বিশেষ প্রতিনিধি
এক সময় ছেলেটি ছিল মলমখোর, যন্ত্রণা সইতে না পেরে নেশাখোর ছেলেটিকে পুলিশের হাতে দিয়েছিলেন মা। কিন্তু সন্তানের কষ্টের কথা ভেবে মা-ই ছাড়িয়ে আনলেন মলমখোর ছেলেকে। মায়ের আকাঙ্খা ছিল ছেলেটি তাঁর সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, উপার্জনও করবে। মায়ের সেই আকাঙ্খা পূর্ণ হয়েছে। মলমখোর ছেলে এখন সুনামগঞ্জ শহরের বিখ্যাত ঘুড়ি’র কারিগর। অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলো’র পথের যাত্রী সে। শহরের ষোলঘরের বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি রওশন আলী ও গৃহিনী জহুরা আক্তারের ১৯ বছর বয়সি এই সন্তানের নাম আতিকুল হক জুনেদ।
তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেই পাঠ চুকিয়ে মহল্লার টোকাইদের সঙ্গে দলবেঁধে এখানে-ওখানে শহরের নানাস্থানে ঘুরে বিক্রি করার মতো যা কুড়িয়ে পেতো, তাই বিক্রি করে মলম সেবন করতো জুনেদ। এক পর্যায়ে বাসার আসবাবপত্র চুরি করে বিক্রি করে মলম কিনতো সে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বছর দেড়েক আগে জুনেদকে পুলিশের কাছে তুলে দেন মা জহুরা। কিন্তু সন্তানের মমতা বলে কথা, কয়েকদিন পরই কারাগারে দেখতে যান মা। কারাগারে সন্তানের রুগ্ন চেহারা মায়ের কোমল হৃদয়কে স্পর্শ করে। মা-ই আবার আবেদন করে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সিলেটে বোনের বাড়িতে পাঠান । ওখানে এক দোকানে বছর খানেক কাজ করেছে জুনেদ। বাড়িতে এসে শখের বসে প্রথম দুটি ঘুড়ি তৈরি করে সে। এই ঘুড়ি উড়ানোর পর মহল্লার দুই তরুণ ১০ টাকা করে ২০ টাকা দিয়ে তাঁর ঘুড়ি কিনে নেয়। এই ২০ টাকা দিয়ে কাগজ কিনে পরদিন ১০ টি ঘুড়ি তৈরি করে ১০০ টাকায় বিক্রি করে সে। এভাবে প্রতিদিন-ই ঘুড়ি তৈরি বাড়ে এবং বিক্রিও বাড়তে থাকে ঘুড়ি বিক্রেতা জুনেদের। এখন নানা জাতের ঘুড়ি তৈরি করে বিক্রি করছে সে। এক রংয়ের ছোট ঘুড়ি ১০ টাকা, দুই রংয়ের ২০ টাকা, মধ্যম সাইজের ৫০ টাকা, এভাবে ২০০ থেকে ১০০০ টাকার ঘুড়িও বিক্রি করছে সে। তার তৈরি সাড়ে ৭ বর্গফুটের ঘুড়িও কিনছে আগ্রহী তরুণরা। শরৎকাল থেকে শীতকাল ঘুড়ি উড়ানোর মৌসুম হলেও এই বর্ষায়ও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে জুনেদের ঘুড়ি। তবে বেশি বৃষ্টি হলে ঘুড়ি বিক্রয় কমে যায়। জুনেদের ঘুড়ি’র ব্যবসা দেখে একই মহল্লার অন্য দুই কিশোর রাহুল এবং হৃদয়ও তার সঙ্গে এসে ঘুড়ি তৈরি করছে এবং তারাও কিছু টাকা উপার্জন করছে। এলাকার তরুণরা বললো- জুনেদের বানানো ঘুড়ি নেবার জন্য শুধু শহরের বিভিন্ন মহল্লার নয়, গ্রামের তরুণরাও আসছে।
ঘুড়ির কারিগর জুনেদ জানালো একসময় মলম সেবন যেমন তার নেশা ছিল, এখন ঘুড়ি বানানো ঠিক তেমনই নেশায় পরিণত হয়েছে। সে বললো,‘অখন হকলে (সকলে) আমারে মায়া করইন (করেন), ৫০ হাজার টেকা (টাকা) জমাইছি (সঞ্চয়) আমি’।
জুনেদের মা জহুরা খাতুন সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে বললেন, ‘যন্ত্রণায় পেটের সন্তানকে জেলে দিয়েছিলাম, এখন সেই ছেলেকে নিয়েই স্বপ্ন দেখছি, দোয়া করবেন, সে তার জমানো টাকা দিয়ে দোকান দিতে চাচ্ছে’। তিনি বললেন,‘এক সময় বাসার সবাই তারে মারতা, তার বাবা মারলে, সকলে মিইল্লাও (মিলেও) ফিরাইতাম পারতাম না, (ফেরানো যেত না) আল্লায় আমার ডাক কবুল করছেন, অখন (এখন) বিভিন্ন জায়গা থাকি (থেকে) আইয়া তার বানানো ঘুড্ডি (ঘুড়ি) কিইন্না নেয় মানুষে’।


