ভ্রমণ- লিংকনের আমেরিকায় কিছু দিন

বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমরা চারজন উঠেছি পাতাল রেলে। আলাদা একটা অনুভুতি আজ আমাদের। ষ্টেচু অব লিবার্টির ছবি এর আগে অনেক দেখেছি। আজকে সেটা চাক্ষুস দেখতে পাব। দীপ এর আগে বেশ কয়েকবার নিউ ইয়র্ক আসায় পথ ঘাট তার ভাল জানা। আমাদেরকে দুটো পাতাল রেল পরিবর্তন করতে হল। এস্টোরিয়া থেকে যেতে আমাদের প্রায় দুই ঘন্টা লেগে যায়। হাজার হাজার পর্যটক এসেছেন স্টেচু অব লিবার্টি দেখতে। অন লাইনে টিকেট করা থাকায় টিকেটের ঝামেলায় আমাদের যেতে হয়নি। পথি মধ্যে দেখলাম মধ্যস্বত্ব ভোগীরা  টিকেট নিয়ে দাম দর হাকছেন। পথে অনেকেই বিভিন্ন দোকানের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। চীনের ছেলেরা পর্যটকদের ছবির পোট্রেট এঁকে দিচ্ছে। সোজা চলে আসলাম লাইনে। লম্বা লাইন পরেছে। দুই লাইনে দাড়িয়েছেন পর্যটকরা। এক সময় আমরা আসলাম  
হাডসন নদীর তীরে। এখান থেকেই জাহাজ ছেড়ে যাবে। এত পর্যটক আসেন তাতে প্রায় প্রতি দশ মিনিট অন্তর একটা জাহাজ লিবার্টি দ্বীপের দিকে যায়। জাহাজটা দোতলা। আমরা উপরতলাতে উঠলাম। নীচ তলায় বাথরুম, রেষ্টোরেন্ট সহ বসার জায়গা আছে। উপরতলা থেকে নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সিকে দেখা যাচ্ছে। হাডসন নদী এই দুটো ষ্টেটকে ভাগ করেছে। হাডসন নদীর উপর অনেকগুলো ব্রীজ। নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সি যাওয়ার জন্য এই ব্রীজগুলো ব্যবহার করা হয়। আমরা দোতালা থেকে দেখছি নিউ ইয়র্কের উচু উচু দালান। ম্যানহাটনের আকাশ চুম্বি অট্টালিকারাজি, যেখানে আছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং ইত্যাদি অতিকায় ইমারত। এগুলো যেন ঐশ্বর্যের পর্বত শ্রেণী। ওয়ালস্ট্রীটের স্টক এক্সচেঞ্জ সারা ধনতান্ত্রিক পৃথিবীর অর্থনৈতিক অস্তিত্ব। জাহাজের দোতালা থেকে দেখছি পৃথিবীর শ্রেষ্ট ধনকুবেরদের বানিজ্যিক কোম্পানী সমূহের সদর দফতর। যেখান গচ্ছিত আছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এক সময় আমাদের জাহাজ নোঙ্গর করল লিবার্টি দ্বীপে। ৩০৬ ফুট উচু মূর্তিটি এখন আমাদের সামনে। মাথা উচু করে দেখতে হয়। স্টেচু অব লিবার্টির বেদিমূলে অবস্থিত মিউজিয়ামে আমেরিকায় বহিরাগমন সম্বন্ধে একটি তথ্য আমাকে আকৃষ্ট করে। সেখানে আছে ইউরোপীয়ানরা আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার প্রায় ২০ হাজার বছর আগে আমেরিকার প্রথম অধিবাসীরা এশিয়া হতে আগমন করে। এশিয়ানরাই প্রথমে ভুট্টা, আলু এবং তামাক উৎপাদন করে যা পরবর্তীতে শ্বেতাঙ্গরা তাদের কৃষিতে সংযোজন করে। জানিনা এই এশিয়ানদের মাঝে আমাদের বাঙ্গালীরা ছিলেন কিনা। ঘন্টাখানেক আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। জলন্ত একটি ইতিহাস আজ আমাদের সামনে। এই লিবার্টি দ্বীপে এসে সবাই ফটো সেশসে মত্ত থাকেন। অনেক সময় স্টেচু অব লিবার্টিকে নিয়ে ছবি তুলতে হিমসিম খেতে হয়। অনেকক্ষন দাড়িয়ে তারপরে একটা সুন্দর জায়গা নির্ধারন করা হল। এই জায়গা থেকেই লিবার্টি অব স্টেচুকে নিয়ে ছবি তুলার পর্ব শেষ করতে হল।
স্টেচু অব লিবার্টি থেকে ফেরার পথে আরেকটি জাহাজে উঠতে হল। জাহাজগুলো পর্যটকদের আনা নেওয়া করছে। এখান থেকে যাওয়ার পথে এলিস আইল্যান্ডে জাহাজ আবার নোঙ্গর করবে। যারা এলিস আইল্যান্ড দেখবেন তারাই এখানে নামবেন। এটার জন্য আলাদা কোন টিকেট করতে হবেনা। স্টেচু অব লিবার্টির  টিকেটের সাথে এটা এক করা আছে। আমরা আর কবে আমেরিকা আসব তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই তাই নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। অনেকেই না নেমে জাহাজে বসে থাকেন। কেউ হয়তো এত ঘুরাঘুরির পর অবসাদগ্রস্থ হয়ে গেছেন তাই ফিরে যেতে চান। এলিস আইল্যান্ডে পর্যটকদের নামিয়ে জাহাজটা চলে যাবে। আমরা নেমেই এই দ্বীপের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি। এখানে না নামলে হয়তো অনেকটা অপূর্ণতা থেকে যেত। