মাইকিং করেও গোদামে নেওয়া যাচ্ছে না কৃষকদের

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধান কেনা বেছার জন্য নদী বা সড়ক যেখানেই সহজতর যোগাযোগ, সেখানেই ধানের আড়ৎ গড়ে ওঠেছে। ছোট ছোট এসব মোকামমুখী জেলার লাখো কৃষক। ধানের হাটে রীতিমত উৎসবের আমেজ। সরকার ধানের যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তাতে ‘আগে আসলে আগে দিতে পারবেন’ এমন মাইকিং করেও কৃষকদের গোদামমুখী করা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন।
এতো বিপুল পরিমানের ধানের মধ্যে সরকার এই জেলা থেকে ২৯ হাজার ৬৫৯ টন ধান এবং ১৫ হাজার ৪১৫ টন সিদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রায় একমাস হলো জেলার ১১ উপজেলার খাদ্য গোদামে ধান কেনা শুরু হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারের ধান কেনা হয়েছে ১৩০০ টন। চাল ৪৬৬ টন। কৃষকগণ বলেছেন, সরকারিভাবে ধানের যে মূল্য নির্ধারণ হয়েছে এবং ক্রয় কেন্দ্রে যেভাবে নানামুখী হয়রানি তাতে ক্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে আড়ৎমুখীই হচ্ছেন বেশি কৃষক।
শাল্লার আনন্দপুর নোয়াগাঁওয়ের বড় কৃষক মাখন লাল দাস বললেন, ধান ক্রয়ের জন্য প্রথম লটারীর আয়োজন হয়েছিল। লটারীতে অংশ নিতে যায় নি কৃষক। পরে মাইকিং করে বলা হয়েছে ‘আগে আসলে আগে ধান দিতে পারবেন, দ্রুত আপনার ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে এসে ন্যায্যমূল্য গ্রহণ করুন।’ তাতেও কৃষকরা যাচ্চেন না খাদ্য গোদামে। এই কৃষক বললেন, সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের উপর আস্থা বাড়ানোর জন্য আরও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
একই গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুশ শহীদ বললেন, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে গেলে লেবার খরচ বেশি, পিয়ন-কেরানীকে খুশি করতে হয়, ধান শুকনা কম জানিয়ে আরও শুকিয়ে দিতে হয়। এসব ঝামেলার জন্য কৃষকরা সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে না।
হাওরাঞ্চলের ধানের বড় আড়ৎ মধ্যনগরের আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বললেন, হাওরে এখনো নৌ-যোগাযোগ শুরু হয় নি। এরপরও প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার মণ ধানের কেনা বেছা চলছে মধ্যনগর মোকামে। খাদ্য গোদামের কাছ দিয়ে যাচ্ছেন না কৃষকরা। ওখানে গেলে সাড়ে ১৪ শতাংশ আদ্রতা লাগবে, আরও কত কিছু। ধান কৃষকরা শুকিয়ে দিতে চাইলে কমে যাবে মণে দুই থেকে আড়াই কেজি। লেবার খরচসহ নানাজনকে খুশি করার পর আড়তের চেয়ে দাম বেশি পাওয়া যাবে না। আড়তে চিকন ধান বর্তমানে ৯৭৫ থেকে ৯৮০ টাকা এবং মোটা ধান ৮৭০ থেকে ৮৭৫ টাকা মণে বিক্রয় হচ্ছে। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধানের মণ নির্ধারণ হয়েছে ১০৮০ টাকা। কৃষকরা মনে করছেন এই দামে ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে দেবার চাইতে আড়তে দেওয়াই ভাল। এবার ধানের মোকামও বেড়েছে। যেখানেই যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে ধর্মপাশার সুনই, গাছতলা বাজার, সাচনা, জামালগঞ্জ, দিরাই, বিশ^ম্ভরপুর, জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ এসব স্থানে এবার ভালো ধান কেনা বেছা হচ্ছে।
জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বললেন, আমরা আগে থেকে বলে আসছি, যে প্রক্রিয়ায় সরকার ধান ক্রয় করছেন, সেটি ভুল প্রক্রিয়া, ধান কিনতে হবে বৈশাখের শুরু থেকে, কৃষকের বাড়িতেই কেনা ধান থাকবে, কৃষকের সঙ্গে চুক্তি হবে নৌকা চললে শুকনো ধান গুদামে দেবে এবং ধানের মণ নির্ধারণ করতে হবে ১২০০ টাকা। সরকার সেটি করছে না। সরকারের বর্তমান নীতিমালায় এবারও হাওরাঞ্চলে সরকার ধান কিনতে পারবে না। তাতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরকার মূল্য বাড়ালে ধানের মূল্য আড়ৎদাররা আরও বাড়াতে বাধ্য হতো।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য কর্মকর্তা নকিব সাদ সাইফুল ইসলাম বললেন, ধান কেনার জন্য আমরা প্রত্যেক উপজেলায় মাইকিং করে জানিয়ে দিয়েছি ‘আগে আসলে আগে ধান দিতে পারবেন’ আশা করছি হাওরে পানি বাড়লেই আমরা ধান ক্রয় করতে পারবো। খাদ্য গোদামে লেবাররা কিছু পয়সা খড়ি দাবি করার কথা তারাও শুনেছেন, জানিয়ে বললেন, এই বছর এসব বিষয় কঠোরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। কোন কৃষককেই গোদামে এসে ধান দিতে কোন হয়রানির শিকার হতে হবে না। তিনি জানালেন, সরকার যেহেতু ধান গোদামে বেশি দিন রেখে চাল করে, আদ্রতা দেখে ধান কেনা ছাড়া কোন উপায় নেই। ভালো শুকনো না হলে এক বছর ধান গোদামে রাখলে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।