১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস উপলক্ষে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কর্তৃক আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য থেকে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে যা থেকে বাংলাদেশের শ্রমিক অঙ্গনের বাস্তবতা বুঝতে সুবিধা হয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বহু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই ভার্চুয়াল আলোচনায় যুক্ত ছিলেন শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় নিয়ে কাজ করা কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ। তাঁদের বক্তব্যের নির্যাস হলো এরকমÑ দেশে গণতন্ত্র না থাকলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় শ্রমিকরা। এছাড়া বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমঘণ্টা বাড়তে থাকায় শ্রমিকদের বিশ্রাম ও বিনোদনের সময় হ্রাস পাওয়া, আইএলও কনভেনশন অনুসারে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থেকে বিভিন্ন কায়দায় শ্রমিকদের বঞ্চিত করে রাখা, শ্রমিক শ্রেণির ভিতর ধর্ম, ভাষা ও জাতিসত্ত্বার নামে বিভেদ তৈরি করা ও শ্রমিকদের মজুরি দাসত্ব অবসানের সংকল্পের কথা উঠে এসেছে। এছাড়াও বক্তারা নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে স্থানীয় শ্রমিক অঙ্গনের নানা সমস্যার কথাও তোলে ধরেছেন। অবধারিতভাবে পারিবারিক বা কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের শ্রমকে অস্বীকার করার সামাজিক প্রবণতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বস্তুত মে দিবসকে সামনে রেখে স্থানীয় দৈনিকের এই প্রয়াসটি ছিলো সমাজের চালিকাশক্তি শ্রমিক অঙ্গনে বিরাজিত নানামুখী সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও করণীয় বিষয়গুলোকে আলোচনায় নিয়ে আসা যাতে করে রাষ্ট্র যেমন নিজের ভূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূমিকা নির্ধারণ করতে পারে তেমনি শ্রমিক ও শ্রমিক নেতৃত্ব নিজেদের আদর্শ-কর্তব্য সম্পর্কে নিজেদের তৈরি করতে পারেন।
শ্রম সেক্টরে যেসব সমস্যার কথা উঠে এসেছে তার কোনোটিই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতির বাইরে থেকে সমাধান করা সম্ভব নয়। আমরা এখন যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বসবাস করছি সেখানে শ্রমিকদের সব ধরনের সমস্যার সমাধান আশা করা বাতুলতা মাত্র। কারণ এখানে শ্রম শোষণ করে মুনাফার পাহাড় তৈরিকারী মালিকরাই নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকেন। তাই মালিক যে মুনাফা আহরণ করেন তার সাথে শ্রমিকদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুবিধাদির কোনো তুলনাই চলে না। রাষ্ট্র শ্রমিকদের জন্য এই কাঠামোর অধীনেই যেসব সুযোগ-সুবিধাদি দেয়ার আইন ও নিয়ম তৈরি করেছে তা উপেক্ষিত থাকছে। গার্মেন্টস সেক্টরে একজন শ্রমিক মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকুরি করেন যা সরকার নির্ধারিত সর্বনি¤œ মজুরির চাইতে অনেক কম। বলাবাহুল্য হোটেল রেস্টুরেন্ট, স-মিলসহ কোনো সেক্টরেই শ্রমিকরা এখন ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। আক্ষেপের বিষয় হলোÑ একসময় এই জনপদে শ্রমিক আন্দোলনের যে ঐতিহ্য ছিলো তা আজ অনুপস্থিত। ফলে এ নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সেই অর্থে কোনো তৎপরতা নেই। নেতৃত্বের এই সংকট ও আদর্শহীনতা এই অঙ্গনের একটি বড় সমস্যা।
সবচাইতে বড় কথা হলো রাষ্ট্রের আর্থ-রাজনৈতিক দর্শনের আমূল পরিবর্তন। ওই লক্ষ অভিমুখে শ্রমিক শ্রেণি যতদিন পর্যন্ত না দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হবে ততদিন পর্যন্ত পরিবর্তনের আশা করা একেবারেই অমূলক। শ্রমিক শ্রেণিকে সঠিক নেতৃত্ব ও আদর্শ বাছাই করতে হবে। নতুবা দুর্দশার অবসান অসম্ভব। ১৮৮৬ সনে শ্রমিকরা নিজেদের প্রাণোৎসর্গ করে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির একটি পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন। বেদনার বিষয় হলোÑ শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত এই দিবসটিও আজ আর শ্রমিকদের হাতে নেই। এই দিবসটিকে মালিকরা চমকদার কথাবার্তার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য কাজে লাগিয়ে থাকে। উৎপাদক গোষ্ঠী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণিকে সমাজের সবচাইতে অগ্রসর ও সমাজ রূপান্তরকামী শ্রেণি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। শ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত চরিত্রে ফিরে আসতে হবে। নতুবা ব্যর্থতা ও অধিকার হারানোর বৃত্ত ভাঙা কিছুতেই সম্ভব নয়।
মে দিবসের আলোচনা সভার মাধ্যমে শ্রমিক অঙ্গনে যদি সামান্য চিন্তার অনুরণন তৈরি হয় তাহলেই এর সার্থকতা।


