মুক্তিদাতার জন্মদিন

প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস
যাঁকে আমরা পরম মানব বলে স্বীকার করি আজ সেই প্রভু যীশু খ্রীষ্টের শুভ জন্মদিন। ইংরেজীতে Merry Christmas, Happy Xmas এবং বাংলাতে আমরা ‘শুভ বড়দিন’ বলি। জানা যায় ভারতের পশ্চিম বঙ্গের ভোলানাথ সরকার Christmas এর প্রথম বাংলাকরণ করেন ‘খ্রীষ্ট অষ্টমি’। পরে কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত Christmas কে বড়দিন হিসাবে নামকরন করেন এবং সেই থেকে আমাদের কাছে Christmas শুভ বড়দিন হিসাবে সুপরিচিত।
খ্রীষ্টের জন্ম এখন আর ঐতিহাসিক পটভূমিতে লিপিবদ্ধ নয়, যীশুর জন্ম পরিপূর্ণ অর্থে আধ্যাত্মিক। ঈশ্বরের পুত্র যখন আমাদের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেন, প্রতি মুহূর্তে যখন আমরা তাঁর সঙ্গে থাকতে সচেষ্ট হই, তাঁর ভালবাসা অকাতরে অন্যকে বিলিয়ে দেই, প্রকৃতপক্ষে তখনই খ্রীষ্ট আমাদের হৃদয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাইতো কবিগুরু লিখেছেন “আজ তাঁর জন্মদিন এ কথা বলব কি পঞ্জিকার তিথি মিলিয়ে? কালগণনায়? যে দিন সত্যের নামে ত্যাগ স্বীকার করেছি, যেদিন অকৃত্রিম প্রেমে মানুষকে ভাই বলতে পেরেছি, সেই দিনই পিতার পুত্র আমাদের জীবনে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই দিনই বড়দিন-তা যে তারিখেই আসুক।”
প্রথম বড়দিন, সেদিন কত বড় বা ছোট ছিল জানি না, কি বার ছিল তাও জানি না। আর আজ বড়দিন মহানন্দের হলেও সেদিন কিন্তু যোষেফ ও মরিয়মের জন্য যে সুখের ছিল না, তা নিশ্চয় বুঝতে পারি। নাম লেখবার জন্য নাসরৎ থেকে বেথলেহেম ৭০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে, কখনো বা গাধার পিঠে চড়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছালেন এবং ভাবলেন, এই বুঝি কষ্টের অবসান হল। কিন্তু না, কষ্ট যে মাত্র শুরু তা তারা জানলেন যখন মরিয়মের প্রসব বেদনা শুরু হল। এই যন্ত্রনা বেশী বৃদ্ধি পেল, যখন কেউ তাদের একটু জায়গা দিল না। কত জায়গাতেই না তারা ঘুরেছেন। পান্থশালার মালিক এতই ব্যস্ত ছিল যে, দুজন ক্লান্ত শ্রান্ত পথিকের দুঃখের কাহিনী শোনার মতো ধৈর্য্য তার ছিল না। অবশেষে অসহায় অবস্থায়, দীনবেশে গোয়াল ঘরে জন্ম নিলেন ঈশ^র তনয়, মানবপুত্র, প্রভু যীশু, “ইম্মানুয়েল” আমাদের সহিত ঈশ্বর।
অদৃশ্য ঈশ্বর দৃশ্যমান হয়ে মানবের মাঝে জন্মগ্রহণ করেছেন, আমাদের সঙ্গে বাস করেছেন, আমাদের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়েছেন। বড়দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বর আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমাদের সুখ-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, উথান-পতনে, সংকটে উল্লাসে তিনি আমাদের সাথে আছেন কারণ তিনি ‘ইম্মানুয়েল’। তিনি আমাদের সঙ্গে থেকে আমাদের অন্তর থেকে সকল অসত্য থেকে সত্যের পথে, অমঙ্গল থেকে মঙ্গলের পথে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং মৃত্যু থেকে জীবনের পথে পরিচালিত করেন।
যুগে যুগে দেবতারা, মহাপুরুষেরা এসেছেন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করতে। কিন্তু যীশু এসেছেন দুষ্ট পাপী যেন পাপ থেকে ফিরে জীবন পায়। আর এখানেই খ্রীষ্টধর্মের বিশেষত্ব ও প্রভু যীশুর এই ধরায় আগমনের আসল রহস্য।
বড়দিন বড় হয়েছে সময়ের ভিত্তিতে নয়, কিন্তু বড়দিন বড় হয়েছে ঈশ্বরের মহাদয়ায় ও দানের মহত্বে। ঈশ্বরের মহাত্যাগের ফসল এই দিন। “কারণ ঈশ্বর জগতকে এমন প্রেম করিলেন যে, আপনার একজাত পুত্রকে দান করিলেন, যেন যে কেহ তাঁহাতে বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায়।” যোহন ৩:১৬ পদ)। ঈশ্বর নিজেকে শূন্য করলেন, নেমে এলেন মাটির পৃথিবীতে যেন তিনি আমাদের উঁচু করতে পারেন। এখানে বড়দিনের বিশেষ বার্তা হল: “ সকল বড়ত্ব, অহংবোধ ত্যাগ করে সাধারণের সাথে এক হওয়া, নিচে নেমে আসা”।
‘বড়দিন’ ভালবাসার দিন, অন্যকে নিজের সর্বোচ্চ ভালোটুকু দেবার দিন, যেমনটি ঈশ্বর দিয়েছেন। সেদিন জগতের মুক্তিদাতার জন্য স্থান ছিল না, কিন্তু আজকের দিনেও কি তাঁর জন্য স্থান আছে? যখন আমরা অন্যের প্রয়োজনে সাড়া দিই না, মন্ডলীর কোন উপকারে আসি না, ভাইকে ভাই বলে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি না , তখন যীশুর নামে করা সকল উৎসব শুধু লোক দেখানো ছেলে খেলাই হয়। যীশু সেখানে স্থান পান না।
মাদার টেরেজা বলেছিলেন: আমি যখন পরম মমতায় কুষ্ঠ রোগীর সেবা করি, তার ক্ষত মুছিয়ে দেই, ঔষধ লাগিয়ে দেই, তখন মনে করি আমি যীশুর সেবা করছি।
তলস্তয়ের নাম আমরা সবাই জানি। তিনি বিশ্বখ্যাত একজন রুশ লেখক সাহিত্যিক ছিলেন। তার থ্রি কোয়েশ্চন বা তিনটি প্রশ্ন গল্পে তিনটি প্রশ্ন ছিল। ক) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কে? খ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি? গ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কখন? সামগ্রীক বিষয় বিবেচনা করে আমার অভিমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তিনি যিনি সর্ব মুহূর্তে আপনার সামনে আছেন অর্থাৎ প্রভু যীশু খ্রিষ্ট, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাঁকে পরিত্রাণকর্তা হিসাবে হৃদয়ে গ্রহণ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো এখনই, আজই।
সত্যিকারের বড়দিন আমাদের সকলের হৃদয়কে করে তুলুক অনেক বড়, সকল অন্ধকার যাক ঘুচে, অন্তর হোক আলোকিত। সবার মাঝে উদয় হোক অকৃত্রিম ভালোবাসা, উপচে পড়ুক শান্তি ও সমৃদ্ধি। এবারের বড়দিন পৃথিবীতে মানব জাতির জন্য শান্তি বয়ে নিয়ে আসুক। ইম্মানুয়েল।
লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ ও সভাপতি, সুনামগঞ্জ প্রেসবিটারিয়ান গীর্জা।