যাবতীয় অনাচারকে আজ রুখতে হবে আদর্শের শক্তি দিয়ে

ঈদের ছয় দিন পত্রিকা বন্ধ থাকার কারণে অপ্রকাশিত সংবাদগুলোকে একত্র করে গতকাল যে খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তাতে দেখা যায় এই ক’েিদন বিভিন্ন সংঘর্ষে জগন্নাথপুরে দেড় শ’, ছাতকে ৪৫ ও তাহিরপুরে ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এছাড়া জেলার বাসস্ট্যান্ডে মালিক সমিতির আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শনিবার তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে একপক্ষ। অন্যদিকে শহরের বিলপাড় ও বড়পাড়ায় শনিবার ভোর রাতে চুরি হয়েছে বাসার গ্রিল, কলাপসেবল গেট, দরোজা ও আলমিরা ভেঙে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ভুল করে পুলিশের গাড়িতে ডাকাতির চেষ্টা করা হয় ছাতকে। জগন্নাথপুরে এক শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু ও শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি উল্টে ২ ব্যক্তি আহত হওয়ার দু’টি ঘটনা ঘটেছে। শুধু দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের গতকালের সংখ্যায় উপরের খবরগুলো ছাপা হয়েছে। হিসাব করলে দেখা যাবে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের অধিকাংশই এমন নেতিবাচক ও অপরাধপ্রবণ সংবাদ। সাংবাদিকরা খবরের পিছনে ছুটেন, সমাজে সংঘটিত সংবাদমূল্য রয়েছে এমন সব সংবাদকে পত্রিকায় পাতায় তুলে আনেন। এই আনতে গিয়ে নেতিবাচক সংবাদের আধিক্য যখন বেশি হয়ে যায় তখন দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের দুঃখিত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কারণ ঘটমান বাস্তবতা পত্রিকার পাতায় তুলে আনতেই হবে। নতুবা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার শপথ ভঙ্গ করা হবে। কথা হচ্ছে, আমাদের সমাজ অসহনশীল ও অস্থিরতার চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পৌঁছে গেছে। এর বহিঃপ্রক্শা হচ্ছে নানা অপরাধপ্রবণতার মধ্য দিয়ে। নইলে জগন্নাথপুরে রথযাত্রার মতো একটি পবিত্র ধর্মীয় কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে কিংবা তাহিরপুরে ঈদের জামাত আদায় শেষ করে বিবদমান দুই পক্ষ কেমন করে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে। অতি তুচ্ছ কারণে রক্তপাত ঘটাতে, অন্যের প্রাণ বিপন্ন করতে সমাজেরই কিছু মানুষের হাত এতটুকু কাঁপছে না, এ এক সর্ববিনাশী অস্থিরতা বটে। একটি প্রাণ দিতে অক্ষম আমরা। দুনিয়ার সকল সম্পদ একত্র করেও একটি প্রাণ সৃষ্টি করার সামর্থ্য নেই মানুষের। কিন্তু সেই অমূল্য প্রাণ হরণ কিংবা বিপন্ন করতে নিজেদের এই সীমাবদ্ধতার কথা একবারও কেউ চিন্তা করে না। এরকম অস্থির সময়ের পরিধি যত স্বল্প হয় মানব সভ্যতার জন্য ততই মঙ্গল।
দুইটি কারণে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। এক হলো মানুষের নৈতিকতার জায়গায় স্খলন হলে আর দুই হলো সমাজে দুষ্টের দমনে শিথিলতা থাকলে। সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কত আইন, অনুশাসন, বাহিনী, সংস্থা, বিচারের আয়োজন করা হয়েছে। একদিকে এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার প্রসার ঘটছে অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। মানুষ আজ নিজের ঘরে নিরাপদ নয়। মানুষ এখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষ এখন কারো উপর ভরসা রাখতে পারছে না। এমন অবস্থা নৈরাজ্যকর অবস্থার পরিচয় বহন করে। কে না জানে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি মানুষের সভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে আইনের কাঠামোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের সহজাত সৃজনশীলতার বিকাশ সাধন করাই যাবতীয় বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার সারকথা। আজ এই সারকথা বিপন্ন। একে রক্ষা করতে হবে সর্বশক্তি দিয়ে।
এই অস্থির সময়ের অস্থির মানুষগুলোকে শান্তি ও প্রগতির পথে ফিরাতে দরকার আজ মানবসমাজের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধ। অপরাধের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতা, অশান্তির বিরুদ্ধে শান্তি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুনীতি, হিং¯্রতার বিরুদ্ধে মানবতা, অসাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের আদর্শ নিয়ে এই ঐতিহাসিক কর্তব্য পালনে মানবগোষ্ঠীকে আজ নিয়োজিত হতে হবে এক কঠোর সংগ্রামে। অন্ধকারকে যেমন আলো দিয়ে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হয় তেমনি যাবতীয় অনাচারকে আজ রুখতে হবে আদর্শের শক্তি দিয়েই।