হরেন্দ্র তালুকদার
পর্ব- ১৪
সারাটা দিন কচুরি পানার নীচে পড়ে থেকে শরীর একেবারে বরফ হয়ে গেছে। হাত পায়ের চেতনা টের পাওয়া যায় না। সন্ধ্যার পরে পুকুর থেকে উঠে ডলুরা নদীতে পেক কাঁদা ছাড়িয়ে বালাটে গিয়ে পৌঁিছ। আমাদের দখলকৃত এলাকা পাক সেনাদের দখলে চলে যায়। ঐ দিন আমাদের চারজন শহীদ হন। দুই জনের নাম মনে আছে। একজন কবিন্দ্র দাস, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের নায়নগর গ্রামে তার বাড়ি। অপর জন অতিত নায়েক । তার ঠিকানা সিলেট চায়ের বাগান। দেশ স্বাধীনের পর সুনামগঞ্জ জুবিলী হাইস্কুলের নাম কয়েক দিন অতিত নায়েক হাইস্কুল নামে নামাঙ্কিত ছিল। উক্ত আক্রমণে আমাদের ষোল জন আহত হয়েছিল। সারা রাত আমাদের ফায়ার বন্ধ থাকায় পাক সেনারা নির্বিঘেœ বেরিরগাও বৈশেরপাড়ের মাঝের মাঠ দিয়ে আমাদের ডিফেন্সের পিছন দিয়ে চলে আসে। এবং অভিনব কায়দায় আক্রমণ করে। বেরিগাও রণাঙ্গনকে সুষ্ঠু তদারকি করার জন্য কোন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না। ভারতীয় সেনা অফিসাররা বালাট বসেই ফর্মুলা দিতেন। মেজর মোতালিব সাহেবও মাঝে মাঝে আসতেন। বি কোম্পানি কমান্ডার রবিন্দ্র বাবু কলেজ পড়–য়া ছাত্র ছিলেন। সি কোম্পানির এনামুল হক চৌধুরী রাজনীতিবিদ ছিলেন। এ, ডি ও ই কোম্পানি কমান্ডারগণ ইপিয়ারের হাবিলদার ছিলেন। সব চেয়ে বড় সমস্যা মুক্তিযোদ্ধাদের চেইন অফ কমান্ড খুবই দুর্বল ছিল। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি সংসারের মায়া ত্যাগ করেই গিয়েছি। যুদ্ধ করেছি নিজের প্রাণের তাগিদে। কারো আদেশ নির্দেশ ততটা গুরুত্ব দেইনি। একদিন বেরিগাও ডিফেন্সে রাত্রে ব্যাংকারের দরজায় বসে সিগেরেট খাচ্ছি। আমাদের কমান্ডার জয়নাল ভাই (আনসার সদস্য) আমাকে বাপ তুলে একটা গালি দিয়ে দিলেন। আমি উত্তর না দিয়ে সিগেরেট নিভিয়ে ফেলি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে জয়নাল ভাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে মোহন্ত রায়কে বললাম রাতে একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখছি রে, আমার রাইফেলের গুলিতে জয়নাল ভাই শহীদ হয়ে গেছেন। কথাটা শুনে জয়নাল ভাইয়ের চোখ একেবারে ছানাবড়া। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন ভাই তোমাকে আমার গালি দেওয়া ঠিক হয়নি। আমাকে মাফ করে দাও। ১৯৭১ রণাঙ্গনে নিজেদের গুলিতে নিজেরা মারা যাননি, একথা হলফ করে বলা যাবে না। যে জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ অধস্থনদের অন্যায় অবিচার নিরবে নিভৃত্তে মেনে নিয়েছেন বলেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে সবসময় সফল হওয়া সম্ভব হয়নি। বেরিগাও ডিফেন্স হাত ছাড়া হওয়ার পর থেকেই বালাট সেক্টরের সবগুলো কোম্পানির সম্মুখ যুদ্ধ একবারে থেমে যায়। আমরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে যাই। ওই এলাকার সাধারণ মানুষেরা এতো দিন আমাদের সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন জীবন বাজি রেখে। আজ তারাও