রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ

হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব-১৩
মৃত্যুর মখোমুখি না দাঁড়ালে মানব জীবটাই অর্থহীন অসার। বেরীগাও ডিফেন্সে এসে জীবনটাকে নতুন করে ভাববার সুযোগ হয়েছে। আমাদের সামনেই পাক সেনাদের ডিফেন্সে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সস্ত্রে অবস্থান করছে ওরা। দু পক্ষের কাজই হচ্ছে একে অন্যের রক্ত ঝরানো। ব্যাঙ্কারের বাহিরে বেরোলেই হতাহত সুনিশ্চিত। চব্বিশ ঘন্টা চলছে উভয় পক্ষের গুলি ও বোমিং। এতো টানটান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রাত দিন কত আর ব্যাঙ্কারে থাকা যায়। তাই তিন চার জন মিলে পালা করে ডিফেন্সের বাইরে বের হয়েছি প্রতিনিয়ত। ডিফেন্সের পিছনে নারায়ণতালা, কান্দাগাঁও, গোদিরগাঁও, কামাড়ভিটা, মালাইগাঁও ও গুচ্ছগাও এলাকায় প্রাণ খোলে হেঁটে ঘুরেছি। মঙ্গলকাটা নদীর পাড়ে উল্লেখিত গ্রামের মানুষদের ছাগা ছাগি খাসির পাল ঘাস খেয়ে চড়ে বেড়াত। আমরা খাসির উপর গুলি করে চিৎকার দিয়ে ডাকতাম পাঞ্জাবির গুলিতে খাসি মরেছে। কার খাসি তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও। খাসির মালিক এসে জবাই করে আমাদেরকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন। এবং দ্রুত গতিতে রান্না করে মনের খুশিতেই পেট পুরে খাওয়াতেন। আর যুদ্ধের খবরাখবরও আমাদের কাছ থেকে জেনে অনেকটা আশ্বস্ত হতেন। এনাম সাহেব ও গোলাম রব্বানী সাহেব হয়তোবা কারো অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদেরকে ডেকে পাঠান। এবং খাসি হত্যা বন্ধের হুশিয়ারি দেন। কার কথা কে শোনে, জীবন মরণ সন্ধিস্থলে রণাঙ্গনে এতো আদেশ নির্দেশ মানলে যুদ্ধ করাটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। দুদিন পর আবার খাসি মেরে খাসির মালিককে দিয়ে কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে এনাম সাহেব ও রব্বানী সাহেবকে মাংস ভাত খাইয়ে দিয়েছি। এর পর থেকেই আমাদের হাইকমান্ড অতিষ্ঠ হয়ে আমাদের পিছনে খবরদারি করা একবারেই ছেড়ে দিয়েছেন। বেরিগাঁও ডিফেন্সে মৃত্যুর পাশাপাশি থাকলেও আনন্দের কমতি ছিল না। প্রতি রাতেই সুরে বেসুরে অনবরত গানবাজনা চলতো। এই মধ্যে জরুরি খবর আসে আজই ভোর পাচঁটায় পাক সেনাদের বাঘমারা ডিফেন্সে আক্রমণ করতে হবে। আমাদের ডিফেন্স থেকে দূরত্ব কম হওয়ায় ওদেরকে উৎখাত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ভোর সাড়ে চারটায় নাস্তা খেয়ে সি কোম্পানি ও এ কোম্পানি রহিম বক্স হাবিলদারের নেতৃত্বে বাঘমারা ডিফেন্সের বাম পাশ দিয়ে বোমা ও গুলি ছুঁড়া শুরু করে। রহিম বক্স হাবিলদার হাঁটু গেঁড়ে বসে টু ইঞ্চ মর্টার চালাচ্ছেন। আমাদের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই ওদের পাল্টা গোলাগুলির তীব্রতায় মনে হয়েছে ওরাই যেন আমাদের আক্রমণ করেছে। আমাদের রাইফেল থেকে দুটো গুলি বের হলেই আর ফায়ার হয় না। সব কন্ডম রাইফেল। লাঠির কাজ ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না। ওদের জনবল অস্ত্রবল আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের কমান্ডিং অদূরদর্শিতার কারণেই সমূহ বিপদের কারণ। রহিম বক্সের ডান পাশে এলএমজি