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপীয় অভিবাসিরা আসতে থাকেন। সে সময় উড়োজাহাজ বা মহাসড়কের কোন যোগাযোগ ছিলনা। আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার একমাত্র পথই ছিল সাগর পথ। আর যানবাহনতো এই জাহাজ, ট্রলার । সেটাও হাজার বছরের ইতিহাস। এলিস আইল্যান্ডেই নুতন অভিবাসিদের ইমিগ্রেসন হত। জায়গাটাতে মিউজিয়াম করেছেন আমেরিকা সরকার। এটাকে নাম দেওয়া হয়েছে “এলিস আইল্যান্ড ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইমিগ্রেশন”। এখানে রাখা আছে প্রথম দিককার অভিবাসিদের ছবি তারা বাক্স পেটরা নিয়ে লাইন ধরে আসছেন। রাখা হয়েছে অভিবাসিদের মালামাল রাখার ট্রাংক। আমরা ছোট বেলায় টিনের ট্রাংক ব্যবহার করতাম। এই রকম অনেকগুলো ট্রাংক রাখা আছে। তাছাড়া অভিবাসিদের জামা কাপড় সহ অনেক খুটিনাটি সংরক্ষন করা হয়েছে। আমেরিকার হাজার বছরের অভিবাসিদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অনেকের নাম , পিতার নাম দেখলাম। আমি খুজছিলাম ভারতীয় উপমহাদেশের কারো নাম খুজে পাই কিনা। অনেকক্ষন খুজছিলাম অভিবাসিদের নাম ঠিকানা।  অভিবাসিদের ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস। আমেরিকা এখন অভিবাসিদের দেশ। যারা দেশটির মালিক ছিলেন সেই আদিবাসীদের আজ আর খোজে পাওয়া যায়না। দখল হয়ে গেছে তাদের জায়গা , সম্পত্তি, তাদের ভাষা সাংস্কৃতি, হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস।  এটা আমাকে পীড়া দেয়। নিজ দেশেই তারা আজ পরবাসি হয়ে গেছেন।  
এলিস আইল্যান্ড থেকে আসার পথে দীপ আমাদের নিয়ে গেল নাইন ইলেভেনের মেমোরিয়েলে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী গোষ্টি আল কায়েদা এই আক্রমন পরিচালনা করে বলে ধারনা করা হয়। এই আক্রমনের নেতা হিসাবে ওসামা বিন লাদেনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ওসামাকে পরবর্তীতে প্রান দিতে হয়। টুইন টাওয়ারখ্যাত বিশ্ব বানিজ্য কেন্দ্রের দুটি আকাশ ছোয়া অট্টালিকা। নাইন ইলিভেনের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের প্রতীক ছিল এই টুইন টাওয়ার। এখন গভীর এক নি:সীম শূন্যতা কেবল সেই দিনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেদিন সন্ত্রাসীরা চারটি বিমান ছিনতাই করেছিল। দুটি বিমান টুইন টাওয়ারে আঘাত হেনেছিল। দুই ঘন্টার মধ্যে ভবন দুটো মাটিতে ধুলিস্বাত হয়ে যায়। প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের সম্পদ নষ্ট হয় । হামলাটিতে ৩০০০ হাজার লোক নিহত হয়। নিহতদের মাঝে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকজন ছিলেন। তৃতীয় বিমানটি আঘাত হেনেছিল ভার্জিনিয়ার প্রতিরিক্ষা বিভাগ পেন্টাগনে।  চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পশ্চিম পেনসিলভেনিয়ার একটি খোলা মাঠে ভুপাতিত হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত টুইন টাওয়ারের মুল স্থানে এখন শোভা পাচ্ছে ৩০ ফুট উচ্চতার জলপ্রপাত। তার চার পাশের দেয়ালে ব্রোঞ্জের উপর খোদাই করে লেখা আছে নিহত মানুষের নাম। আমরা খুজছিলাম বাংলাদেশী নিহতদের নাম। নিহতদের আত্মীয়স্বজনরা নামের পাশে এসে ফুল দিয়ে যান। বিবিসিতে আমেরিকায় বসবাসরত মৌলভীবাজারের এক পরিবারের সাক্ষাতকার দেখেছিলাম। তাদের পরিবারের একজন নিহত হয়েছিলেন। তাই খুজছিলাম  নামটি পাওয়া যায় কিনা। এত নামের মাঝে সেই নামটি এত তাড়াতাড়ি আমরা খুজে বের করতে পারিনি।  নামগুলির মাঝে অনেক মুসলমান নাম পেলাম। ভাবলাম এই ইসলামের নামে সন্ত্রাসী গোষ্টী যাদেরকে হত্যা করেছে তাদের মাঝেতো মুসলমান আছেন। মেমোরিয়ালটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল সেভ ইলিভেন মেমোরিয়াল’ । ট্রিনিটি ষ্ট্রিটের গ্রাউন্ড জিরোতে এটার অবস্থান। নিহতদের ব্যাক্তিগত ব্যবহার্য জিনিষপত্র এখানে রাখা হয়েছে। টুইন টাওয়ারের আদলে পাশেই নুতনভাবে দালান হয়েছে। তবে পুরাতন জায়গার মেমোরিয়াল স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ২০০১ সালেন ১১ সেপ্টেম্বরকে। (চলবে)