মরমী কবি এলাহীবক্স মুন্সী’র জন্ম ও মৃত্যু দিবস আজ

আকরাম উদ্দিন
মরমী কবি এলাহীবক্স মুন্সির জন্ম ও মৃত্যু দিবস আজ। এলাহীবক্স মুন্সী ১৮৬২ ইং সনের ২৩ মে, রবিবার জন্মগ্রহণ করেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার তেঘরিয়া গ্রামে। এই দিনে ১৯৩৭ ইং সনের ২৩ মে, রবিবার লোকান্তরিত হন সদর উপজেলার ইব্রাহীমপুর গ্রামে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর পিতা জাকির মামদ, মাতা সামানের মা।
এলাহীবক্স মুন্সীর শিক্ষা জীবন শুরু হয় সিলেটের ফুলবাড়ি মাদ্রাসা থেকে। পরে ভারত উপমহাদেশের উচ্চ বিদ্যাপীঠ আলীগড় মাদ্রাসা ও দেওবন্দ মাদ্রাসায়। উচ্চ শিক্ষায় ভাল ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়ে পাগড়ি ও সনদ পেয়ে তৎকালীন সময়ে গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি মাতৃভাষার পাশাপাশি আরবি, ফার্সি, হিন্দি, ইংরেজি ও সিলেটী নাগরি ভাষায় কথা বলতেন। তিনি বেশী কথা বলতেন ফার্সি ভাষায়।
শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন এলাহীবক্স মুন্সী। এলাহীবক্স মুন্সী ছিলেন সুশিক্ষিত ও ইসলামী চিন্তাবিদ সময়ের সাহসী নেতা। সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক কুসংস্কার দুরীকরণে ব্রতী হন তিনি। বৃটিশ শাসন আমলে প্রসবোত্তীর্ণ মায়েদের নাভী কাটতো নাপিত শ্রেণীর লোকজন। এ সময় এ কাজটাকে নি¤œ শ্রেণীভুক্ত সম্প্রদায়ের কাজ মনে করা হতো। ফলে প্রসবিত মাকে অপেক্ষা করতে হতো ৩/৪ দিন পর্যন্ত। এতে নাভীতে পচন ধরতো আর ক্ষতসহ নানা রোগের সৃষ্টি হতো। মারা যেতো অনেক মা ও শিশু। যুবতী মেয়ে সহ নারীদের হাত পায়ের নক ও চুল কেটে দিতো নাপিত সম্প্রদায়ের লোকজন।
এভাবে যুগ যুগ ধরে সমাজে চালু থাকা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ১৩৩২ বাংলার ২১ ভাদ্র আন্দোলন শুরু করেন এলাহীবক্স মুন্সী। এ আন্দোলন সমাজের বিত্তশালীরা প্রথমে মেনে নিতে পারেননি। তারা সামাজিক নিয়ম টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন বন্ধ করতে অপচেষ্টা চালান। তবুও এলাহীবক্স মুন্সী এ বাঁধা অতিক্রম করে ব্যাপক প্রচারণা চালান। এক সময় সমাজের লোকজন এলাহীবক্স মুন্সীকে দমাতে গিয়ে এক কঠিন সিদ্ধান্তে উপণীত হলেন। সমাজচ্যুত করেন এলাহীবক্স মুন্সীকে। অনেকেই সরে দাঁড়ালেন এলাহীবক্স মুন্সীর কাছ থেকে। শিশুদের পাঠদানের জীবিকাও বন্ধ হয়ে যায় এলাহীবক্স মুন্সীর। ঘরে খাবার নেই, পানি নেই, আপনজনও নেই। এহেন অবস্থায় কেটে গেল অনেক দিন। এমন যাতনা সহ্য করেছেন হাসি মূখে। তবুও প্রচারণা চালিয়ে গেলেন তিনি।
