মোবাইল সিম ব্যবহারে অতিরিক্ত শুল্কারোপ অযৌক্তিক

২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল সিম ও রিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরক্ত ৫% সম্পুরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোবাইলে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আগে থেকেই ভ্যাট ও শুল্ক মিলিয়ে শতকরা ২২ ভাগ কর পরিশোধ করতে হতো গ্রাহককে। এখন অতিরিক্ত ৫ ভাগ শুল্কারোপ করায় গ্রাহককে শতকরা ২৭ ভাগ কর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো মোবাইল কোম্পানি তাদের সেবার দাম না বাড়ালে এখন একজন গ্রাহককে ১০০ টাকার সেবা ভোগ করতে ১২৭ টাকা খরচ করতে হবে। সরকারি তরফ থেকে প্রচ্ছন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, এই অতিরিক্ত শুল্ক গ্রাহককে বহন করতে হবে না। এই কর মোবাইল প্রোভাইডাররা পরিশোধ করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইতোমধ্যে মোবাইল প্রোভাইডাররা সাফ জানিয়ে দিয়েছে এই শুল্ক গ্রাহককেই পরিশোধ করতে হবে। ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত করে নতুন মূল্য নির্ধারণ শুরু করেছে। এছাড়া আমদানিকৃত মোবাইল সেটের উপরও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন বাজেটে। এই উভয় সিদ্ধান্তই সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ঘোষণার সাথে অসংগতিপূর্ণ।
বাংলাদেশে মোবাইল কল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। খুব অল্প লোকই আছেন যারা মোবাইল ব্যবহার করেন না। মোবাইল নির্ভর সেবার পরিধিও এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। এই পরিধি দিন দিনই বাড়তে থাকবে। মোবাইল এখন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদায় পরিণত হয়েছে। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট নির্ভরতা বেড়েছে বলে বেশ ভালভাবে বুঝা যায়। চিকিৎসাসেবা, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, কনফারেন্সিং, সম্প্রচার গণমাধ্যম ইত্যাদি জায়গায় ভার্চুয়াল প্লাটফর্মের বিস্তৃতি বেড়েছে। সরকার যাবতীয় সরকারি বেসরকারি সেবা কার্যক্রমকে তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর। নতুন শুল্কারোপ এই কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে কোনো ধরণের সহায়তা করবে না বরং অন্তরায়ই তৈরি করবে।
বাংলাদেশে বর্তমানেপ্রায় ২০ কোটি সচল সিম বা রিম রয়েছে। এই ২০ কোটি সিমই সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের মূল উপকরণ। বাংলাদেশের অতিদরিদ্র শ্রেণি থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির লোকই এখন মোবাইল নির্ভর সেবার মুখাপেক্ষী। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার গতি বাড়ানোর জন্য সেবাটিকে আরও সুলভ করে তোলাই ছিল প্রত্যাশিত। পৃথিবীর বহু দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মোবাইল ব্যবহারে খরচের পরিমাণ বেশি। তাই অন্যান্য দেশের সাথে সংগতি রেখে মোবাইল পরিসেবার খরচ কমিয়ে আনাই যুক্তিযুক্ত ছিলো। কিন্তু বাজেটে এর উল্টো প্রতিফলন দেখা গেল যা হতাশাজনক। অর্থমন্ত্রী কেন এমন একটি প্রগতি বিরোধী প্রস্তাব করলেন বুঝা দায়।
গ্রাহকদের নিকট থেকে আদায় করা বিশাল অংকের করের টাকার কত অংশ মোবাইল কোম্পানিগুলো সরকারের তহবিলে জমা দিয়ে থাকে তাও আরেক রহস্য বটে। বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরদের সাথে পাওনা আদায় নিয়ে বিটিআরসির দেনদরবার দেখে জনমনে এমন প্রশ্নের উদয় হয়। ট্যাক্স বাড়ানোয় কখনও কোনো কোম্পানির ক্ষতির কারণ হয় না কারণ ওই কর গ্রাহককেই বহন করতে হয়। বরং নানা ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ প্রশস্ত হয়। গ্রাহক তথা জনগণের স্বার্থ দেখার বিষয়টি সরকারের উপরই বর্তায়।
বাজেট জাতীয় সংসদে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাজেট প্রস্তাবের পরপরই কীভাবে শুল্ক বাড়ানোর এসআরও জারি এবং মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে? এই অতি উৎসাহের কারণ কী? রাজস্ব আহরণের ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া?
যাই হোক মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্কারোপের প্রস্তাবটি প্রত্যাহার ও একে আরও সুলভ করার বিষয়ে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিবেন বলে আমরা আশা করি। নতুবা মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল ভা-ার ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে জন অংশগ্রহণ সংকুচিত হবে। বাধাগ্রস্ত হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মহতি উদ্যোগ।