর সাথেই আটলান্টিক মহাসাগর। এই মহাসাগরটি পার হতে পারলেই স্বপ্নের দেশ আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গ রাজ্যের মিয়ামি বিচ। কিন্তু কিভাবে এই মহাসাগর পাড়ি দেওয়া যাবে। এটাতো চাট্টি খানি কথা নয়। শুরু হল খবর নেওয়ার পালা। যারা ট্রাভেলস চালান তারা এই সকল ব্যপারে খোজ খবর রাখেন। অবকাশ সময়ে জার্মানরা বাহামাতে গিয়ে সমুদ্র তীরে কাটান এবং সেই সাথে মহাসাগরে ঘোরাফেরা করেন। তারা মাছ ধরার ট্রলারে করে এই মহাসাগর পাড়ি দেন। তারপর ফ্লোরিডার সি বিচে এসে সময় কাটান। এজন্য বাহামার রাজধানী নাসাউ থেকে হেলিকপ্টারে করে যেতে হয় বিমিনি নামক আরেক শহরে। সেই শহরে গেলে পাওয়া যায় স্পেনিস ট্রলার মালিকদের। এরা আসলে ট্রলারে করে মাছ ধরেন। আর মাঝে মাঝে অবকাশে আসা জার্মান নাগরিকদের আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গ রাজ্যের মিয়ামি বিচ দেখিয়ে নিয়ে আসেন। শাহী তার সঙ্গী জোগাড় করেছে হেলাল নামে আরেকটি ছেলেকে। হেলালের মুল বাড়ি কুমিল্লায় হলেও তার বাবা প্রায় পচিশ বছর যাবত সিলেটে আছেন। ব্যাংকে চাকুরী করা অবস্থায় বিয়ে শাদী করে থিতু হয়েছেন সিলেটেই। এই হেলাল আর শাহী আমেরিকাতে যাওয়ার জন্য বাহামার রাস্তাটাই নিতে প্রস্তুত। দিনক্ষন ঠিক করে তাদের টিকেট করা হল। এরা যদি এই রাস্তায় পৌছাতে পারেন তাহলে আরো কয়েকজন যাবেন বলে লাইনে দাড়িয়ে আছেন। ডিসেম্বরের কনকনে শীতের সময় তাদের টিকেট করা হয়েছে। আমাদের শহর মাইনজের রেলওয়ে ষ্টেশনের পাশে একটি ট্রাভেলস। দুইশত জার্মান যাত্রীর জন্য ট্রাভেলসটি এয়ারক্রাফটটি ভাড়া করে। সেখানে জার্মান আছেন একশত আঠানব্বই জন। বাকী দুইজন বাংলাদেশী। সমুদ্র উপকুলে শীতের সময়ে আবহাওয়া গরম থাকে বিধায় জার্মানরা দলে দলে সমুদ্র তীরে চলে যান। মনোয়ারা ভাবী সুমিকে নিয়ে চলে এসেছেন মাইনজ শহরে। এই শহরেই একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করা হয়েছে তাদের জন্য। শাহী যদি আদৌ আমেরিকাতে চলে যেতে পারে তবে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। আর যদি ফিরে আসে তবেতো আবার জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকতে হবে। একদিন ফ্রাংকফুট এয়ারপোর্টে গিয়ে বিদায় জানালাম শাহী আর হেলালকে। কয়েকদিন চলে গেলেও কোনো খবর নেই তাদের। কি হয়েছে তাও জানার কোন উপায় নেই। এভাবে একটা অজানা পথে পাড়ি দেওয়া কি ঠিক হয়েছে ? অজানা আশংকায় আমাদের প্রতিদিন কাটে। প্রায় পাচদিন পর শাহীর ফোন। আমি আমেরিকার নিউ ইয়র্কে চলে এসেছি। শাহীর কাছ থেকে জানা গেল আরেক গল্প। তাদের এয়ারক্রাফটা ঠিক ঠিকই ছেড়েছিল ফ্রাংকফুট থেকে। বাহামার রাজধানী নাসাউর কাছে যেতেই এয়ারক্রাফটি আর নামতে পারছিলনা। আবহাওয়া ছিল একদম বৈরি। প্রচুর তুষারপাত হচ্ছিল। এই ছোট্ট এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করা ঠিক হবেনা বিধায় পাইলট এয়ারক্রাফটি ঘুরিয়ে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসেন ফ্লোরিডার মিয়ামি বিচের এয়ারপোর্টে। এখানেই অবতরন করে এয়ারক্রাফটি। সব যাত্রীদের একটি হোটেলে নিয়ে তুলে। সবাইর পাসপোর্ট , আই ডি কার্ড হোটেল কাউন্টারে জমা দিয়ে তাদেরকে এক একটা রুম দেওয়া হয়। যাত্রীদের জানানো হয় আবহাওয়া ভাল হলেই তাদেরকে বাহামাতে নিয়ে যাবে। শাহী আর হেলাল দেখল তাদেরতো আসার কথা এই মিয়ামি বিচে। তাইলে আর অপেক্ষা কেন। পাসপোর্ট, ছোট হ্যান্ড লাগেজ হোটেলে রেখেই বের হয়ে আসে। একটি ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসে রেলওয়ে ষ্টেশনে। সেখান থেকে দুই রাত তিন দিন রেলওয়েতে করে চলে আসে নিউ ইয়র্ক। মামাত ভাই জামসেদ ভাইর সাথে যোগাযোগ করেছিল মিয়ামিতে এসে। তিনি তার ছোট ভাই মুসনুদকে পাঠান তাদের নিয়ে আসার জন্য। পাসপোর্ট, ভিসা, লাগেজ কিছু ছাড়াই স্বপ্নের দেশ আমেরিকাতে আসে শাহী। রাজনৈতিক আশ্রয়, টেক্সি চালানো, বাড়ি কেনা বেচার ব্যবসা করে একসময় দাড়াতে হয়েছে তাকে। রোনাল্ড রেগান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় অবৈধ অভিবাসীদের সাধারন ক্ষমার আওতায় নিয়ে এসেছিলেন তবে কথা ছিল যারা সাত বছর আমেরিকার ক্ষেতে খামারে কাজ করেছেন তারা প্রমানপত্র দেখালেই তাদেরকে বৈধ করা হবে। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান বানে। আমাদের বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসিরা এই রাস্তাও বের করে ফেলেন। দুর্ণিতীবাজ খামারিদের কাছ থেকে উৎকোচ দিয়ে ক্ষেতে কাজ করার সার্টিফিকেট নিয়ে আসেন। আর এক পর্যায়ে অনেক অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসি নিজেদের বৈধ করে ফেলেন। প্রথম প্রজন্মরা এই রকম কষ্ট করে আজ প্রতিষ্টিত হয়েছেন পরন্ত বেলায়। শাহীর মেয়ে সুমি আর ছেলে সোহান এখন আমেরিকার এ্যাটর্নি (আইনজীবী)। দুজনেই চুটিয়ে আইন পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। (চলবে)
- জেলা পরিষদ নির্বাচন ২ নম্বর ওয়ার্ডে আ.লীগের একাংশ পান্নাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে
- জগন্নাথপুরে ১৫ জুয়াড়ি আটক অতঃপর মুচলেকায় মুক্তি


