পঙ্কজ শীল
তৃতীয় দফা বন্যা পরিস্থিতির কারণে কয়েকদিন ঘরবন্দী ছিলাম, কোথাও বের হতে পারিনি। গ্রামে ১৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় ফোন বন্ধ ছিলো। যার ফলে অনলাইনে এক্টিভ থাকতে পারিনি বা কারো সাথে যোগাযোগও করতে পারিনি।
পানি কিছুটা সরে যাওয়ার পর ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার সাচনাবাজারে আসলাম। সেদিন বেলা বারোটা হবে। সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিশ্বজিত রায়ের অফিসে বসে নিউজ সংক্রান্ত কথা বলছিলাম; ফাঁকে ফাঁকে তাঁর ল্যাপটপে পত্রিকার খবরাখবরে চোখ বুলাচ্ছিলাম। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ‘সাংবাদিক আবেদ মাহমুদ চৌধুরীর মৃত্যুতে প্রেসক্লাবের শোক’ শিরোনামে খবরটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠলো; আমার হাত-পা কেঁপে উঠছিলো! নিজের চোখকে কেনো জানি বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না!
যখন তাঁর ছবিটি দেখলাম এবং সাথে সাথে লিংকে ঢুকে খবরটি পড়লাম তখন বুঝতে পারছিলাম না কি করবো! এর আগের দিন, মানে বুধবার ১১টার দিকে নিজ বাসভবনে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন অথচ এই খবর আমি জানি না! যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে মারা যাবার ২৩ ঘন্টা পর তাঁর মৃত্যুর খবরটা জানলাম! তাও আবার পত্রিকার খবরাখবরের মাধ্যমে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো তখন!
আবেদ ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় মূলত একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে। এখনো স্পষ্ট মনে আছে ২০১৭ সালে ‘ত্রৈমাসিক সাহিত্য উন্মেষ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করছিলাম এবং প্রথম সংখ্যাটি তাঁর প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়। পত্রিকাটির কাজ, অলংকরণ করেছিলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আলী সিদ্দিক ভাই। খুব যতœ সহকারে পত্রিকাটি করার জন্য পাঠকমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ২০১৭ সালে এপ্রিলে পত্রিকাটি প্রথম বের হয়, তখন আবেদ ভাইয়ের সামনে দুটি কপি দিয়ে বলেছিলাম, ‘ভাইজান, সময় করে পত্রিকাটির দিকে কয়েক মিনিটি চোখ বুলিয়ে নিয়েন।’ দুদিন পর তাঁর অফিসে গেলাম, আমাকে দেখেই বললেন, ‘পঙ্কজ, তোমার সম্পাদনা ভালোমানের, আমার খুব ভালো লেগেছে, বিশেষ করে অবাক হয়েছি- নির্মলেন্দু গুণ, মতিন বৈরাগী, প্রাকৃতজ শামিমরুমী টিটনের মতো বিখ্যাত কবিদের কবিতা তোমার পত্রিকায় দেখে। কাজে লেগে থাকো, হাল ছেড়োনা- ধরে রাখতে পারলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে তুমি।’
এমন উৎসাহ পেতে কার না ভালো লাগে? খুব আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন আবেদ ভাইয়ের কথা শুনে। কখন যে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো, কখন যে তাঁর প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম তা বলতেই পারিনি!
এর পরের দু’বছর আমি সুনামগঞ্জে থাকি। মূলত আলী ভাইয়ের অফিসে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শেখতাম। বাসা ছিল এইচএমপি স্কুলের সামনে। আর আবেদ ভাইয়ের অফিস ছিল সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে। আমাদের বাসা থেকে তাঁর অফিস পাঁচ মিনিটের ব্যাবধান ছিল। যখন সময় পাই, যখন মনে চায়, তখনই তাঁর অফিসে চলে যেতাম। আবেদ ভাই থাকলে তাঁর স্নেহমাখা কথা শুনতাম; অনেক উৎসাহ দিতেন সারাক্ষণ। আবেদ ভাই যখন থাকতেন না, তখন প্রেসের মেশিনম্যান জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতাম।
যতোই দিন যায় আবেদ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক গভীর হতে থাকে, আবেদ ভাইয়ের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর রাগ খুব কম। নরম গলায় কথা বলতেন, তাঁর প্রেসের সকল কর্মচারীদের সাথে সুন্দর করে কথা বলতেন, খুবই স্নেহ করতেন। ভালো লাগতো তাঁর মমতাময়ী আচরণ দেখে।
যখন বাড়িতে চলে আসি সপ্তাহে একদিন হলেও মেসেঞ্জারে আমাদের কথা হতো। বলতেন- ‘তোমার লেখালেখির কি অবস্থা? ফেসবুকে লেখা না পেলে বলতেন- ইদানীং মনে হয় লেখালেখি কম করছো!’ তিনি আমার সবকিছুই ঠিকঠাক ধরতে পারতেন। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, তাঁর সাথে আমার কোনো ছবি তোলা হয়নি! এই দুঃখ কোথায় রাখি! কে জানতো যে, আবেদ ভাই এতো তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন! কে জানতো এতো তাড়াতাড়ি আবেদ ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে হবে! এসব ভেবে ভীষণ দুঃখ পাচ্ছি।
কাজের দিকে আবেদ ভাই খুবই যতœশীল এবং কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন। নিজের কাঁধে অর্পিত দায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। মৃত্যুর দুদিন আগেও তিনি আরটিভিতে সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকা ও যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনার খবর তুলে ধরেছেন। জাতীয় দৈনিক আজকের কাগজ দিয়ে তিনি সাংবাদিকতায় আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জের একজন সিনিয়র সাংবাদিক। সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি, একুশ অফসেট প্রেসের চেয়ারম্যান, দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জের সম্পাদক ও প্রকাশক, বেসরকারি টেলিভিশন ‘আরটিভি’র সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত খুবই যতœসহকারে তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখন কষ্ট হচ্ছে তাঁর অবুঝ দুুটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে। আহা! বাবার আদর থেকে মেয়ে দুটি চিরতরে বঞ্চিত হলো! নিয়তির খেলা! এ এক নির্মম বেদনা। যাদের বাবা নেই, তারা হয়তো এই বেদনা হাড়ে হাড়ে টের পায়, আমার বাবা আছে বলেই হয়তো এ বেদনা টের পাচ্ছি না! তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং সৃষ্টিকর্তা যেনো তাঁর পরিবারের সবাইকে সেই শোক সইবার শক্তি দেন।
প্রিয় আবেদ ভাই, অকালে আপনি এমন একটি দেশে চলে গেলেন, যে দেশের নাম ‘না ফেরার দেশ!’ আপনার দেশে আপনি ভালো থাকবেন, কথা দিচ্ছি- একদিন আমরাও আসবো আপনার না ফেরার দেশে!
লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক।


