বিশেষ প্রতিনিধি
লুটেরাদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের ৭ টি বৃহৎ বাজার। চার লাখ টাকার স্থলে হাট বাজার থেকে এবার এই উপজেলায় রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। এটি সুনামগঞ্জের রাজস্ব আদায়ের একটি উদাহরণ হিসাবে থাকবে বহুদিন। ইচ্ছে করলেই সরকারি সম্পদ রক্ষণা-বেক্ষণ সম্ভব এটি বিশ্বম্ভরপুরের হাট বাজার ইজারা দিয়েই প্রমাণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন । একবছর আগে এই উপজেলার হাটবাজার থেকে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৪১ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও এবার হয়েছে ৮০ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা।
বিশ্বম্ভরপুরের বড় ৭ টি বাজার গত কয়েক বছর স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ৩ বছর আগে একবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশন করায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে।
মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত রেখে সরকার দলের নেতা পরিচয়ে এগুলো থেকে টোল আদায় করেছে কিছু লুটেরা। কোথাও কোথাও এসব লুটেরাদের সহায়তা করেছে বিএনপির সুবিধাবাদীরাও। নেপথ্যে থেকে এরা ভাগ নিতো। এ কারণে গত কয়েক বছর এই বাজারগুলো থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে সরকার।
স্থানীয় প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সুত্র জানায়, এর আগে বিএনপি সরকারের সময়কালেও দলীয় পরিচয় দিয়ে এই বাজারগুলো লুটে-পুটে খেয়েছে লুটেরারা ।
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমার উত্তর পাড়ের বৃহৎ বাজার বিশ্বম্ভরপুরের চিনাকান্দি। তিন বছর আগে ১৪১৫ বাংলা সনে এই বাজার সরকারের দখলে ছিল এবং স্থানীয় প্রশাসন ৭ লাখ ১ হাজার টাকা খাস কালেকশন আদায় করেছে। ১৪১৬ বাংলা সনে ইজারা দিয়ে রাজস্ব পাওয়া গেছে ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই ইজারা মেয়াদ শেষ হতেই আজম খান ওয়াকফ স্টেটের পক্ষ থেকে আদালতে মালিকানা দাবি করে স্বত্ব মামলা দায়ের হয় এবং এরপরই সরকারের দখল ছাড়া হয়ে যায় বাজারটি।
একইভাবে এই উপজেলার ধনপুর বাজার ১৪১৫ বাংলা সনে ৬ মাসে খাস কালেকশন হয় ১৪ হাজার ৪৮০ টাকা এবং ১৪১৬ বাংলা সনে ইজারা হয় ৬৮ হাজার ৫০০ টাকায়। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরের বাজার ১৪১৫ বাংলা সনে ১ মাসের জন্য খাস কালেকশন হয় ৩০১০ টাকা এবং ১৪১৬ বাংলা সনে ইজারা হয় ৩০ হাজার ৬০০ টাকায়। পলাশ বাজার ১৪১৫ বাংলা সনে খাস কালেকশন হয় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪৫ টাকা এবং ১৪১৬ বাংলা সনে ইজারা হয় ৩ লাখ ৫১ হাজার ১০০ টাকায়।
এই বাজারগুলো ছাড়াও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মথুরকান্দি বাজার, জনতা বাজার ও বসন্তপুর বাজারের ১৪১৬ বাংলার ইজারা মেয়াদ শেষ হবার পর আজমখান ওয়াকফ স্টেটের পক্ষ থেকে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মামলা (৩৫/৮) দায়ের করে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। প্রথমে ৩ মাস, পরে আরো ৩ মাস এবং সবশেষে মামলার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ প্রদান করেন আদালত।
আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশের পর থেকে প্রায় সব কয়টি বাজারেই আজম খান ওয়াকফ স্টেটের হয়ে টোল আদায় করেছেন ধনপুর ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার, ইসকন্দর মিয়া, ওমর আলী ও তাদের লোকজন। ইসকন্দর মিয়ার পক্ষে তার ছেলে রাজু মিয়া বাজারগুলোতে টোল আদায় দেখাশুনা করতেন।
উপজেলার বৃহৎ বাজার বিশ্বম্ভরপুর, চিনাকান্দি ও পলাশ বাজারের টোল আদায়ও এরাই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন,‘ওয়াকফ স্টেট ইজারা দিতে না পারায় এবং প্রতিযোগিতা করে ইজারা নেওয়ায় বিশ্বম্ভরপুরের হাট বাজারে এবার রাজস্ব বেড়েছে।’
একসময় ওয়াকফ স্টেট থেকে কম টাকায় বাজার নিয়ে টোল আদায় করতেন আপনারা, এজন্য বিশ্বম্ভরপুরে রাজস্ব আদায় কম হতো, এটি ঠিক কী-না? এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন,‘আমি বা আমার পক্ষের লোকজন ওয়াকফ থেকেও ইজারা নিয়েছি, সরকার থেকেও নিয়েছি। আমি ইউপি চেয়ারম্যান হবার পর আর বাজার ইজারা নেইনি।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মচারী গত পাঁচ বছরের রাজস্ব আদায়ের চিত্র তুলে ধরে জানান, ১৪২০ বাংলা সনে বিশ্বম্ভরপুরের হাটবাজার ইজারা দিয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল চার লাখ ৭৯ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৪২১ বাংলা সনে রাজস্ব আদায় হয় ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা (ঐ বছর ওয়াকফ স্টেটের কবল থেকে মুক্ত করে কিছু বাজারে খাস কালেকশন আদায় করা হয়েছিল), ১৪২২ বাংলা সনে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৪১ টাকা এবং গত চৈত্র মাসে সর্বশেষ ওয়াকফ স্টেট থেকে মুক্ত করে আদালতের আদেশে উপজেলা প্রশাসন ইজারা দিয়ে পায় ৮০ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা। এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় বিশ্বম্ভরপুরে এর আগে কখনোই হয়নি।
বিশ্বম্ভরপুরের একজন গণমাধ্যমকর্মী বলেছেন,‘স্থানীয় লুটেরাদের সঙ্গে হাটবাজারের লুটপাটের অর্থের অংশ সরকারি দলের সুনামগঞ্জের কিছু নেতাদের পকেটেও যেতো। এবার বাজার ওয়াকফ স্টেটের কবল থেকে মুক্ত হওয়ায় এরা স্থানীয় প্রশাসনের উপর ক্ষেপা ছিল। তবে বিশ্বম্ভরপুরবাসী লুটেরাদের হাত থেকে সরকারি সম্পদ মুক্ত হওয়ায় খুশি।’
বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘বিশ্বম্ভরপুরের যে বাজারগুলো থেকে রাজস্ব আদায় হয়, এগুলো ওয়াকফ স্টেটের দোহাই দিয়ে কিছু মানুষ লুটে-পুটে খেতো, গত অর্থ বছরে আদালত থেকে সরকারের পক্ষে রায় হওয়ায় আমরা স্বস্তিবোধ করি এবং আইনগতভাবে ইজারা দেই। ইজারা দেবার সময় একটি পক্ষ বাজারগুলোর কোন একটি খাস কালেকশনে দেবার জন্য বলেছিলেন, কিন্তু আমি আইনের বাইরে যাইনি। আইন মোতাবেক ইজারা দেওয়ায় রাজস্বের পরিমাণ বেড়েছে। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসাবে আমি তাতে খুশি।’
- জগন্নাথপুরের কেশবপুর-পাটলী সড়ক- ৮ কিলোমিটার ভাঙাচোরা
- সুশাসন ও স্বচ্ছতার জায়গায় বিশ্বম্ভরপুরের বাজার পুনরুদ্ধার একটি দৃষ্টান্ত


