রূপকথার মনের কথা

স্বপন কুমার দেব
আমার নাম রূপকথা। এক পিতার বিবাহযোগ্য কন্যা সন্তান আমি। লেখাপড়ায় মেধাবী ছিলাম। ভালো ছাত্রী হিসাবে নামডাক ছিল আমার। আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামে থাকি। বাবা সাধারণ কৃষক। মা সে হিসেবে কৃষক গিন্নি বা গাঁয়ের বধূ। বাবা কিছুটা পড়াশুনা করলেও মা যৎ সামান্য। তবে সংসার সামলানো ছাড়া আমার মার একটি গুণ আছে। অসাধারণ গানের গলা আমার ¯েœহময়ী মায়ের। সেই সূত্রে আমিও গান গাইতে পারি। তবে মার মতো নয়। মার পড়াশোনার ইচ্ছে ছিলো প্রবল। কিন্তু দাদুর দারিদ্র্যতায় তা আর হয়ে উঠেনি। এ পটভূমিতে আমার ভাগ্য অনেক ভালো। প্রাইমারী পেরিয়ে গ্রামের স্কুল থেকেই আমি এসএসসি পাশ করেছি। তারপর পাশের গ্রামের কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। অনেক ইচ্ছে ছিলো উচ্চ শিক্ষার। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হলো না। শহরে রেখে লেখাপড়ার খরচ যোগানোর আর্থিক ক্ষমতা আমার বাবার নেই। তাই অনেক কেঁদেছিলাম। বাবা আরো কষ্ট পাবে বুঝে চোখের জল আটকে রাখতে রাখতে এখন আর চোখে জল আসে না। অশ্রুধারা হয়তো আমার মনের ব্যাথা বুঝতে পেরেছে। যাকগে সে কথা। এখন আমি মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করি। মাঝে মাঝে গুণগুণ করে গান গাইলেও গান শেষ হয় না। কেমন যেন গলার কাছে কান্নার দলার মতো আটকে যায়। মা সব বুঝলেও অন্যকে বুঝতে দেন না। বোকা সেজে থাকেন মা। এখন গ্রামে পত্রিকা-বই এগুলি মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। এগুলি পড়ি। গল্প উপন্যাস আমাকে অনেক দু:খ ভুলিয়ে দেয়। আমাদের টিভি না থাকলেও প্রতিবেশী আত্মীয়ের বাড়িতে মাঝে মাঝে টিভি দেখতে যাই। তবে ভালো লাগে না। সাধারণ মোবাইল ফোন আছে আমাদের। আমার বাবার একটাই চিন্তা কেমন করে আমাকে ভালো একটি ছেলের সঙ্গে যত শীঘ্র সম্ভব বিয়ে দেয়া যায়। আমি ডানাকাটা পরী না হলেও দেখতে সুশ্রী। আড়ালে সবাই আমাকে সুন্দরী-ই বলে। আমি দেখতে অনেকটা মায়ের জলছবি। আমিও চাই আমার বাবার ইচ্ছে তাড়াতাড়ি পূরণ হোক। নইলে বাবা ভেতরে ভেতরে আরো কষ্ট পাবে। আমার নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে বলতে কিছু নেই। হয়তো এক সময় ছিলো। কিন্তু স্বপ্নের ডানা থেকে পালকগুলি এক এক করে খসে পড়েছে। তাই আর স্বপ্ন দেখি না। আমার জীবনে শারীরিক দুর্ঘটনা নেই। তবে ছোটবেলায় দুরন্তপনায় আম পাড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। হাত-পা না ভাঙলেও বাম গালের এক কোনে ভাঙা ডালের জোরালো খোঁচা লেগে থেঁতলে যায় ক্ষত স্থানটি। সে থেকেই বিপত্তি। গ্রামের ডাক্তারের ওষুধ-বিষুদ আর মলমে ক্ষত শুকিয়ে গেলেও সেখানে স্থায়ীভাবে একটি দাগের সৃষ্টি হয়। এমনিতে প্রথম দৃষ্টিতে চোখে না পড়লেও খুঁত খুঁজতে গেলে দাগটি সহজেই ধরা পড়ে। পাড়া-পড়শী মহিলারা এই দাগ নিয়ে মাঝে মাঝেই অনেক গবেষণা ও কূট-কাচালী করে থাকেন। কনে দেখার আসরে এই দাগটিই হলো আমার কলংক। এদিকে আমার বিয়ের জন্য সদা ব্যস্ত বাবা মনে করেন এটি সামান্য একটি বিষয়। ইতিমধ্যে একাধিক পাত্র কিংবা পাত্র পক্ষ আমাকে দেখে গেছেন। আমাকে পছন্দ হলেও আমার সেই দাগটি বা খুঁতটি পছন্দ হয় না। কানাঘুঁষা চলে। ডালপালা ছড়ায় অনেক দূর অব্দি। দাগটি নাকি ভবিষ্যতের এক রোগ জীবাণু ধারণ করে আমার গালে বাসা বেঁধে আছে। বয়স যত বাড়বে আমার শরীরের শ্যামল রং এর চামড়া নাকি ক্রমশ: শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে, আমার গায়ের রং পরিণত হবে বিশ্রী ছোপ ছোপ সাদা রঙে। আবার এ ও গবেষণা চলে  এ দাগ থেকে জন্ম নেবে ভবিষ্যতে এক মরণঘাতী রোগ। এই কল্পকাহিনীর শাখা ক্রমশ: বিস্তারে আমার প্রতিবেশীদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা যায় না। এভাবেই আমার বিয়ের