মানুষ মানুষের জন্যে…

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
গত জুনের এমন দিনে প্লাবিত হয়েছিলো পুরো সুনামগঞ্জ জেলা। শান্তিগঞ্জ উপজেলাও ডুবে ছিলো বন্যার পানির নিচে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা এমনকি সাধারণ মানুষের ৯০ শতাংশের উপরের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছিলো। সব মানুষকে গণহারে ছাড়তে হয়েছিলো বসতঘর। আশ্রয় নিতে হয়েছিলো অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে, স্কুল-কলেজ, মসজিদ মাদ্রাসায় ও আত্মীয়-অনাত্মীয়ের বহুতল ভবনে এমনকি তুলনামূলক উঁচু বাড়িতে। সে সময় বুক পেতে চেনা অথবা অচেনা মানুষকে বুকের উপর আশ্রয় দিয়ে যারা উপকার করেছিলেন তাদের প্রতি আজও কৃতজ্ঞ উপকারভোগী মানুষগুলো। তারা বলেন, নিদারুণ কষ্টের দিনে নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা না করে যারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, দিন যাপনের সকল সুযোগ সুবিধা দিয়েছিলেন তাদের উপকারের কথা কি কখনো ভুলা যায়?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের বন্যায় আজকের এই দিনে (১৮ জুন, শনিবার) বানভাসিরা আশ্রয় দেওয়ার জন্য খোলে দেওয়া হয়েছিলো পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কান্দিগাঁও কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের প্রধান ফটক। এছাড়াও কান্দিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি হাজি আবদুল হেকিমের বাজারে থাকা পুরো তিনতলা মার্কেট, তার দু’তলা বসতঘরের সবক’টি ইউনিট, নিজের স-মিল সবকিছুই ছিলো মানুষে ঠাসা। অর্থাৎ বানভাসি মানুষেরা। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারের দিক থেকে ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের তিনতলা বাড়িই কান্দিগাঁও গ্রামের প্রথম বাড়ি। তার পুরো বাড়ি, গ্রামের মাঝে তার অপর একটি দু’তলা বাড়ি এগুলোও ছিলো লোকে লোকারণ্য। মোহাম্মদ হাসান জকির লস্কর আলী সুপার মার্কেটেও ছিলো একই অবস্থা। প্রতিটি দোকানঘরে ছিলো একাধিক বানবাসি অপরিচিত পরিবার। মার্কেটের ফ্লোর তো বটেই নিজের থাকার ঘরও শেয়ার করেছেন অনেকের সাথে। কেউই পরিচিত নন, অথচ পরম পরিচিতের মতো সকলেই মাথা গোঁজেছিলের এক কাতারে। গ্রামের মাঝখানে ইতালি প্রবাসী তাজুদ আলীর তিনতলা বাড়ি; এমনকি তাঁর ধান রাখার গোদামঘর সবখানে ছিলো বানবাসি মানুষের থাকার শেষ আশ্রয়স্থল। গ্রামের সব শেষ বাড়িটির ডাকনাম ইতালিবাড়ি। ইতালি প্রবাসী, ৯০ দশকের তুখোড় আওয়ামী রাজনীতিক তারা মিয়ার দু’তলা বাড়ি। সবকিছুই ছিলো বন্যার্তদের দখলে। থেকেছেন নিজের বাড়ির মতো করে। অতি আন্তরিকতার সাথে মানুষকে যেনো বুকের উপরেই স্থান দিয়েছিলেন গ্রামের মানবিক এ মানুষগুলো। শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বন্যাকালীন মহাবিপর্যয়ের সময় বুকের উপর জায়গা দেওয়া গ্রামগুলোর মধ্যে এটা শুধু একটা গ্রামের গল্প। উপজেলার সকল গ্রামের চেহারা এই গল্পের মতোই ছিল। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের অপেক্ষাকৃত উঁচু গ্রামের মানবিক কিছু মানুষ নিজেদের অসুবিধার কথা চিন্তা না করে সবকিছু দিয়ে মানবিক সহযোগিতা করেছেন বানবাসি মানুষদের। তাঁদের এ মানবিক আচরণের কথা বন্যার এক বছর পরও কৃতজ্ঞ চিত্তে মনে করেন উপকারভোগী মানুষজন ও এলাকাবাসী।
