সনজীব রয়
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, বীর বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, নয় মাস যুদ্ধ করে তারা ছিনিয়ে আনে আমাদের মানচিত্র। ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয়ের পতাকা উড়ানোর মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের যাত্রা। কিন্তু স্বাধীনতা কি স্বাধীন? প্রত্যাশা ছিল নিজস্ব সংস্কৃতির সাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক সাম্য, আইনের শাসন, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা বোধ, সামাজিক ন্যায় বিচার, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আমাদের চলমান জীবনধারায় এসবের তেমন প্র্যাকটিস না থাকলেও, কেলেন্ডারের এই মাসগুলিতে আমরা নড়ে চড়ে বসি, আমাদের চেতনার পালে হাওয়া লাগে।
ফেইস বুকে প্রোফাইল ছবিতে পরিবর্তন আসে, মহল্লায় মহল্লায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, মাইকে নেতাদের উচ্চকিত ভাষণ আর বিজয় দিবসে কাংগালী ভোজে খিচুড়ি। আওয়ামী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ। ফান্ডের অবস্থা ভাল,তাই এবার ভূনা খিচূড়ি থাকতে পারে। ১৬ তারিখের পরে সমস্ত চেতনা বালিশে চাপা দিয়ে আবার আমরা শুয়ে পড়ব। শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখব। জাতির পিতা আমাদের জন্যে একটা স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন, সেটা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। আশা ভঙ্গের অভিশাপ নিয়ে জেগে উঠলেই দেখতে পাই, স্বপ্নের চাড়া গাছটিকে কেউ বা কারা বনসাই করে রেখেছে। আর বাড়তে দেওয়া যাবে না।
দেশ এগিয়ে চলছে, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলামের উপর ভর করে। ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে মধ্য রাতে টিভি উত্তপ্ত হয়। মনের সংবিধানে যে অবিশ্বাসের কলমের আঁচর, তাকে কি আর সংশোধন করা সম্ভব? তা সময় বলে দেবে।
গৌরবের ৪৫ বৎসরের প্রাপ্তিও কম নয়। নারীর ক্ষমতায়ন, দুই দুই জন নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী স্পিকার, নারী সাংসদ, নারী
মন্ত্রী সবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি, নারীর সম্ভ্রমের নিরাপত্তা রাষ্ট্র দিতে পারছে না। তনু থেকে খাদিজা, রিশা থেকে পূজা, খবরে না আসা আরও অনেক ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের চিত্র তাই প্রমাণ দেয়।
প্রকাশ্যে যখন খাদিজাদের কোপানো হয়, পূজাদের ধর্ষণ করা হয়, তখন আমাদের সেই চেতনাই নির্লিপ্ত থাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্লগারদের রক্তে রাঙানো।
অর্থনৈতিক মুক্তি আমরা পেয়ে গেছি, সরকারী হিসাব তাই বলে। টকশোর টেবিলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ বনে বসে আছি। ঘটনার পর ঘটনা এসে আমাদের চোখের উপর পর্দা টেনে দেয়। আসমানের চান, সাকিবুল হাসানের, সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি হাঁকানোর উত্তেজনায় আমরা ভুলে গেছি, শেয়ার বাজার কিংবা সোনালি বাংকের টাকা লুট, রিজার্ভ চুরি। তাতে কি? দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদের নববর্ষের মঙল শোভাযাত্রা স্থান করে নিয়েছে, আমাদের গর্ব হয়।
অথচ মঙল শোভাযাত্রায় নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনার পান্ডাদের আজও সাজা হয় নি, এতে আমাদের লজ্জা হয় না। অবশ্য ইহা আন্তর্জাতিক নয় তাই গায়ে না মাখলেও চলে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে বলেই, পাকি হায়েনার দোসররা সমাজে রাজ করে যাচ্ছে দাপটের সাথে।
আইনের শাসন, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এগুলো টিভি টক শোর ভিতরে। রাজপথে আছে পুলিশ। প্রবীর শিকদারকে বেড়ি পড়ানো, রাজপথে শিক্ষককে পেটানো, তারা কতটা এফিশিয়েন্ট হয়েছে এ তারিই প্রমাণ। এত ভাবার সময় নেই, দেশ এগিয়ে চলছে। আমরা এখন সোচ্চার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে, ভাল কথা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিৎ, প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ কিন্তু শত শত রসরাজরা যে দেশ ত্যাগ করছে, এই জায়গায় চেতনা কাজ করে না।
ডিজিটাল চেতনা? তাই রঙ দেখে কাজ করে। ১৬ ডিসেম্বরে শিখা চিরন্তনে দীপ্ত শপথ, লাখ মানুষের হাত, ১৭ তারিখে হয়ে যাবে, মুসলমানের হাত, হিন্দুর হাত কিংবা সাঁওতালি হাত। সেই হাত দিয়ে হাতা হাতি করে চলেছি আমরা প্রতিনিয়ত। আজকের চেতনা আর ৭১ এর চেতনায় বিস্তর ফারাক।৭১ এর চেতনা শুয়ে আছে টুঙ্গিপাড়ায়।
বঙ্গবন্ধু তুমি শুয়ে আছ, অন্তত তোমাকে দেখতে হচ্ছে না, ইতিহাস থেকে জেনেছি , যে ঘাস আর মাটি মানুষ নিয়ে তোমার রাজনীতি ছিল, এখন দেখছি, সেই ঘাস আর মাটি মাড়িয়ে, অনেক সুবিধাভোগী চাপাবাজ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এখনো সবার জন্যে নিশ্চিত করা যায় নি, তোমার সুযোগ্যা কন্যা আগাগোড়া দেশপ্রেমিক কিন্তু দশ চক্রে আবদ্ধ। লড়ে যাচ্ছেন অভিমন্যুর মত। তোমার বপন করা স্বপ্নের বীজ অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে , সায়েদুর রহমান রা মালাউন বলে গালি দেয়। আমরা একে ভাংচুর করি, আগুন দেই, ধর্ষণ করি। ৭৫ এর কুলাংগার রা তোমাকে একবার খুন করেছিল আর আর আমরা তোমাকে বার বার খুন করছি। তবু হাল ছাড়ি নি পিতা। মুখো মুখি দাঁড়াবার এই তো সময়, ঘুরে দাঁড়াবার এই তো সময়।
লেখক: সনজীব রয়। টরোন্ট, কানাডা।
- রোহিঙ্গাদের সমর্থনে রাস্তায় নামলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী
- বাল্য বিয়ে দূর করতে দারিদ্রতা হ্রাস ও শিক্ষার বিস্তৃতি বিষয়ে অধিক মনোযোগ প্রয়োজন


