যে ক্ষতি পূরণ হবার নয়

মোঃ চাঁন মিয়া
কোন কোন মানুষের মৃত্যু হলেও মনে হয় যেন তিনি মারা যান নাই, তিনি এখনো বেঁচে আছেন, কাজে কর্মে এখনো তার নাম সহজে এসে যায়। এমনি একজন মানুষ জননেতা আয়ূব বখ্ত জগলুল। দু’বছর আগে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও অনেকেই এখনো বক্তব্য প্রদানকালে নাদের বখ্ত এর পরিবর্তে মনের অজান্তে সম্বোধন করে ফেলেন আইয়ূব বখত জগলুলকে।
দেখতে দেখতে দু’টি বছর চলে গেল। ২০১৮ সনের পহেলা ফেব্রুয়ারী সুনামগঞ্জবাসীর জন্য এক শোকাবহ দিন। এইদিন ঢাকা অবস্থানকালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে জনাব জগলুল ইন্তেকাল করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে সমগ্র জেলাবাসী। পরদিন তাঁর জানাযায় লোকে লোকারণ্য,সুনামগঞ্জ জেলা স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ । সারা জেলা থেকে নেতাকর্মী ছাড়াও সিলেট এবং ঢাকা থেকে জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষ আসে তাঁদের প্রিয় নেতাকে বিদায় জানাতে। তাঁর মৃত্যুর দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো তাঁর স্মৃতি অম্লান। এখনো লোকজন বলাবলি করে জগলুল
থাকলে এই হতো-সেই হতো। তিনি মেয়র হয়ে সুনামগঞ্জ শহরকে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। কত রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাস্তাকে করেছিলেন প্রশস্ত। তাঁর সময়ে উত্তমলাল কলোনি হতে বিহারী পয়েন্ট হয়ে কাজীর পয়েন্ট পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্তকরণ, বর্ষকালে প্রবাহমান যৌবনবতী সুরমার জলধারার কলকল সুরে বিমোহিত নগরবাসীকে সুরমার কলতানসঙ্গীত ও ¯্রােতের ঘূর্ণী উপভোগ করে পুলকিত হতে মধ্যশহরে সুরমার তীরে গড়ে তোলা আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ‘রিভার ভিউ’ তাঁরই অন্তরর্নিহিত সৌন্দর্যবোধ ও সৃজনশীলতার স্মৃতি বহন করে। এছাড়া কিচেন মার্কেট, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, আরপিননগর ঈদগাহ মাঠ, হুসেন বখ্ত চত্ত্বর প্রভৃতি কাজ তাঁর স্মৃতিকে মানুষের হৃদয়ে উজ্জল করে রেখেছে। এছাড়া সুইমিংপুল, শিশুপার্ক তাঁর পরিকল্পনায় ছিল। তাঁর সবচেয়ে দক্ষতার পরিচয় মেলে তিনি একটি ঋণগ্রস্থ পৌরসভাকে স্বনির্ভর করে তুলেছিলেন। তিনি পৌর কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। এতে পৌরসভার কাজের গতি আশানুরূপ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আশার কথা, তাঁর ভাই নাদের বখ্ত মেয়র হওয়ায় তাঁর কাজের ধারাবহিকতা এখনো চলমান আছে। জনাব জগলুলের অকাল মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে যে শূণ্যতা তৈরি হয় তা কখনো পূরণ হবার নয়। তিনি ছাত্র অবস্থায়ই ছাত্রলীগের মধ্যদিয়ে রাজনীতির জীবন শুরু করেন এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, ভাসানপানিতে মাছধরা আন্দোলন, মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রদূত এবং সুনামগঞ্জ শহরের মধ্যে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনিই প্রথম দাবী উত্থাপন করেন এবং শহরবাসীদের নিয়ে পৌরসভায় মিটিং করেন। তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের জি.এস এবং ভি.পি হয়েছিলেন এবং অত্যন্ত তরুণ বয়সেই জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামীলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। টাকা-পয়সা বা সম্পদের জন্য নয়, মানুষের সেবার জন্য রাজনীতির সেই চিরন্তন আদর্শকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন। জনাব জগলুল রাজনীতিতে সততার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিরেন বর্তমান রাজনীতিতে তা বিরল। মানুষ বাঁচে কর্মের মধ্যে বয়সের মধ্যে নয়। তিনি তাঁর কর্মের মধ্যে অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকবেন।
লেখক : সাবেক সভাপতি, সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতি