বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিৎ রায়
তিনদফা বন্যায় সুনামগঞ্জের সড়ক, মৎস্য খামার, ফসলি জমি, গৃহপালিত পশু ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার। এখনও বন্যার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো জেলা। ব্যক্তি মালাকানাধীন বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সড়কের ক্ষতি হিসাবে আনলে ক্ষয়ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এবারের তিন দফা বন্যায় মৎস্য চাষী ও খামারীদের একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে। বাড়িঘর ভেঙে হাজার হাজার অস্বচ্ছল পরিবারকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জেলা শহরের সাথে সংযোজিত জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক ছাড়াও গ্রামীণ অধিকাংশ সড়ক ভেঙে যোগাযোগের নাজুক অবস্থা । সংশ্লিষ্ট দপ্তর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাঠিয়েছেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বেশিরভাগ জনপদে বন্যায় বিপর্যস্ত বাড়িঘর ঠিক করতে হিমশিম খাচ্ছেন কাজকর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া বানভাসি লাখো পরিবার। সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে পুকুরে মাছ চাষ করা মানুষজন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সামর্থ নেই। তারা সরকারি ঋণ সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছে। সুদমুক্ত ঋণ পেলে হয়তো অনেকে আবার খামার ও মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে। বন্যা পরবর্তী দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে হাওরপারের মানুষ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, তিন দফা বন্যায় জেলার ১১ উপজেলায় ৮ হাজার ৬৬৫ টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৮৪ মাছের খামারী। এসব খামার থেকে দুই হাজার নয়শ’ ৮৪ টন মাছ এবং ৪ লাখ ৬৫ হাজার পোনা ভেসে গেছে। অবকাঠামো অর্থাৎ পুকুরের পাড়ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫২ কোটি ৯২ লাখ ৮৮ হাজার টাকার।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান খান জানান, তিন দফা বন্যায় দুটি গরু, ৩৫০ হাঁস, ৪০০ মুরগি মারা গেছে। গোখাদ্যসহ খামারীদের হাঁস-মুরগির খাদ্য নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বললেন, জেলার ৩৮১ প্রথমিক বিদ্যালয় আংশিক এবং শাল্লা ও জগন্নাথপুর উপজেলায় দুটি করে চারটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অংকে সাড়ে তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হরজিৎ সরকার জানালেন, বন্যায় ৯০০ কিলোমিটার কাঁচা পাকা সড়ক ভেঙে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন, ৩০ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন জানান, ৮২৬ হেক্টর আউশ এবং ৫৯ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৫৬ হেক্টর সবজীক্ষেত ডুবে ক্ষতি হয়েছে ৯ কোটি টাকার।
জেলার জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের কলেজপড়–য়া ছাত্র তুফাজ্জল হোসেন রতন জানিয়েছেন, করোনার অবসরকে কাজে লাগাতে তারা ৭ জন পুকুর ও হাওরে মাছ চাষে আগ্রহী হয়। পুকুরসহ হাওরে পানি থাকাকালীন সময়টায় নেট ও বাঁশ চাটাইয়ের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে তারা মাছ চাষ শুরু করে। কিন্তু উপর্যপুরী বন্যায় তাদের সব স্বপ্ন তলিয়ে গেছে পানিতে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট (পূর্বহাঁটি) গ্রামের হাঁস খামারী মো. দিলসাদ মিয়া বলেন, ‘আমার খামারে ৬শ’ হাঁস আছিল। বন্যার সময় খামারে কোমর পর্যন্ত পানি হইছে। পরে বাধ্য হইয়া দেড়শ হাঁস বাজারে হাঁইট্যা বিক্রি করছি আর বাকিগুলো মইরা গেছে। বন্যায় প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষ্যাতি হইছে আমার। এখন যদি সরকারি কোনো ঋণ না পাই, তাইলে পরিবার চালাইতে মারাত্বক সমস্যা হইবো।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শরিফুল ইসলাম বললেন, সড়ক অবকাঠামো, মৎস্য, পশু সম্পদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।