উপজেলার মানুষজন কৃতজ্ঞ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের প্রতিও। কারণ শান্তিগঞ্জে মন্ত্রীর হিজলবাড়িটিও ছিলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। চারদিকে যখন শুধু পানি আর পানি। তখন হিজলবাড়িতে লোকে লোকারণ্য ৷ কয়েক শ’ মানুষের নিরাপদ আশ্রয় ছিলো হিজলবাড়ি । ডুংরিয়া গ্রামে মন্ত্রীর একান্ত রাজনৈতিক সচিব হাসনাত হোসেনের বাড়ি, মন্ত্রীর এপিএস জুয়েল আহমদের বাড়িতেও মানুষের আশ্রয় ছিলো। আলী হোসেন, মনিরুজ্জামান সুজন ও মঈনুল ইসলামের বাড়িতেও দুঃসময়ের এ দিনগুলো কাটিয়েছেন অসহায় মানুষজন। পরম যতেœ তারাও আশ্রয় দিয়েছেন সবাইকে। জামলাবাজ গ্রামে ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল বাসিত সুজনের বাড়ি ও আছির মোহাম্মদের বাড়িতে অনেক মানুষের আশ্রয় ছিলো। এছাড়াও এ গ্রামের উত্তর হাটিতে আশিকুর রহমান আশিকের বাড়িতে ১৫ থেকে ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। একই গ্রামের নুরুজ্জামানে মার্কেটেও প্রায় ১৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। নোয়াখালী বাজারে ইতালী প্রবাসী রায়হান উদ্দিনের মার্কেটে আশ্রিত ছিলেন শতাধিক মানুষ। আস্তমার আতাউর রহমান, শফিক আলী, ফজর আলী, হাসনাবাজের জহর মেম্বার, লিলু মিয়ার বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন অনেক বন্যার্ত মানুষ। পূর্ব বীরগাঁও-এ অসংখ্য মানুষকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন কিছু মানবিক মানুষ। বীরগাঁও গ্রামের ইউপি সদস্য জোবায়ের আহমদের পাড়া তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় এপাড়া বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্রের মতোই ছিল। নিজেদের সব সুবিধা ত্যাগ করে মানুষকে সহযোগিতা করেছেন পাড়াবাসী। একই গ্রামের টুকু আহমদের বাড়িতে ছিলেন ৭/৮টি পরিবার। হাঁসকুড়ির মৌলা মিয়ার বাড়ি ও আজহারুল ইসলামের বাড়ি ছিলো অনেক মানুষের আশ্রয়স্থল। ইউনিয়নের ধরমপুরের হাজি শফিক মিয়ার বাড়ি, বীরগাঁও দক্ষিণ হাটির আবুল হাসানের বাড়ি, চৌধুরী বাড়িতেও বেশ কিছু মানুষ আশ্রিত ছিলেন। এছাড়াও খালপাড় গ্রামের আরজুমান মিয়ার বাড়িতে ১৫/২০টি পরিবার থেকেছিলেন। সলফ, নোয়াগাঁওসহ আরো অনেকেই নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন বন্যার্তদের।
পাথারিয়া ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামের বড়বাড়ির ব্যবসায়ী তফজ্জুল হোসেনের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন ৭-৮টি পরিবার। এছাড়াও ইউনিয়নের যেসব গ্রামের বাড়িগুলোতে পানি উঠেনি সেসব গ্রামের প্রতিটি মানুষ নিজেদের বুকের উপর স্থান দিয়েছেন বন্যার্ত মানুষকে। একইভাবে শিমুলবাঁক, পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নেও মানুষকে আশ্রয় দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন মানুষ। দরগাপাশা ইউনিয়নের এমরান হোসেন চৌধুরীও