রূচিহীনতা ও বিকারগ্রস্ততার অবসান হোক

জামালগঞ্জের মেধাবী মাদ্রাসা ছাত্র রিফাতের জীবন একেবারে দুর্বিসহ করে তুলেছে কতিপয় তথাকথিত ফেসবুকার বা ইউটিউবার। শিশু রিফাতের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। সে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী। সে যা দেখে বা শুনে তা সহজেই আত্মস্থ করে নিতে পারে। ক্লাসে সে অনায়াসে সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। তার বাচনভঙ্গী আকর্ষণীয়। কথা বলার স্টাইল সুন্দর। এই ভালো গুণগুলোই এখন তার বিপদ ডেকে আনছে। রীতিমত মানসিক অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে এই শিশুটিকে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শিশু রিফাতকে নিয়ে প্রকাশিত হওয়া এক সংবাদভাষ্যে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই শিশুটিকে নিয়ে প্রথম ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরি করেন তার মাদ্রাসারই এক শিক্ষক। কনটেন্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। আর এ থেকেই শুরু হয় যাবতীয় বিড়ম্বনা। ওই শিক্ষক প্রতিদিনই রিফাতকে নিয়ে কোনো না কোনো ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করছেন। সুযোগ গ্রহণ করেছে বিভিন্ন ইউটিউবার। তারাও লাইন দিয়ে ওই শিশুর নানা ধরনের ভিডিও করে ফেসবুক ইউটিউবে আপলোড করছে। নানা ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন করে তাকে রীতিমত নির্যাতন করা হচ্ছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা রিফাতকে নিয়ে এই তৎপরতাকে শিশু অধিকারের লংঘন ও চরম অমানবিক কর্মকা- হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
শিশুর মানসিক বিকাশের পূর্বশর্ত হচ্ছে তাকে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ প্রদান করা। উপযুক্ত পরিবেশে শিশুর মেধার বিকাশ তরান্বিত হয়। শিশু রিফাত সৌভাগ্যবশত সহজাত মেধার অধিকারী। এই অনন্য প্রতিভার বিকাশে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগতভাবে তাকে সমর্থন জুগিয়ে সবধরনের সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা বিধান করা ছিলো কাম্য তখন তাকে নিয়ে এমন অরূচিকর বাণিজ্যিক ও রূচিহীন প্রচারলোভী তৎপরতা এককথায় দস্যুপনার নামান্তর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবে এক শ্রেণির অপেশাদার ব্যক্তি নানা কিছু দিয়ে অধিক প্রচার পেতে চায়। অনলাইন প্লাটফর্মের বিভিন্ন দরোজা খোললে এহেন জিনিস নেই যা এখন সহজলভ্য নয়। মানুষের জীবন, শরীর, আচরণ থেকে শুরু করে সবকিছুই হয়ে উঠেছে প্রচারের উপকরণ। ইউটিউবে যারা এমন করে থাকে তাদের একটি অংশের ভিতর রয়েছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য। এরা যেনতেনভাবে নিজেদের কনটেন্টের প্রসার ঘটাতে চায়। এতে একসময় তাদের কিছু আর্থিক প্রাপ্তিযোগ ঘটে। এই অবৈধ অর্থ কামানোর নেশা কিংবা রূচিহীন বিকারগ্রস্ততার কারণে তারা যে একইসাথে দেশের আইন লংঘন করে চলেছে তার তোয়াক্কা করে না। সমস্যা হলো আমাদের দেশে সামাজিক সাইটগুলো নিয়মতি তদারকি ব্যবস্থার মধ্যে রাখা হয় না। যদি থাকত তাহলে এমন অপচর্চা এত প্রসার লাভ করতে পারত না। রিফাতের মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নি¤œরূচি আমাদের হতবাক করেছে। তিনি কীভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানের এক শিশুকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারলেন? একবার হলে বুঝা যেত তিনি শিশুটির মেধার প্রচার করেছেন। কিন্তু বারবার একই তৎপরতা থেকে তার প্রচার লালসার বিষয়টিই পরিস্কার হয়।
গণমাধ্যমের তৎপরতায় বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রশাসনের নজরে এসেছে। তাঁরা এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রথমত আমরা চাইব শিশু রিফাতকে যেন আর কোনোভাবেই উত্যক্ত করা না হয়। এই দায়িত্ব রিফাতের মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, পরিবার ও স্থানীয় বিচক্ষণ ব্যক্তিদের গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসনকেও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই অপতৎপরতাকে রুখতে হবে। সাময়িক মোহগ্রস্ত হয়ে যাতে রিফাতের পরিবার এই অনন্য প্রতিভাধর শিশুটির মানসিক বিকাশকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে না দেয় সে অনুরোধ থাকল আমাদের। প্রশাসনকে অনলাইন নিয়ন্ত্রণ বা তদারককারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করে অরূচিকর কনটেন্টগুলো সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজ শুধু শিশু রিফাতের জন্য নয় বরং এরূপ সকল ক্ষেত্রে বিটিসিএল সহ অন্যান্য সংস্থার নিয়মিত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কাম্য।