মধ্যনগর উপজেলায় নেই স্থায়ী জনবল ও ভবন/প্রশাসনিক কার্যক্রম চলে অন্য উপজেলায়

মধ্যনগর প্রতিনিধি
নবগঠিত মধ্যনগর উপজেলায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের শুরু হয় গত বছরের(২০২২ খ্রিস্টাব্দ) জুলাই মাসে। এ উপজেলার ২৩টি দপ্তরের ২১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে বর্তমানে স্থায়ী জনবল হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ১ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ও ১ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রেষণে নিযুক্ত করা হয়েছে আরো ১ জন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী।এছাড়া বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় নিযুক্ত চতুর্থ শ্রেণির আউট সোর্সিং কর্মচারী আছেন ৬জন।
জানা যায় গত ২০ জুলাই ২০২২ সালে মধ্যনগরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) যোগদানের মধ্য দিয়ে ২জন কর্মচারী নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই নবসৃষ্ট এ উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এক বছর না পেরোতেই চলতি বছরের ৩০ মে তারিখে ইউএনও অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। এতে উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বর্তমানে মধ্যনগরে অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সপ্তাহে একদিন এসে মধ্যনগর উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অবশ্য জরুরি প্রয়োজন হলে সপ্তাহে একাধিকবার তাকে আসতে হয় মধ্যনগর।
ভুক্তভোগী জনসাধারণ বলছেন, মধ্যনগর উপজেলার জনসাধারণকে অতীতের মতো এখনো উপজেলা কেন্দ্রীক যে কোনো প্রশাসনিক কাজ ও নাগরিক সেবা পেতে ধর্মপাশা গিয়ে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়।
দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর এক বছর অতিবাহিত হলেও মধ্যনগর উপজেলা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ভবন নির্মাণ তো দূরের বিষয় ভাড়ায়ও নেওয়া হয়নি কোনও ঘর। পর্যাপ্ত জনবল ও ভবন না থাকায় শুরু থেকে এ পর্যন্ত এ উপজেলায় কার্যত কোনও প্রশাসনিক কার্যক্রম নেই। গত একবছরে ছোট পরিসরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালন ও ইউএনও কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ছাড়া তেমন কোনও কার্যক্রম দেখা যায়নি। একমাত্র পানি উন্নয়ন বোর্ডের(বাপাউবো) হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত দাপ্তরিক কর্মকা- মধ্যনগর উপজেলার অস্থায়ী ভবন থেকে পরিচালিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মধ্যনগর থানাটি এত দিন ধর্মপাশা উপজেলার অধীন ছিল। গত বছরের ২৬ জুলাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) ১১৭তম সভায় মধ্যনগর থানাটিকে উপজেলা হিসেবে উন্নীত করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নিকার অধিশাখা থেকে গত বছরের ১০ আগস্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত ও ২৪ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নবগঠিত মধ্যনগর উপজেলা গঠনের তফসিল সংক্রান্ত (সীমানা নির্ধারণ) গেজেট প্রকাশিত হয়।
নবগঠিত মধ্যমগর উপজেলার আয়তন ২২১ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা রয়েছে ৯২ হাজার ৭৪৫ জন। এখানে ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয় ১টি, ২০ একরের ঊর্ধ্বে জলমহাল ৩২টি, ২০ একরের নিচে জলমহালের সংখ্যা ১২টি, হাটবাজারের সংখ্যা ৪টি, শিক্ষার হার ২৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৪টি। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১০টি ও ১টি কলেজ রয়েছে। এ ছাড়া মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৬০০ হেক্টর।
মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়সহ ২৩টি দপ্তরে ২১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মধ্যনগর উপজেলায় স্থায়ী জনবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তৃতীয় শ্রেণির ২ জন ও চতুর্থ শ্রেণির ৭জন কর্মচারী। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী,উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা,উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা, উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ,উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা,উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অন্য উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
মধ্যনগর উপজেলার অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে থাকা উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তার মূল কর্মস্থল তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মূল কর্মস্থল হচ্ছে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরের শান্তিগঞ্জ উপজেলায়।
এ ছাড়া অন্য কর্মকর্তারা সবাই ধর্মপাশা উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত রয়েছেন। তাই মধ্যনগরের মানুষকে উপজেলা কেন্দ্রীক সকল কাজে ধর্মপাশায় যেতে হচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সাজেদা আহমেদ বলেন, মধ্যনগর উপজেলার ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের একটি কক্ষকে ইউএনওর অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য উপজেলায় কোনও কার্যালয় না থাকায় তাদের স্থায়ী কর্মস্থল ধর্মপাশা উপজেলাতেই মধ্যনগরের সকল দাপ্তরিক কাজ করে থাকেন। এ অবস্থায় নবগঠিত এই উপজেলার মানুষকে সকল প্রকার দাপ্তরিক কাজে ধর্মপাশা উপজেলা সদরে আসা–যাওয়া করতে গিয়ে অতীতের মতোই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ সরকার বলেন,মধ্যনগরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে ধর্মপাশা উপজেলায় কর্মরত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব দিয়ে কাগজে কলমে জনবল দেখানো হলেও মানুষকে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ধর্মপাশা উপজেলায় যেতে হচ্ছে। এতে নতুন উপজেলা হলেও স্থায়ী কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ না থাকায় ও ভবনজনিত সমস্যায় মানুষ এখান থেকে কোনো সেবা পাচ্ছেন না।
মধ্যনগর উপজেলার প্রশাসনিক কাজের এই স্থবিরতা দূরকরতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
মধ্যনগরের ইউএনও’র দ্বায়িত্বে থাকা ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শীতেষ চন্দ্র সরকার বলেন, মধ্যনগর উপজেলায় স্থায়ী জনবল নিয়োগ না থাকায় প্রশাসনিক কাজে কিছুটা বিঘœ ঘটছে। তবে উপজেলার প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ হলে এসব সমস্যা থাকবেনা।