হাতে অদুদ মিয়া এবং বাম পাশে এসএলআর হাতে আমি। ওদের বোমবিং ও গুলিতে প্রাণ বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়ে। আধ ঘন্টা পার হতে না হতেই রহিম বক্স হাবিলদারের মাথায় ওদের মেশিনগানের গুলি লেগে মাথার খুলিটা উড়ে যায়। ওনার মৃতদেহ নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে দুজন পাবলিক নিহত হন। দৌঁড়ে পালাতে গিয়ে আমাদের আটজন আহত হয়েছে। ঐ দিন পাকসেনা ও রাজাকার মিলে নিহত হয়েছিল নয় জন। হতাহতদের স্থানীয় লোক দ্বারা বালাটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এবং আমরা স্ব স্ব ব্যাঙ্কার এসে অবস্থান করি। আগের মতো গোলাগুলি চলতে থাকে উভয়ের মধ্যে। আমরা ব্যাংকারের দুতলায় ওঠে দেখতাম বাগমারার একটি লাল রঙের ঘরের বাারান্দায় রাজাকার ও পাকসেনারা হাঁটা চলা করে। সাথে সাথেই গুলি ছুঁড়লাম। কালের স্বাক্ষী হয়ে লাল ঘরটি আজও আছে। প্রতি দিন সন্ধায় ওদের ব্যাঙ্কারের উপর প্রচুর গুলি ছুঁড়তাম। ওরাও ছুঁড়তো আমাদের দ্বিগুন। একদিন হাইকমান্ডের নির্দেশে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত সকল ফায়ারিং বন্ধ থাকে। ব্যাঙ্কারের দরজায় একজনকে পাহারায় রেখে ভাগনে দুলচাঁদ ডুগডুগি বাঁিজয়ে গান আরম্ভ করে। ঐ দিন তারাও কোন ফায়ার করেনি। যে জন্য অন্য দিনের তুলনাই মনের আনন্দে গানবাজনা জমে ওঠছিল। ভোর পাঁচটার দিকে আমাদের পিছন দিক থেকে শতাধিক লোক জয় বাংলা ¯েœাগান দিয়ে গুলি করে করে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। চাইনিজ রাইফেলের গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে সবাই পজিশন নিয়ে বসে থাকি। ঝাপশা ভোরের আলোতে দেখি আমাদের পাশের ব্যাঙ্কারের সামনে উর্দী পড়া পাক সেনা আর পাক সেনা। পাশের ব্যাংকারের ওদেরকে বলছে আভি কাহা যারারে মাদারচুদ ট্যারো ট্যারো। তাক করা এসএলআর দিয়ে দুইজনকে ফেলে দিলাম। ওরাও নিরাপদ ড্রেনে পজিশন নিয়ে নিলো। মাথা সমান উচু ড্রেনটি এক মাইল লম্বা হবে। খাবার ও যুদ্ধসামগ্রী নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য ড্রেনটি করা হয়েছে। এই সুযোগে যে যেদিকে পারি দৌঁড়াতে শুরু করলাম। ভোরের আলোতে এদের নজর থেকে বাঁচা সম্ভব নয় বলে আমরা কয়েক জন একটি কচুরিপানা ভর্তি পুকুরে কাজি মরা হয়ে পড়ে থাকি। পুকুরের পাড় দিয়ে পাক সেনারা চলাচল করছে। আমাদের লুকিয়ে থাকা টের পায়নি। এই সময় রাজাকাররা ধরাধরি করে আহত দুই জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য ওদেরকে কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে চায়। এমন দৃশ্যে আমাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গীদের মৃত্যু দেখতে প্রাণে আর সইছে না। এসএলআরটিও কাদার নিচে দেবে গেছে। পরিষ্কার করা ছাড়া ফায়ার কারা সম্ভব নয়। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ভাবলাম মুক্তিযুদ্ধে আসার পথে আমার তিন সঙ্গীকে রাজাকাররা ধরে নিয় গেল, নিরস্ত্র ছিলাম বলে তাদেরকে রক্ষা করতে পারিনি। আজ সেই রাজাকাররা আরো দুই সঙ্গিকে চোখের সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, অস্ত্র থাকা সত্বেও প্রতিহত করতে পারলাম না। ভাগ্য বিড়ম্বনা একেই বলা যেতে পারে।(চলবে)