এক সময় সমাজের মানুষের মধ্যে চৈতন্যতা ফিরে আসে। দরদ হয় এলাহীবক্স মুন্সীর প্রতি। ধীরে ধীরে মানুষ আবারও ফিরে আসেন এলাহীবক্স মুন্সীর কাছে। সকলের অংশগ্রহণে এক সময় দূর করতে সক্ষম হন সমাজের কুসংষ্কার। প্রথমে দূর করলেন তৎকালীন লক্ষণশ্রী পরগনার কুসংস্কার। পরে চলে গেলেন দোয়ারা উপজেলায়। ওই উপজেলায় এলাহীবক্স মুন্সির শশুড়বাড়ি। বরাকি নামক গ্রামের মো. ফাজিল উদ্দিনের মেয়ে মোছা. আরেফিনা বানুকে বিয়ে করেছিলেন এলাহীবক্স মুন্সী। সেখানেও একই নিয়মে আন্দোলন করে কুসংস্কার দূর করেন। পরে ছুটে যান তাহিরপুর উপজেলাসহ অন্যান্য উপজেলার ও গ্রাম-গঞ্জে।
মৃত্যুর ২০ বছর পুর্বে এলাহীবক্স মুন্সী চলে আসেন সায়িত স্থান ইব্রাহীমপুর গ্রামে। সেখানেও শিশুদের পাঠদানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রচনা করেন অসংখ্য আধ্যাত্মিক গান। ও মন এ নি:শ্বাসের নাইরে বিশ্বাস/মোরেনি তরাইয়া লইবায় গো আল্লা তোর নাম পাক বারি/ডুবিল ডুবিল ভাংগা তরি গো, ডুবিল ডুবিল ভাংগা তরি/পাইলাম না পাইলাম না বন্ধু তোমার দরশন/সদায় জ্বলে হিয়া, পন্থের দিগে রইলু চাইয়া বন্ধুয়ার লাগিয়া/কুল্লুনফছিন জায়েকাতুল মউত আল্লায় বলে কুরানের মাঝে/মনা দিন গইয়া যায়, দরদ ও সালাম বেজি নবী মোস্তফায় রে/হায়রে আমার যতনের পাখি, সুয়ারে পিঞ্জিরায় আয় একবার দেখি/হায়রে সোনার ময়না, হায় রে ময়না যাইবায় রে উড়িয়া/না জানি কি হইব রে মনা, ও মনা হাসরেরও দিন/সঙ্গি যোগাড় কর রে মন, সঙ্গি যোগাড় কর, ডাক দিলে চলিয়া যাইবায় ছাড়িয়া বাড়ি ঘর/হায় রে আমার সোয়া চান পাখি, আমি তরে ডাকি মন রে, ওরে মনা ঘুমাইছ নাকি/হায়রে রুমান ফিরিস্তায় তর্জন গর্জন করি পৌঁছিব বন্দায়/আমার পাগল মনার মন চেতন হইলায় না/আল্লা বুঝিতে না পারি/ও ভাই কি হইব না জানি/সমন হইল জারি রে পাগেলা মন/বেসরা ফকিরের কাছে যাইও না/ভুলিও নারে আরে বন্দা এ দুনিয়া মিছা ধান্ধা/খাক গোরে মিশি যাবে, এ চন্দ্র বদন রে/মিছা সঙ্গির সঙ্গ ছাড়রে মন বাউলা/ও মন ভুলিয়ে যাবে এ সংসার, একদিন হবে ঘোর অন্ধকার/ও আল্লা কেমনে হইমু গো পুল পার/ভবের খেলা শেষ হইব, ইসরাফিলের ফুঁকে রে ইত্যাদি।
এসব গান রেডিও টেলিভিশনে গেয়েছেন, উজীর মিয়া, উস্তাদ এমরান আলী, শাহ আব্দুল লতিফ, আপ্তাব মিয়া, সুবাস উদ্দিন, আকমল বখত বাবু, শাহীন বখত, বাউল তছকির আলী, রশিদ মিয়াসহ অনেকে।
লেখক : যুগ্মবার্তা সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এবং প্রতিনিধি চ্যানেলএস ইউকে, সুনামগঞ্জ।