বিপর্যয়ের সময় বাড়িতে ২০টি বন্যার্ত পরিবারকে স্থান দিয়েছেন। দরগাপাশা গ্রামের পশ্চিম প্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্রান্তে ফখরুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়িতে ছিলেন ২৫/৩০টি জলে ভাসা পরিবার। আক্তাপাড়া গ্রামের আবদুর রশিদ তালুকদারের বাড়িতে গাদাগাদি করে থেকেছেন ১০/১৫ টি পরিবার। ইংল্যান্ড প্রবাসী রূপ মিয়ার বাড়িতে প্রায় ১৫টি পরিবার, হাজী আলতাবুর রহমানের তত্ত¡াবধানে লন্ডন প্রবাসী দিলোয়ার হোসেনের বাড়িতে প্রায় ২০টি পরিবার থেকেছেন। এ ছাড়াও রসুলপুরের বাবুল মিয়ার বাড়িতে ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক মিয়ার বাড়িতে উঠেছিলেন ১৫/২০টি পরিবার। পানির তীব্রতা যখন বাড়ছিলো তখন তিনি নিজে গিয়ে ডেকে ডেকে তাঁর বাড়িতে তুলেছিলেন মানুষদের। আশ্রয় দিয়েছেন। করেছেন সহযোগিতাও। চিকারকান্দি গ্রামের আবুল কাশেম নাঈম, রুমান জামান, বেতকোনা গ্রামের আবদুল হান্নান, চুরখাইয়ের মাহমুদ আলীরা মিলে পৃথকভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন শতাধিক পরিবারকে। সময়টা যখন মানবিকতার তখন মানুষের পাশে মানুষই তো দাঁড়াবে। তাই হয়তো দামোধরতপী টাওয়ার মার্কেটে সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল হক আশ্রয় দিয়েছিলেন দেড় শতাধিক মানুষকে। এছাড়াও দামোধরতপী এলাকার আনুর মিয়ার ভবনে ২৫/৩০ জন, সারোযার আহমদের ভবনে ২০ জন, ফয়জুল হকের বাড়িতে ২০ জন, আকবর আলী ২৫ জন মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বাদ যাননি মামদপুর গ্রামের মানবিক মানুষেরাও। এ গ্রামের ইরান উদ্দিনের দু’তলা বাড়ির নীচ তলা পানিতে তলিয়ে গেলেও দু’তলায় আশ্রিত ছিলেন অর্ধশতাধিক মানুষ। একই গ্রামের শিবলু উদ্দিনের বাড়িতে ২৫ জনের মতো বন্যার্ত মানুষ উঠেছিলেন।
বন্যার সময়ের উপকারের কথা আজও স্মরণ করেন লাইব্রেরি ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল ফকির। তিনি বলেন, বন্যার দিনের কথা মনে হলে শরীরে কাঁপন ধরে যায়। গা ঝিঁম ধরে আসে। এমন দিনে বাড়িতে পানি উঠার পর আমি আমার এক প্রতিবেশীর দু’তলায় পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারা নিজেদের কষ্টের কথা চিন্তা না করে আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন উপকার করেছিলেন। শুধু আমি না, আরও শত শত মানুষ বানবাসিকে আশ্রয় দিতে দেখেছি। সেসময় যদি মানুষ মানুষের পাশে না দাঁড়াতো তাহলে কী যে উপায় হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা উপকার করেছিলেন তাদেরকে আজও কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি।
কানন দাস নামের একজন বলেন, বন্যার সময় ঘর ডুবে যাওয়ার পর আমরা পরিবারসহ আমার এক ফুফুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারা আমাদের খুব সাহায্য করেছিলেন। আমরা আজও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
অজুদ মিয়া নামের এক রিকশা চালক বলেন, আমরা পাগলা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। হাজারো মানুষ ছিলেন স্কুলে। খাদ্য দিয়ে অনেকে সাহায্য করেছিলেন। তাদের কথা আজও মনে পড়ে।