যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় দফায় তদন্ত- কয়েকজন বীরঙ্গনার কথাও উঠে এসেছে

আবু হানিফ, দিরাই
১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞে জড়িত অপরাধিদের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তদল। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২ টা থেকে বিকাল পর্যন্ত তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান পিপিএম’এর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের  তদন্ত দল ১৯৭১ সালে শ্যামারচর গণহত্যাস্থল পরিদর্শন করেন এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তদন্ত দলের সদস্যরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে আলাদা-আলাদা কথা বলেন। এসময় কয়েকজন বীরঙ্গনার কথাও উঠে আসে। তদন্ত কর্মকর্তা নূর হোসেন জানান, বীরঙ্গনার বিষয়টি যাচাই করছেন তাঁরা।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সুনামগঞ্জ জেলায় পাকহায়েনা ও তাদের সহযোগী বাঙালি দালালরা যে কয়েকটি বর্বোরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেছিল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দিরাই উপজেলার পেরুয়া শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞ। এখানে ২০ জন নিরীহ বাঙালি গণহত্যার শিকার হন। কয়েক’শ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য মা- বোন। এই এলাকার কয়েকজন বীরঙ্গনা এখনো জীবিত রয়েছেন বলে দাবি রয়েছে স্থানীয় বিশিষ্টজনদের।
এই ধংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসাবে পরিচিত ‘পেরুয়া বড়বাড়ি’। পেরুয়া বড়বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেওয়া হয়েছিল। এই বাড়ির হেমচন্দ্র রায় এবং চিত্তরঞ্জন রায় গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। এই গণহত্যা এবং পৈশাচিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী কয়েকজন এখনো জীবিত রয়েছেন। কিন্তু পাকহায়েনাদের দোসরেরা এখনো জীবিত এবং প্রভাবশালী হওয়ায় মুখ খুলতে সাহস পান না এলাকাবাসী। এই ঘটনায় গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক       
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। মামলার তদন্ত কার্যক্রম গত বছরের ২ জুন থেকে শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুই দফা তদন্তের সময় যারা তদন্তসংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তারাসহ স্থানীয় লোকদের নিয়ে মঙ্গলবার বৈঠক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান পিপিএম। এ সময় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন, সদস্য মুহাইমিনুল ও মো. তোতা মিয়া স্থানীয়দের সঙ্গে আলাদা আলাদা কথা বলেন।
আব্দুল হান্নান খান পিপিএম বলেন,‘যারা এই তদন্ত কার্যক্রমে স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের নাম বাঙালি জাতির ইতিহাসে লিখা থাকবে। স্বাক্ষ্য প্রদানকারীদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন,‘আপনাদের পাশে সরকার আছে, বাংলাদেশ আছে। আপনারা গণহত্যার স্বাক্ষ্য দিতে চাইলে প্রকাশ্যে বলতে হবে না। আমাদের মোবাইলে ম্যাসেজ দিলে আমরা যেখানে আপনার সুবিধা সেখানেই স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। কেবল একজন ম্যাজিস্ট্রেট আপনার সামনে থাকবে, অন্য কেউ জানবে না।’
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন মুঠোফোনে জানান, কোথায় কোথায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। কী কী প্রমাণ হয়েছে, স্বাক্ষী- প্রমাণ কী কী পাওয়া গেছে, এসব নিয়ে স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ২০-২৫ জনের সঙ্গে মঙ্গলবারও কথা বলেছি আমরা। তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার সময় নতুন নতুন অনেক তথ্য এসেছে, এসব বিষয় আরো যাচাই করতে হবে। বীরাঙ্গনার বিষয়টিও এসেছে, তাও যাচাই করা হবে।’