সম্মন্ধগুলি এক এক করে ভেঙে যেতে থাকে। আর আমি রূপকথা মরমে মরে যেতে থাকি। বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে আমি আর পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে বসতে পারছি না বাবা। কিন্তু পারি না। বাবা যে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এদিকে আমিও দিনে দিনে নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছি। পাত্রপক্ষ খুঁতের খবর আগেভাগেই কিছুটা জেনে যায়। সন্দেহ মেটাতে আসে। তাদের ধাঁরালো অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দাগ নামক খুঁতটি ধরা পড়ে যায় অতি সহজেই। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্নবানে বিদ্ধ হই আমরা। কিন্তু ডাল ভেঙে যাওয়ার কাহিনী যেন কারো বিশ্বাস হয় না। বারবার পাত্রপক্ষকে আপ্যায়ন করতে গিয়ে আমার বাবার কষ্টার্জিত অর্থের বেশ কিছুটা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু বিয়ের প্রজাপতি আমার গায়ে রঙিন পাখা মেলে বসে না। এবার আমি মন দিলাম অন্য দিকে। পরীক্ষা দিয়ে প্রাইমারী স্কুল টিচারের চাকরী পেয়ে যাই। শুনেছিলাম এধরণের চাকুরী পেতে লক্ষাধিক টাকা লাগে। কিন্তু কেন জানি প্রথমবারের মত আমার ভাগ্য সদয় হলো। লিখিত পরীক্ষার পর হয় মৌখিক পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ। এই পর্বেই নাকি নাম কাটাকুটি চলে। সেদিন টেবিলের ওপাড়ে মধ্যমনি হয়ে বসা ছিলেন একজন সুদর্শন ভদ্রলোক। চশমার ভিতরে বুদ্ধিদীপ্ত এক জোড়া চোখ। সামনে আমার ফাইল। লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ও আমার বায়োডাটায় চোখ বুলিয়ে নেন তিনি। মুখে সন্তুষ্টির আভাস। আমি সাহসী হলাম। ভদ্রলোক একটি অংকের সমাধান জানতে চাইলেন। উত্তরে আমার মেধা প্রকাশে ভদ্রলোক সন্তুষ্ট বোঝা গেল। এবার ইংরেজীর একটি প্রশ্ন। তাও অনায়াসে উত্রে যাই। এর পরের প্রশ্নে গ্রামের ছোট মেয়েদের কয়েকটি প্রিয় খেলার নাম জানতে চান। আমার কিশোরী বেলায় কত খেলেছি ‘বন্দী’ নামক খেলা আর ‘ফুলগুটি’। এ দুটির নাম বলে দেই। উনি প্রথমে বুঝলেন না। ভদ্রলোক জানতে চাইলেন এগুলি কিভাবে খেলতে হয়? বুুঝিয়ে দেই কিভাবে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে একটি মেয়ের বন্দীত্ববরণ না করার কৌশল, আর কাঠের গুটি নিয়ে কিভাবে ফ্রক পড়া ছোট ছোট মেয়েরা আনন্দে মশগুল হয়ে যায়। ভদ্রলোক মিষ্টি করে হাসলেন। ঐ ইন্টারভিউতে কেউ আমার দাগ কিংবা খুঁত সম্পর্কে কিছুই জানতে চাননি। এরপর আমার চাকুরী হয়ে যায়। গ্রামের স্কুলেই নিয়োগ। হয়তো এখানেও সেই ভদ্রলোকের সদিচ্ছা আছে। চাকুরীর খবরটি আমার খুঁতের মতোই প্রচার হয়ে যায়। প্রথম মাসের মাইনের পুরো টাকা তুলে দেই আমার বাবার হাতে। বাবার চোখে জল। মা আমাকে জড়িয়ে ধরেন। ছোট ভাইটি আমার বড় বোনের শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বুঝতে পেরেছে একটা সুখের ঝলকানি লেগেছে। ও! আগে আমার ভাইয়ের কথা বলা হয়নি। ভাইটি আমার খুব আদরের। এবারে পাত্র সহ আসবেন পাত্র পক্ষের একটি দল। সেই একই নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে। নির্দিষ্ট দিনে সবাই এলেন। আমিও যথারীতি সকলের সামনে গিয়ে বসলাম। শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! আমার খুঁত বা গালের দাগ নিয়ে তো কেউ কিছু জানতে চাইছেনা! সবাই চাকুরীর বিষয়ে অধিক আগ্রহী। এই প্রথম আমাকে পছন্দ হলো পাত্রপক্ষের। সবাই হাসিখুশি। এবার বিয়ের দিন ক্ষণ ঠিক হবে। কিন্তু আমি রূপকথা যে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করে বসে আছি। এটি কেউ জানে না। আমি যে এবার ‘না’ বলবো। বলে দিবো পাত্র কিংবা পাত্রপক্ষ কোনটিই আমার পছন্দ হয়নি। এ প্রতিজ্ঞা যে ভঙ্গ হবে না। (একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লিখিত)