হায়েনাদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে ভারতের পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। আর আমাদেরও ওই এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। তবে অত্যাধুনিক যন্ত্রের কাছে আমাদের অস্ত্র সস্ত্র লাঠি ঠেঙ্গার মতো। প্রাণের তাগিদে মনের জোরে গেরিলা যুদ্ধে যাই ঠিকই, তবে শত্রুকে মারার বদলে আমরাই হতাহত হই বেশি। একদিন বিকালে দুই জন লোক একটি লোককে ধরে ধরে বালাট সেক্টর হেডকোর্টারের সামনে নিয়ে আসে। লোকটি চোখে দেখতে পায় না। কাছে গিয়ে দেখি এই যে আমাদের আব্দুল মন্নান। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। আমার মতো সবাই জড়িয়ে কি যে কান্না। মন্নানকে সবাই ভালোবাসতো। পাক সেনারা তাকে ধরে নেওয়ার লোমহর্ষক কাহিনী মন্নানের কাছ থেকে শুনলাম। হায়েনারা তাকে ধরার পরই আমাদের গোপন সংবাদ শুনার জন্য তাকে মারধর শুরু করে। মন্নানের দেয়া তথ্য তাদের কাছে বিশ^াসযোগ্য না হওয়ায় মন্নানের দুটি চোখ বেয়োনেট দিয়ে উপড়ে ফেলে। এবং দুই তিনজন রাজাকার তাকে টেনে হিছড়ে সুরমা নদী পার করে সুনামগঞ্জের নবীনগর অঞ্চলে ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দেওয়ার আগে রাজাকাররা তাকে বলে দেয় এই হিন্দুস্থানের দালাল, তুই শুধু মুসলিম বলে তোকে প্রাণে মারলাম না, কথটা মনে রেখে চলিস। রাজাকাররা তার দুটি চোখ উপড়ে ফেললেও ইসলাম প্রীতিটা বহাল রেখেছে বলে আজও মনে দাগ কাটে। পাকসেনা ও রাজাকারদের আচার আচরণ ঐ সময়ে অনুধাবন করতে না পারলেও আজকের দিনে মনোযোগ দিয়ে ভাবি তারা ইসলামের মিথ্যা দোহায় দিয়েই দেশে থাকা মুসমানদেরকে হত্যা ও ধর্ষণ করেছে। আজও দেশদ্রোহী পাকিস্তান প্রেমিরা ধর্মের দোহাই দিয়েই দেশের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত। আব্দুল মন্নানকে ঐ দিনই সুচিকিৎসার জন্য শিলং হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তার আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। নয় মাসের মুক্তিসংগ্রামে অগণিত বেদনাদায়ক ঘটনা সচক্ষে দেখেছি। লিখলে একটি বিরাট বই হয়ে যাবে। লিখার হাত অতি ক্ষীণ বলে সামান্য উল্লেখ করলাম মাত্র। তবে মন্নানের করুণ অবস্থা দেখার পর থেকে বালাটে পাঁচটি কোম্পানির সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নতুন মাত্রায় যুদ্ধ করার উন্মাদনা ও বাড়তি আত্মপ্রত্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পাক সেনা ও রাজাকারদেরকে কেঁকশিয়ালের মতো মনে হয়েছে। ওই দিন থেকে নতুন উদ্যমে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। রণাঙ্গনে আগের চেয়ে সফলতাও বেড়েছে। আমাদের হতাহতের সংখ্যাও অনেকটা কমে এসেছে। বিবিসি ও আকাশবাণী কলকাতা থেকে সুনামগঞ্জ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য ফলাও করে প্রচার করছে। নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা আমাদের মনের মধ্যে গেঁেথ গেছে। কালা মেজরের আচর ব্যবহারও পূর্বের চেয়ে উত্তম রূপে দৃশ্যমান। (চলবে)


