মনীষী কার্ল মার্কস

তারেক চৌধুরী
কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালের ৫ মে। তাঁর বাবার নাম ছিল স্যামুয়েল হারসেল। জামার্নির রাইন প্রদেশের মোজেল নদীর তীরবর্তী ট্রিয়ার শহরে তিনি উকালতি করতেন । মার্কসের মা হেনরিয়েটা ফিলিপস ছিলেন হল্যান্ডবাসী হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি পরিবারের মেয়ে। মার্কসরা আট ভাইবোন ছিলেন । মার্কস ছিলেন মা বাবার দ্বিতীয় সন্তান । মার্কসের সবচেয়ে বড় বোনের নাম ছিল সোফিয়া । ১৯২৪ সালে মার্কেসের বয়স যখন মাত্র ছয় পিতা স্যামুয়েল তখন সপরিবারে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে নতুন নাম ও পদবী গ্রহণ করেন। স্যামুয়েল হারসেলের নতুন নাম হল হেনরিক মার্কস। বাবার নতুন পদবি গ্রহণ করে কার্ল স্যামুয়েল হয়ে যান কার্ল মার্কস। বড়বোন সোফিয়া কার্ল মার্কসকে খুব ভালবাসতেন । ছোটবেলা থেকে কার্ল মার্কস মৃদুভাষী ও পড়াশুনার খুব ভালো ছিলেন। কার্ল মার্কস একটু বড় হয়েই আকৃষ্ট হন পাশের বাড়িতে আঙ্কেল ল্যুডভিগ ভস্টফ্যালানের প্রতি । জ্ঞান জগতের প্রতি কৌতুহল লক্ষ করে ভস্টফ্যালান কার্ল মার্কসকে কাছে টেনে নেন। কার্ল মার্কস অল্প বয়সেই তাঁর কাছ থেকে হোমার, গ্যাটে, শেক্সপিয়র, দান্তে ও শেলি প্রমুখ মনীষীর সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিতি হন। ক্লাসের এক রচনা প্রতিযোগিতায় কার্ল মার্কেসের লেখা পড়ে শিক্ষকরা অবাক হন।  মার্কস লিখেছেন, যে পরিবেশে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং যে পারিপার্শ্বিক বাস্তব অবস্থার মধ্যে বড় হয় তার প্রভাব কাটিয়ে উঠে স্বাধীনভাবে কোনো পেশা বেছে নিতে পারে না। এজন্য দেখা যায় ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার হয়, উকিলের ছেলে উকিল হয়। পড়াশোনা আর মোজেল নদীর জলশব্দে কার্ল মার্কসের ষোল বছর কাটে। ট্রিয়ার শহরে হাইস্কুল পড়া শেষ করে বাবার পরামর্শে আইন পড়ার জন্য ১৮৩৫ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়ার পর ১৮৩৬ সালে চলে আসেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বার্লিনে বর্ণাঢ্য নাগরিক সমাজ কার্ল মার্কসকে আকৃষ্ট করে। কার্ল মার্কসের ইচ্ছে ছিল ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার পর বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় ঢুকবেন এবং বিপ্লবী চিন্তাধারা আরো ভালোভাবে প্রকাশের জন্য ব্রুনো বয়ারকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিপ্লবী   পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু সেই আশা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। পত্রিকার পাতায় খ্রিষ্ট ধর্মের সমালোচনা করার জন্য ব্রুনো চাকুরি হারান। সেই সঙ্গে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল মার্কসের চাকুরি হওয়ার  সম্ভাবনাও হারিয়ে যায়। কারণ প্রচলিত ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজনীতির বিরুদ্ধে কার্ল মার্কসের বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে আগেই দেশের সরকার ও শিক্ষাবিদের নজরে আসে। সুতরাং কীভাবে কর্ম জীবন শুরু করবেন তা নিয়ে ভাবতে থাকেন কার্ল মার্কস। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেন সাংবাদিকতা করবেন। ছাত্র অবস্থা থেকে সাংবাদিকতার কিছু অভিজ্ঞতা ছিল মার্কসের। এ সময় লেখালেখিতে ভালো করার জন্য রাইন গেজেট নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করার দায়িত্ব পেয়ে যান। ফলে নব্য হেগেলপন্থীরা তাদের প্রতিবাদী লেখা প্রচার করতে মার্কসের সাথে জড়িত হন। এর আগে রুগোর সম্পাদনায় ডয়েশ্চে ইয়ারমুখ নামে যে পত্রিকা বের হতো সরকার তা বন্ধ করে দিয়েছিল। রাইন গেজেটে যোগদান করে কার্ল মার্কস রাজনীতির প্রতি দৃষ্টি দেন। এক পর্যায়ে জার্মান প্রতিক্রিয়াশীল সরকার কার্ল মার্কসের পত্রিকা রাইন গেজেট বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কার্ল মার্কস তখন বলেছিলেন, সরকারের ভয়ে তিনি নীতি আদর্শ থেকে এক চুলও সরে আসতে পারবেন না। এ সময় মার্কসের সাথে এঙ্গেলস এর পরিচয় হয়। কার্ল মার্কস তাকে রাইন গেজেটে লিখতে বলেন। অবশেষ ১৮৪৩ সালের ১৩ই জানুয়ারি সরকারি পক্ষের চরম আঘাত আসে রাইন গেজেটের উপর এবং পত্রিকাটি সরকার বন্ধ করে দেয়।  রাইন গেজেট পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে জার্মান জনগণের পক্ষে একটি কণ্ঠস্বর নিরব হয়ে যায়। মার্কস বেকার হয়ে কোলন থেকে ট্রিয়ারে ফিরে যান মায়ের কাছে। এই অবসরে তিনি বান্ধবী জেনিকে বিয়ে করেন। এই জেনি ছিলেন কার্ল মার্কসের শৈশব গুরু ভস্টফ্যালানের কন্যা। তিনি ছিলেন মার্কসের চেয়ে চার বছরের বড় মার্কসের বড় বোন সোফিয়ার বান্ধবী। আগেই বলেছি ভস্টফ্যালান ছিলেন কার্ল মার্কসের শৈশব গুরু, যার কাছ থেকে কার্ল মার্কস জীবন, জগৎ, শিল্প, বিজ্ঞান ও রাজনীতির প্রথম পাঠ নেন। জেনিকে কার্ল মার্কস পছন্দ করেন জানতে পেরে মার্কসের বাবা মেয়েটিকে প্রশ্ন করেছিলেন, কার্লের ভবিষ্যৎ এর ঠিক ঠিকানা নেই। আাইন পড়তে পড়তে সাহিত্য দর্শন পড়ে আবার অংকে ও আগ্রহী, এমন ছেলেকে বিয়ে করা মানে নিশ্চিত বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানো। এর উত্তরে জেনি সেদিন মাথা নিচু করে নিজ পছন্দের প্রতি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই দৃঢ়তা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মার্কসের মতো সংগ্রামশীল মানুষকে যুগিয়ে গেছেন প্রেরণা। দার্শনিক চিন্তা ধারার দিক থেকে কার্ল মার্কসকে বিবেচনা করা হয় গত দুইশত বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হিসেবে। এঙ্গেলস বলেছেন, ডারউইন যেমন জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিবর্তন বিধি আবিষ্কার করেছেন, কার্ল মার্কস তেমনি আবিষ্কার করেন মানুষের ইতিহাসের বিবর্তনবিধি। আজকের পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় যে বুর্জোয়া সমাজের জন্ম দিয়েছে সেই উৎপাদন ব্যবস্থা কোন নিয়মে চলে তা দেখিয়ে ছিলেন কার্ল মার্কস। তিনি উদ্ধৃত্ত মূল্যতত্ত্ব আবিষ্কার করেন। শ্রমের উদ্ধৃত্ত মূল্য কুক্ষিগত করে বুর্জোয়ারা শ্রমিকশ্রেণিকে দমিয়ে রাখে। মার্কস মনে করতেন বিজ্ঞানই ইতিহাসের চালিকাশক্তি। বিজ্ঞানের শক্তিই বৈপ্লবিক। তিনি বলতেন, গুটিকতক বুর্জোয়ার আধিপত্য ভেঙ্গেঁ দিয়ে বিজ্ঞানের উপর শ্রমিকশ্রেণির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই মানুষের প্রকৃত সংগ্রাম। এই সংগ্রামে মেহনতী মানুষের বিজয় অনিবার্য। মানব সমাজকে আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য লন্ডনের একটি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আশ্রয় নিয়ে কার্ল মার্কস নিজেকে ডুবিয়ে দেন বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। এই সময় তিনি রচনা করেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোকিত গ্রন্থ দাস ক্যাপিটাল। কার্ল মার্কস সব সময় তার বিপ্লবী চিন্তাকে বাস্তবে প্রকাশ করে একটি সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীর জয়গান গেয়ে গেছেন। ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ লন্ডনে ভাড়া বাসায় কার্ল মার্কসের মৃত্যু হয়। আজ  বিল্পবী এই মনীষীর ১৯৮ তম জন্মদিন। তাই এই দিনে তাকে জানাই লাল সালাম।
লেখক: সদস্য, জাতীয় পরিষদ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন