বরাবরের মতো এবারো দেশের মৎস্য অধিদপ্তর ‘মাছ চাষে গড়ব দেশ, বদলে দেব বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে ১৮-২৪ জুলাই পর্যন্ত মৎস্য সপ্তাহ-২০১৭ পালন করছে। সরকার যখন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রূপায়ণে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে আমাদের দেশকে আর্থিক সক্ষমতায় উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতে কাজ করে যাচ্ছে, তখন এ সফলতার অংশীদারিত্বে সংযোগ সৃষ্টি করতে দেশের মৎস্য অধিদপ্তর লোনা ও মিষ্টি জলের প্রতিটি পর্যায়ে উৎপাদনকাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী মৎস্যসম্পদের অফুরন্ত ভান্ডার তৈরি করে তা সংরক্ষণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জলের দেশ বাংলাদেশ। বং থেকে এসেছে বঙ্গ শব্দ। শব্দটি চীনা। অতি পুরনো শব্দ এটি। বঙ্গ শব্দটির অর্থ হলো জলাধার কিংবা জলমগ্ন এলাকা। উপকূলীয় এলাকা, নদী, হাওড়, বাঁওড়, বিল-ঝিল, খাল, পুকুর, দীঘির দেশ আমাদের এ বাংলাদেশ। প্রকৃতির জলে রয়েছে জলজ ও প্রাণিজ সম্পদ। এ সম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদনকাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বছর বছর যে উৎপাদন করতে হচ্ছে, তা এক চ্যালেঞ্জিং বিষয়। চিন্তা, কর্ম ও শ্রমের ব্যবহার— এ তিনের সংমিশ্রণে ২০১০-১১ সালে আমাদের উৎপাদনমাত্রা ছিল ৩০ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৭ টন। ২০১১-১২ সালে ৩২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮২ টন, ২০১২-১৩ সালে ৩৪ লাখ ১০ হাজার ২৫৪, ২০১৩-১৪ সালে ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ১১৫, ২০১৪-১৫ সালে উৎপাদন ছিল ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ২৪৫ টন (সূত্র: মত্স্য অধিদপ্তর)। আমাদের জনসংখ্যার আধিক্যে মাছের এ উৎপাদন বৃদ্ধি অনেকটা চ্যালেঞ্জ বটে। আমাদের রিসোর্স প্রতিনিয়ত কমছে। নদী আছে জল নেই, বিল আছে শুকনা। মোহনায় লবণ আধিক্য। এমন কিছু ঝুঁকি মোকাবেলা করে যে উৎপাদন, তা প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অভিজ্ঞ ও দক্ষ মত্স্যচাষী এবং মত্স্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরন্তর প্রচেষ্টার সার্থকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদের জনজীবনে আমিষের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তার ৬০ শতাংশ জোগান আসে মৎস্যজাত দ্রব্য থেকে। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ এ মৎস্য খাতে শ্রম বিকিয়ে জীবন ধারণ করে চলেছে। হিমায়িত চিংড়িসহ কচ্ছপ, কুঁচিয়া ও কাঁকড়া রফতানি করে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের আয় প্রত্যাশা করছি। সাদা মাছ পাঠিয়ে আমরা বিদেশী অর্থ আয় করতে পারছি। দেশীয় অর্থনীতির নির্দেশকে আমাদের মৎস্যসম্পদ এক বিষয় হিসেবে বিবেচিত। ট্রেড বিবেচনায় মত্স্য উৎপাদন, পোনা উৎপাদন, প্রজাতি সংরক্ষণকাজে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাপক; যা কিনা বাণিজ্যের এক সফল উপাদান হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। কর্মক্ষম নারীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টিতে এ খাতে মোট নিয়োজিত শ্রম এককে ২৫ শতাংশ নারীর শ্রম ব্যবহূত হয়ে আসছে, যা আমাদের সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নে এক পরস্ফুিটিত রূপায়ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের সমুদ্র পরিসীমা বেড়েছে। এ জলের যে উৎপাদন এবং ৩ দশমিক ৫১ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন যেন মত্স্য অধিদপ্তরের সার্থক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।
আমাদের চাষকৃত মাছ উৎপাদন বছরে ১৮ দশমিক ৬০ লাখ টন। মুক্ত জলাশয়ের উৎপাদন আসে ৯ দশমিক ৬১ লাখ টন। এ উৎপাদনের পরেও আমাদের প্রযুক্তি, মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে প্রতিটি খাতে আরো উৎপাদনে আশাবাদী। কৃষির এই জলজ উৎপাদনে আমরা শ্রম, প্রযুক্তি বিনিয়োগ করে আর্থিক সাফল্য পেয়ে আসছি। আমরা বাংলাদেশের জলজ সম্পদ নিয়ে গর্বিত। আমরা দেশের উন্নয়নে অন্য যেকোনো সেক্টরের চেয়ে মত্স্য খাতকে গর্বিত অংশীদার বিবেচনা করতেই পারি, কেননা আমাদের নদী বা সমুদ্র থেকে ঘরের আঙিনা পর্যন্ত যে জল আছে, তাতে উৎপাদন আছে আর সেজন্য আমরা উৎপাদনেও আছি। সুতরাং মত্স্য উৎপাদনে আমরা নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। যেন সে উন্নয়নে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ‘উন্নয়নশীল’ নামটা ঘুচিয়ে ‘উন্নত’ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচয় করাতে পারি।

