স্টাফ রিপোর্টার
‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে’, ‘আমি না লইলাম আল্লাজির নাম রে’, ‘লোকে বলে ঘরবাড়ি ভালানা আমার’, আগুণ লাগাইয়া দিলও কুনে হাসন রাজার মনে,’ ‘গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতের ডুরি’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের লেখক হাসন রাজার ১৬৬ তম জন্মদিন আজ।
করোনাকালীন সময়ে প্রায় নয় মাস বন্ধ থাকার পর হাসন রাজার জন্মদিন উপলক্ষে আবার মিউজিয়াম খুলে দেওয়া হচ্ছে। মিউজিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেবেন এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান।
১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরের লক্ষণশ্রী পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। হাসন রাজা পরাক্রমশীল জমিদার ছিলেন। গুণী এই মরমি কবি বাংলা ভাষাভাষি মানুষ ছাড়াও অন্যদের কাছেও সমান সমাদৃত।
হাসন রাজা জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। হাসন রাজা তাঁর তৃতীয় পুত্র। মাতার নাম ছিল হুরমত বিবি। হাসনের পূর্বপুরুষের অধিবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের অয্যোধ্যায়। বংশ পরম্পরায় তাঁরা হিন্দু ছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে হাসন জমিদারীতে অভিষিক্ত হন। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, রামপাশা, লক্ষণশ্রী আর সিলেটের একাংশ নিয়ে পাঁচ লাখ বিঘার বিশাল অঞ্চলের জমিদার ছিলেন মরমী কবি হাসন রাজা। বেহিসাবী সম্পদ আর ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। জাগতিক লোভ লালসা, ক্ষমতায়ন, জবরদখল করেও তার প্রতিপত্তি বাড়ানোর কাজে প্রবৃত্ত ছিলেন হাসন রাজা। কিন্তু এক সময় তার ভেতরের ভ্রান্তি ঘুচে যায়। মধ্য পঞ্চাশে এসে তিনি ভিন্ন এক মানুষে পরিণত হয়ে যান। সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় আবিষ্কার করেন, তাঁর নিজের মধ্যেই তাঁর বাস। হাসন রাজার গানের মাঝেও অন্তর্নিহিত রয়েছে নশ্বর জীবন, ¯্রষ্টা এবং নিজের কৃতকর্মের প্রতি অপরাধবোধের কথা। কে জানতো সেই অত্যাচারী, ভোগবিলাসী জমিদারই হবেন পরবর্তীকালের সবচেয়ে প্রজাদরদি এবং দরবেশ জমিদার! নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা মনে করেন হাসন রাজার গান বিকৃত হচ্ছে, অনেক গান হারিয়ে যাচ্ছে।
তরুণ শিল্পী সামির পল্লব, দ্বীপময় চৌধুরী ও অমিত বর্মণ বললেন, আমরা নতুন প্রজন্মের যারা লোক সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছি, তাদের অনেকেই হাসন রাজার গানের কথা ও প্রকৃত সুরে থাকছি না। তাতে হাসন রাজা যে ভাবনা নিয়ে গান লিখেছিলেন তা প্রকাশ পায় না। সরকারি উদ্যোগেই হাসন রাজার গান এবং গানের সুর সংরক্ষণ করা জরুরি।
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে হাসন রাজার রচিত ২০৬ টি নিয়ে গানের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এই সংকলনটির নাম ছিল ‘হাসন উদাস’। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্’ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর হাসন রাজা মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাঁর মায়ের কবরের পাশে কবর দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর এই কবরখানা তিনি মৃত্যুর পূর্বেই নিজে প্রস্তত করেছিলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা কালচালাল কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল জানালেন, হাসন রাজার অনেক গান সংরক্ষণ করা হয়েছে। সরকারেরও হাসন রাজা একাডেমী করার উদ্যোগ আছে। ২০২২ সালে হাসনরাজার শততম মৃত্যুবার্ষিকীও ব্যাপকভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
হাসন রাজা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সামারীন দেওয়ান বললেন, করোনাকালীন সময়ে প্রায় নয় মাস বন্ধ থাকার পর হাসন রাজার জন্মদিন উপলক্ষে আবার মিউজিয়াম খুলে দেওয়া হচ্ছে। মিউজিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেবেন এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে জন্মদিন ও মিউজিয়াম খোলা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ড. মাহফুজুর রহমান। অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের সম্মানীত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।


